Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

❒ স্মরণ

মোহাম্মদ শরীফ হোসেন: দিগন্তের আলোকবর্তিকা

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি,২০২৬, ১২:০৫ পিএম
আপডেট : বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি,২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
মোহাম্মদ শরীফ হোসেন: দিগন্তের আলোকবর্তিকা

মোহাম্মদ শরীফ হোসেন ছবি: ফাইল

ভূমিকা ও তার আগে 

রাত তখন গভীর, কেবল বাড়ি ফিরেছি। লোকসমাজ পত্রিকা অফিস থেকে ফোন। যথারীতি নিউজ এডিটর অধ্যাপক আইয়ুব হোসেনের ফোন-" শরীফ স্যার মারা গেছেনে! তুমি কোথায়, অফিসে আস। কে রিপোর্ট করবে তুমি ছাড়া? এখনই আস।" ভাঙা মন নিয়ে অফিসে ফিরলাম।

লিখতে বসলাম রিপোর্ট। কর্মবীর মুনশী মেহের উল্লাহ'র 'ভাবো মন দমে দম, রাহা দূর বেলা কম' এই বাক্যটি যার আপ্তবাক্য ছিল-সেই আমাদের প্রিয় স্যার, প্রিয় আলোক বর্তিকাকে নিয়ে। খুব বেশি শোকাতুর ছিলাম। কারণ তার জীবনের শেষ দিকে প্রায়শই  কাছে গেছি। কথা বলেছি। নতুন নতুন চিন্তার সাথে পরিচিত হয়েছি। তা ছাড়া আমার ন-চাচার বন্ধু হওয়াতে আমাদের সম্পর্কটা আরও প্রগাঢ় হয়েছিল। পরে জানলাম আমার পিতা মাওলানা আব্দুর রউফকে খুব পছন্দ করতেন। তার চিন্তাধারা দ্বারা তিনি অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রফেসর শরীফ হোসেন একটা বড় বটবৃক্ষ ছিলেন এই জনপদের জন্য।

আমরা যখন লোকসমাজে একসাথে কাজ করেছি তখনকার একটুকরো স্মৃতি এখনও প্রোজ্জ্বল। স্নেহভাজন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী শিকদার খালিদ জীবনের শেষ দিকে খুব চেষ্টা করেছেন  তাকে ও কবি আজীজুল হককে জনপদে নতুন প্রজন্মের কাছে, নতুনভাবে পরিচিত করাতে। এ জন্য আমাদের বেশ কয়েকবার যৌথ প্রযোজনা ছিল অনেক কাজে।

শরীফ স্যার গোড়াবাদকে যে পছন্দ করতেন না, তা তার লেখায় প্রতিফলিত । এটা নিয়ে লোকসমাজে জীবনের শেষদিকে শিকদার খালিদ কয়েকটি প্রবন্ধ লেখান। এখন এই ক্ষয়িণ্ষু সময়ে তার মতো ব্যক্তির খুব বড় প্রয়োজন ছিল। সর্বজনগ্রাহ্য এই মানুষটির আজ মৃত্যু বার্ষিকী। একটি ক্ষুদ্র লেখার মাধ্যমে আমরা আজ তাকে স্মরণ করছি।

এই কথাটি মনে রেখ...

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্ঞানালোকিত জনপদ যশোরের মাটিতে যে ক’জন ক্ষণজন্মা মানুষ সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (১৯৩৪-২০০৭) তাদের মধ্যে প্রাতঃস্মরণীয়। তিনি কেবল একজন প্রথাগত শিক্ষাবিদ ছিলেন না, বরং ছিলেন একাধারে ভাষা সৈনিক, তুখোড় ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক সংগঠক, আজীবন বিপ্লবী এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষলগ্নে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পাকিস্তান আমলের শোষণ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়—উভয় ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী ও সক্রিয় অংশীদার ছিলেন। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া, অবহেলিত ও এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো এবং সমাজ থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করাই ছিল তার জীবনের মূল ব্রত। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত আধুনিক ইতিহাসে বিরল। তিনি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যার রশ্মি আজও যশোরের শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের প্রতিটি স্তরে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

