ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী মহোৎসবকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ থাকলেও বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে রাজপথের সাবেক দুই মিত্র—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। নির্বাচনী প্রচারণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পার হতে না হতেই দেখা যাচ্ছে, এই দুই সাবেক মিত্র এখন একে অপরের দিকে রণংদেহী মূর্তিতে তাকিয়ে আছে। প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই দুই দলের শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, আদর্শিক সংঘাত এবং ব্যক্তিগত বিষোদগার রাজনৈতিক উত্তাপকে চরমে নিয়ে গেছে। আওয়ামী ফ্যাসিস্টের ব্যবহৃত ইস্যু মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় রাজনীতিকে বিএনপি তাদের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করছে। অপরদিকে জামায়াত ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’—ইস্যুকে এখন ভোটের মাঠে জোরেসোরে তুলে ধরছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত দুদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝটিকা সফর করেছেন। ঢাকা থেকে শুরু করে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারসহ মোট আটটি বিশাল জনসভায় তিনি ভাষণ দেন। প্রতিটি সভায় তার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নাম না করে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের তীব্র সমালোচনা। সিলেট ও হবিগঞ্জের জনসভায় তারেক রহমান সরাসরি জামায়াতের ‘সৎ মানুষের শাসন’ স্লোগানকে লক্ষ্য করে বলেন-‘যারা মুখে ধর্মের কথা বলে কিন্তু অন্তরে স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা লালন করে, তারা কখনোই দেশের বন্ধু হতে পারে না। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা 'বেহেশতের টিকিট' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তা কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামি নয়, বরং ধর্মীয় পরিভাষায় এটি 'শিরক' ও 'কুফরি'। সাধারণ মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন শেষ।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ পক্ষ এনআইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের আড়ালে ‘পোস্টাল ব্যালট ছিনতাই’ এবং ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়েছে। এছাড়া বিদেশি প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়, বিএনপি কেবল বাংলাদেশের মানুষের শক্তিতে বিশ্বাসী।
তারেক রহমানের এই আক্রমণের জবাব দিতে জামায়াতে ইসলামীও কোনো কার্পণ্য করেনি। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকার মিরপুরসহ উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে পাঁচটি জনসভায় বিএনপিকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।
গত বৃহস্পতিবার মিরপুরের জনসভায় তিনি বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা মাসিক দুই হাজার টাকার ভাতার প্রতিশ্রুতিকে চরম কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন,আমরা আমাদের মা-বোনদের হাতে দুই হাজার টাকার কোনো খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে তাদের ছোট করতে চাই না। আমরা চাই প্রতিটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াক। বিএনপি নেতাদের অতীত দুর্নীতি আর দখলবাজির কথা মানুষ ভোলেনি। তারা এখন নতুন রূপে চাঁদাবাজির লাইসেন্স চাইছে।
গতকাল শুক্রবার খুলনার এক বিশাল সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানের ধর্ম বিষয়ক বক্তব্যের জবাবে কঠোর ভাষায় বলেন-কোনো মুসলমান আরেক মুসলমানকে কাফের বলার সাহস পায় কীভাবে? বিলেত (লন্ডন) থেকে এসে উনি এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন, ফতোয়া দিচ্ছেন! মনে রাখবেন, আগে যুদ্ধ হতো তীর-ধনুক দিয়ে, এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে। এটি দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ।
বক্তৃতার এই উত্তাপ কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যেও। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগে থেকেই বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছিল, জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই সন্দেহের জেরে বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী কর্মীদের অবরুদ্ধ করা এবং লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে।
গত বুধবার মিরপুরে জামায়াত আমিরের নির্বাচনী এলাকায় দলের নারী কর্মীদের আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মায়েদের ইজ্জত নিয়ে যারা টান দেবে, তাদের মনে রাখা উচিত আগুনের সাথে খেলা করা ভালো নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে নিজেদের ‘একক ক্ষমতা’ জাহির করার লক্ষ্য থেকেই বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশের জন্য এখন সলিউশন হলো একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা দেখানোর জন্য সমালোচনা করবেই, এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। কিন্তু এই সমালোচনা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে সংঘাতের দিকে না যায়।
অন্যদিকে লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিএনপি এখন জামায়াতকে সেই একই অভিযোগে অভিযুক্ত করছে যা আগে আওয়ামী লীগ করত। কারণ এখন বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি একই ভোটের বাজারের অংশীদার।
প্রচারের প্রথম দুই দিনেই যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই এখন দুই সাবেক মিত্রের মধ্যে। একদিকে বিএনপি ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে মাঠ ধরে রাখতে মরিয়া। অন্যদিকে জামায়াত এবং এনসপিসহ ১০-দলীয় ঐক্য ধর্মীয় অনুভুতি ও ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে সেই নেতৃত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই ‘কথার লড়াই’ ভোটের ব্যালটে কী প্রভাব ফেলে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।