❒ সংবাদ বিশ্লেষণ
শারমিন আক্তার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এক নতুন বাঁকবদলের মুখোমুখি। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকা এ দেশে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের আচরণের গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে? বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান গতিবিধি ও কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেখানে সহনশীলতা ও সুস্থ ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তবে নির্বাচনী মাঠের বর্তমান চিত্র বলছে, বিএনপি কোথাও কোথাও তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের মেজাজ হারিয়ে ফেলে পুরোনো আধিপত্যবাদী ধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে কি না, তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে বড় ধরনের কোনো সংঘাতের ঘটনা না ঘটলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা জনমনে সংশয় তৈরি করেছে। যশোর, লালমনিরহাট, ময়মনসিংহ ও চুয়াডাঙ্গার মতো জেলাগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে যে মৃদু উত্তেজনা বা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল স্থানীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ কম। গত রোববার এসব ঘটনায় অন্তত ৪৫ জন আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—মাঠপর্যায়ে সহনশীলতার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
যশোরের ঝিকরগাছায় জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা প্রদান বা লালমনিরহাটে হিজাব টেনে ধরার মতো যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের চরম পরিপন্থী। বিএনপি নেতৃত্ব যদিও এগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বা ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করছে, কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে একটি আধিপত্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে ‘জবরদস্তি’ ছিল প্রধান হাতিয়ার। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে প্রতিপক্ষকে মাঠেই নামতে দিত না, বর্তমানে বিএনপির কিছু কর্মীর আচরণে সেই একই প্রবণতার ‘ছায়া’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষ ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিল কেবল ক্ষমতার বদলের জন্য নয়, বরং একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য। বিএনপি যদি এখন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রচারণায় বাধা দেয় কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, তবে প্রকারান্তরে তারা সেই পুরোনো ফ্যাসিস্ট আচরণেরই অনুকরণ করছে বলে প্রতীয়মান হবে।
বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর লড়াই করেছে ভোটের অধিকারের জন্য। কিন্তু সেই অধিকার যখন প্রয়োগের সময় এল, তখন তারা যদি অন্যদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তবে তা হবে দলটির দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি চরম অবমাননা। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন কিছুটা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ বা আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছে মাঠ নিজেদের দখলে রাখার জন্য। কিন্তু এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি যদি উগ্রতায় রূপ নেয়, তবে তা ভোটারদের মধ্যে আস্থার বদলে ভীতির সঞ্চার করবে।
বাংলাদেশের সাধারণ ভোটাররা এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। তারা বছরের পর বছর ধরে একটি দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশায়। কিন্তু সেই ত্যাগের ফসল হিসেবে যদি মানুষ আবারও জবরদস্তিমূলক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখে, তবে তারা বিকল্প খুঁজতে দ্বিধা করবে না। ভোটাররা কোনোভাবেই আরেকটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছায়া দেখতে চান না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান এক আলোচনায় বলেন, ‘বিএনপি যদি এই মুহূর্তে নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং প্রচারণায় শিষ্টাচার না দেখায়, তবে ভোটারদের একটি বড় অংশ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। মানুষ এখন এমন এক রাজনৈতিক শক্তি চায় যারা কেবল বিজয়ী হতে জানে না, বরং প্রতিপক্ষকে জায়গা দিতেও জানে।’
বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তাদের জনপ্রিয়তাকে জবরদস্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চাওয়া। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী যখন মাঠে অত্যন্ত ‘ডিফেন্সিভ’ বা কৌশলী অবস্থানে থেকে ভোটারদের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বিএনপির আক্রমণাত্মক আচরণ জামায়াতের পালে বাড়তি হাওয়া দিচ্ছে। ভোটাররা যদি বিএনপিকে ‘উগ্র’ এবং জামায়াতকে ‘সহনশীল’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে ব্যালটে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বারবার শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বললেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে না। এর একটি বড় কারণ হতে পারে দলে নব্য অনুপ্রবেশকারীদের আধিক্য। অভিযোগ রয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের অনেক সুবিধাবাদী এখন বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। এই নব্য বিএনপি কর্মীরাই মূলত উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন একটি আধুনিক ও সংস্কারমুখী রাজনীতির কথা বলছে, তখন তৃণমূলের এই জবরদস্তিমূলক আচরণ নেতৃত্বের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। দলকে কেবল ক্ষমতার পথে নিয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এখন বিএনপির প্রধান কাজ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বর্তমান নির্বাচন কমিশন বারবার নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিটি ছোট ঘটনাকেও গুরুত্বের সাথে দেখছে। কিন্তু কেবল প্রশাসন দিয়ে একটি আদর্শ নির্বাচন সম্ভব নয়, যদি না বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমরা মাঠে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করব না। প্রতিটি দলের সমান অধিকার রয়েছে প্রচার চালানোর।’ কিন্তু প্রশাসনিক কড়াকড়ি শুরু হওয়ার আগেই দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে সুস্থ রাজনৈতিক ধারা বজায় রাখতে হবে।
বিএনপি যদি সত্যি একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়, তবে তাদের প্রথম কাজ হবে নিজেদের রাজনৈতিক মেজাজ ফিরিয়ে আনা। জবরদস্তি বা আধিপত্য নয়, বরং যুক্তিতর্ক ও জনপ্রিয়তার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করতে হবে। ফ্যাসিস্টদের মতো আচরণ করে প্রতিপক্ষকে দূরে সরিয়ে রাখা সাময়িকভাবে লাভজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা বিএনপিকে গণমানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
ভোটাররা চান এমন একটি পরিবেশ যেখানে তারা নির্ভয়ে নিজের পছন্দমতো প্রার্থীকে বেছে নিতে পারবেন। মানুষের আস্থার বদলে তারা যদি জবরদস্তির ছায়া হয়ে দাঁড়ায়, তবে ইতিহাস তাদেরও ক্ষমা করবে না।
নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট বাক্স ভরা নয়, নির্বাচন মানে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উত্তরণ।