মোহাম্মদ শরীফ হোসেন ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি যশোরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শহরের নিকটবর্তী খড়কি গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। পিতা শফিউদ্দীন আহমদ এবং মাতা মেহেরুন্নেছা খাতুন। তিনি ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান, যার ফলে পরিবারের অপার স্নেহ ও শাসনের মধ্যদিয়ে তার শৈশব অতিবাহিত হয়।

মেধার স্বাক্ষর তিনি ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই রেখেছিলেন। ১৯৪৯ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ১৯৫১ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই.এ. এবং ১৯৫৩ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৬ সালে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। তার এই অসাধারণ সাফল্য তাঁর গভীর জ্ঞানতৃষ্ণা ও অধ্যবসায়েরই বহিঃপ্রকাশ।

ছাত্রাবস্থায় মোহাম্মদ শরীফ হোসেন কেবল পড়াশোনায় মগ্ন ছিলেন না, বরং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি মুসলিম ছাত্রলীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি নিজেকে সঁপে দেন। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৫৬-৫৭ সালে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দর্শনের বিবর্তনে তিনি ১৯৫৮ সালে যশোর জেলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন। গণতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল আজীবন আপসহীন।

১৯৬২ সালে তিনি নিজ শহর যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজে (এমএম কলেজ) প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সেখানে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। তবে তাঁর কর্মতৎপরতা কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

চেতনায় পান্না হলো সবুজ...

তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো পাঠাগার। ১৯৬৩ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর তিনি যশোর পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমানে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি) সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি যশোরে প্রথম বইমেলার প্রবর্তন করেন। এছাড়াও তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বই ব্যাংক’ এবং গ্রামাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ পাঠকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তারই প্রচেষ্টায় অনেক দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি (যেমন তালপাতায় লেখা পুঁথি) সংরক্ষিত হয়েছে।

১৯৬৭ সালে তিনি কৃষক আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। যশোর জেলা কৃষক সমিতির কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে তাকে পুনরায় দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়। রাজরোষ বা জেল-জুলুম কোনোটিই তাঁকে আদর্শ বিচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৬৮ সালে তিনি যশোরে প্রথম নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে গণশিক্ষা আন্দোলনের এক নতুন মাত্রা যোগ করেন। এর বাইরেও তিনি অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

যশোরের খড়কি এলাকায় তিনি ‘আঞ্জুমানে খালেকিয়া ও লিল্লাহ ট্রাস্ট’ নামে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহৎ কাজে তিনি নিজের পৈতৃক পাঁচ বিঘা জমি দান করে দেন। বর্তমানে ১১ বিঘা জমির ওপর এই এতিমখানাটি বিস্তৃত, যেখানে ১১০ জন এতিম শিশু সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাকিস্তান সরকার তাকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করে। তবে সৌভাগ্যক্রমে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর যশোর জেলা শত্রুমুক্ত হওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

দেশ স্বাধীনের পর তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফেরেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি খুলনার সরকারি বিএল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯-৯০ সালে তিনি তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান মাইকেল মধুসূদন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯১ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।

অবসরের পর তিনি আরও বেশি সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সন্দীপন’। এটি একটি অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক সমবায়ী সংস্থা। এখানে বর্তমানে ৪৬ জন এতিম মেয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এবং হোম সাপোর্টের মাধ্যমে আরও অনেক শিশু সহায়তা পাচ্ছে। এছাড়াও তিনি নারী উন্নয়ন কেন্দ্র, দর্জিবিজ্ঞান প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ শিশুদের জন্য ৫২টি বিনামূল্যে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্য রক্ষায় তিনি ছিলেন সচেতন। সন্দীপনের মাধ্যমে তিনি কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনের আন্দোলন গড়ে তোলেন। পাশাপাশি কর্মজীবী ও গৃহকর্মী নারীদের সন্তানদের জন্য ঢাকায় একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সফলভাবে চলছে।

শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এই মহান সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে তাঁর নিজ গ্রাম খড়কির পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তুমি রবে নীরবে...

মোহাম্মদ শরীফ হোসেন ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং নিভৃতচারী সমাজসেবক। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি আমৃত্যু মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তার প্রতিটি কাজই ছিল সমাজকে আলোকিত করার এক একটি প্রচেষ্টা। তার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজও হাজার হাজার মানুষের জীবনে আশা ও আলোর সঞ্চার করছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমাজ পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: কবি ও ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক

 

তথ্য ঋণ-বাংলা পিডিয়া

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)