❒ রম্য প্রতিবেদন
হাসিবুল ইসলাম ইমন,বাঘারপাড়া
"আমরা কি কথা বলতে পারি না বলে আমাদের বুকেও নির্দয়ভাবে পেরেক ঠুকতে হবে?" ছবি: হাসিবুল ইসলাম ইমন,বাঘারপাড়া
আমরা ক'জন গাছ। আমাদের একজন নারিকেল, একজন রেন্ট্রি আর অন্য চারজন মেহগনি। স্বজন হয়ে যশোর- নড়াইল মহাসড়কের ধারে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছি। বছরের পর বছর পথিককে ছায়া দেই, তপ্ত দুপুরে ক্লান্ত শরীরকে জুড়াই। কিন্তু নির্বাচনের এই উৎসব আমাদের জন্য যেন এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের কি অপরাধ? আমরা কি কথা বলতে পারি না বলে আমাদের বুকেও নির্দয়ভাবে পেরেক ঠুকতে হবে?
আমাদের নীরব কান্না
বেশ কদিন আগে এক সকালে আমার শরীরে বড় একটা পেরেক ঢোকানো হলো। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় শিউরে উঠলাম, কিন্তু আমি তো চিৎকার করতে পারি না। আমার বুক চিরে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো একটি ফেস্টুন। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা— মতিয়ার রহমান ফরাজী। তার মার্কা ‘ধানের শীষ’।
আমার পাশের মেহগনি গাছটির অবস্থা আরও করুণ। তার সারা শরীরে পলিথিনে মোড়ানো পোস্টারের জঞ্জাল। বাতাস এলে পলিথিনের খসখস শব্দে সে ফুঁপিয়ে কাঁদে। সে আমাকে বলছিল, "বন্ধু, এরা নাকি মানুষের প্রতিনিধি হতে চায়? যারা আমাদের কষ্ট বোঝে না, তারা মানুষের ভালো করবে কী করে?"
আইনের তোয়াক্কা নেই যেখানে
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্পষ্ট এক আচরণ বিধি আছে। সেখানে আমাদের অর্থাৎ গাছের গায়ে পোস্টার বা ফেস্টুন সাঁটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু গাছ নয়, দেওয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সরকারি যানবাহনেও প্রচারণা চালানো নিষেধ। পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহারে দেওয়া হয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
আমার কথা না হয় বাদই দিলাম, আমি তো কেবল একটি গাছ। কিন্তু এই দেশের যে আইন, সেই আইনকে এভাবে অবজ্ঞা করা কি ঠিক? প্রার্থীরা যখন ভোট চাইতে আসেন, তখন তো অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। কিন্তু আমাদের বুকে পেরেক ঠুকে তারা যে ক্ষতের সৃষ্টি করছেন, তা কি আইনের চোখে পড়ে না?
আইন যখন শুধুই কাগজে
ইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রচারণায় কোনো অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না। অথচ মতিয়ার রহমান ফরাজীর সেই ফেস্টুনটি পলিথিনে মোড়ানো। বৃষ্টির হাত থেকে পোস্টার বাঁচাতে তারা আমাদের পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
আমাদের শরীর দিয়ে যখন পেরেক ঢোকানো হয়, তখন কেবল আমাদের বাকলই ফেটে যায় না, আমাদের বৃদ্ধি থমকে যায়। আমরা তো এই দেশেরই সম্পদ। আমাদের এভাবে ক্ষতবিক্ষত করে কীসের উন্নয়ন হবে?
শেষ কথা
আমরা গাছেরা হয়তো ভোটার নই, তাই আমাদের আর্তনাদ প্রার্থীদের কানে পৌঁছায় না। কিন্তু প্রকৃতির একটা নিজস্ব বিচার আছে। যারা আজ আমাদের গায়ে পেরেক ঠুকে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন, সচেতন মানুষ তাদের এই কর্মকাণ্ডকে কীভাবে দেখছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের একটাই মিনতি— আমাদের বুক থেকে এই পেরেকগুলো উপড়ে ফেলুন। আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দিন। আইন তো সবার জন্য সমান, তবে আমাদের ওপর কেন এই অবিচার?
( এই রম্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে শুক্রবার বাস্তব অবস্থা দেখে। দৃশ্যটি চোখে পড়ে জামদিয়ার নড়াইল মহাসড়কে। তৎক্ষণাৎ ছবি তোলেন ধ্রুব নিউজের প্রতিনিধি। )