তৌহিদুজ্জামান, ঝিকরগাছা
একটি পুরনো মোটরচালিত ভ্যান—এর বাজারদর কতই বা হবে? কয়েক হাজার কিংবা বড়জোর লাখ টাকা। কিন্তু এই সামান্য টাকার একটি যন্ত্রের জন্য কেড়ে নেওয়া হলো রক্ত-মাংসের একটি তরতাজা প্রাণ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
ঝিকরগাছা, যশোর: আমাদের চারপাশের ব্যস্ত শহর আর ধুলোবালি মাখা মেঠোপথগুলোতে প্রতিদিন কত মানুষই তো জীবনযুদ্ধে নামে। কেউ নামে বিলাসিতার লোভে, কেউবা স্রেফ দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থানে। যশোরের ঝিকরগাছার পারভেজ হোসেন ছিলেন দ্বিতীয় দলের। তবে তার লড়াইটা ছিল অন্যদের চেয়ে একটু বেশি কঠিন, কারণ তার শরীরে ছিল এক জন্মগত প্রতিবন্ধকতা। তবুও তিনি হার মানেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একদল পাষণ্ড ঘাতকের পৈশাচিক লালসা কেড়ে নিল এই লড়াকু তরুণের প্রাণ।
ঝিকরগাছা পৌরসভার কৃষ্ণনগর গ্রামের হাওয়ার মোড় এলাকা। এই এলাকার সাধারণ এক বাসিন্দা মো. হায়া। তার প্রতিবন্ধী ছেলে পারভেজ ঘরে বসে অন্যের দয়া নিয়ে বাঁচতে চাননি। তাই ভাড়ায় একটি অটোভ্যান নিয়ে নেমেছিলেন ঝিকরগাছার অলিতে-গলিতে। তাঁর জীবনের চাকা ঘুরত অটোভ্যানের চাকার সাথে সাথে। প্রতিদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন সামান্য কিছু টাকা হাতে আসত, সেটাই ছিল তাঁর সার্থকতা।
বৃহস্পতিবারের সেই বিকেলটা আর দশটা বিকেলের মতোই ছিল। ৩টার দিকে পারভেজ অটোভ্যানটি নিয়ে ঘর থেকে বের হন। কে জানত, পরিবারের সাথে ওটাই ছিল তার শেষ দেখা? পারভেজের জীবনে বিপদ আগে থেকেই ছায়া ফেলেছিল। এর আগে দুইবার তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিলেন। তবে দুইবারই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন। হয়তো সেই সাহসেই আবার পথে নামা। কিন্তু এবার আর ফেরা হলো না। রাত ৮টার দিকে শ্রীরামপুর বাজারে যখন শেষবার তাঁকে দেখা যায়, তখনও কেউ ভাবেনি কিছুক্ষণ পরেই কোনো এক নির্জন মাঠে তাঁর নিশ্বাস রুদ্ধ করে দেওয়া হবে।
রাত গভীর হয়, কিন্তু পারভেজ ফেরেন না। যে ফোনটি সচরাচর পরিবারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল, সেটিও হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার রাতটা পারভেজের পরিবারের জন্য ছিল এক অনন্ত প্রতীক্ষার আর চরম উৎকণ্ঠার। শুক্রবার সকালে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন শ্রীরামপুর-আঙ্গারপাড়া মাঠের নির্জনতায় গ্রামবাসী একটি দেহ পড়ে থাকতে দেখেন, তখন চারদিকে এক হাহাকার নেমে আসে। পুলিশের উপস্থিতিতে শনাক্ত হয়—এটিই নিখোঁজ পারভেজ।
আজ তিনি লাশকাটা ঘরে টেবিলের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। এ এক অদ্ভুত নিথর গল্প; পারভেজ কোনো নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হননি, এমনকি তার বিবাহিত জীবনের স্বাদেও কোথাও কোনো খাদ ছিল না। সময়ের আবর্তে প্রিয়জনের ভালোবাসার মধু আর মননের তৃপ্তি তিনি পেয়েছিলেন। জীবনের কঠিন লড়াই থাকলেও হাড়হাভাতের গ্লানি কিংবা বেদনার শীতে তার এই জীবন কোনোদিন ভয়ে কেঁপে ওঠেনি। বরং তিনি তো লড়তে চেয়েছিলেন সেই গ্লানিকে জয় করার জন্যই। অথচ আজ সব লড়াই থেমে গেছে নির্জন মাঠের এক কোণে।
তার গলার দাগগুলো বলে দিচ্ছিল, কতটা পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি সাধারণ প্লাস্টিক ও লোহার তৈরি অটোভ্যান কি মানুষের প্রাণের চেয়েও দামি? ঘাতকদের কাছে হয়তো উত্তরটা ‘হ্যাঁ’। পারভেজের মৃত্যুতে কৃষ্ণনগর গ্রামে আজ কেবল স্তব্ধতা। এলাকার মানুষ তাঁকে চিনত এক নিরপরাধ, পরোপকারী আর সাহসী তরুণ হিসেবে। তাঁর এই চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের সন্তান হারানো নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ দেওয়ান মোহাম্মদ শাহজালাল আলম জানান, আমরা ধারণা করছি এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মোটরভ্যান ছিনতাই করার জন্য তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা অপরাধীদের ধরতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।
পারভেজ আজ আর নেই। হয়তো তার অটোভ্যানটি কোনো ভাঙারি দোকানে বা অন্য কোনো গ্রামে রঙ বদলে চলবে। কিন্তু যে মা-বাবা আজও দরজায় চেয়ে আছেন তাঁদের প্রতিবন্ধী ছেলেটির ফেরার অপেক্ষায়, তাঁদের সেই শূন্যস্থান কি পূরণ হবে? পারভেজের মতো নিস্পাপ প্রাণেরা কেন বারবার এভাবে ঝরে যাবে, এই প্রশ্নটাই এখন ঝিকরগাছার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।