বিশেষ প্রতিবেদক
ছবি: প্রতীকী
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক গণভোট। নির্বাচন কমিশন ও প্রার্থীরা যখন ভোটের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করতে পর্দার আড়ালে এক ভয়াবহ ও সমন্বিত ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, পতিত স্বৈরাচারী শক্তি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন বানচাল করতে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল ‘অপারেশন ফান্ড’ বা তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। এই অর্থের অর্ধেক অর্থাৎ ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তাদের নিষ্ক্রিয় করার জন্য। বাকি ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজপথে বড় ধরনের অস্থিরতা ও নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনায়।
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী শাসনামলে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সরানো প্রভাবশালী শিল্পপতিরা এই ফান্ডের মূল যোগানদাতা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাদের ঢাকায় ছদ্মবেশে জড়ো করা হচ্ছে, যাতে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির করে দেওয়া যায়।
নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রের অন্যতম একটি অংশ হলো প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা অনুগত কর্মকর্তাদের সক্রিয় করা। বিগত ১৬ বছরে পুলিশ, আনসার ও সিভিল প্রশাসনে যারা প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের সাথে বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত সাবেক প্রভাবশালী আইজিপি ও আমলাদের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। উদ্দেশ্য হলো—ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে ফেলা এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনীহা তৈরি করা। বিশেষ করে কলকাতার মতো জায়গায় বসে পতিত সরকারের প্রভাবশালী নেতারা এখন ছক কষছেন কীভাবে নির্বাচনের মাঠকে নিরাপত্তাহীন করে তোলা যায়।
নির্বাচনী পরিবেশ কলুষিত করতে এবার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই সম্প্রতি উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ভুয়া তথ্যের এক ‘বন্যা’ বয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এআই ব্যবহার করে সাভারের রানা প্লাজা ধসে হাত হারানো শ্রমিকের ছবি দিয়ে কোনো একটি বিশেষ দলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এমনকি খোদ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা ব্যক্তির ভুয়া ভিডিও তৈরি করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যা নিয়ে সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে কড়া সতর্কতা জারি করেছে। টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবে লাখ লাখ মানুষ এসব এআই ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কোনো কোনো ভিডিওতে প্রার্থীরা ‘নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন’ এমন মিথ্যা ঘোষণা প্রচার করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
নির্বাচন বানচালের এই অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টার সমান্তরালে আন্তর্জাতিক মহলেও শুরু হয়েছে অপপ্রচার। সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে আওয়ামী লীগের নেতারা ১৭ মাস পর সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, ড. ইউনূসের সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম নয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশের মাটিতে বসে এমন বক্তব্য মূলত একটি আন্তর্জাতিক লবিংয়ের অংশ, যার লক্ষ্য ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে বিতর্কিত করে এর বৈধতা নষ্ট করা।
সব ষড়যন্ত্র ও ‘ডিজইনফরমেশন ওয়ার’ মোকাবিলায় ড. ইউনূস বারবার ১২ ফেব্রুয়ারির তারিখটি উচ্চারণ করছেন। এটি কোনো সাধারণ ঘোষণা নয়, বরং একটি ‘পলিটিক্যাল ডিফেন্স’। তিনি বোঝাতে চাইছেন, রাজপথে সন্ত্রাস বা অনলাইনে গুজব—কোনো কিছু দিয়েই এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ থামানো যাবে না। তিনি জানেন, তারিখটি সামান্য পেছালেই ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের জাল আরও শক্ত করার সুযোগ পাবে। তাই রাষ্ট্র সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রক্ষায় তিনি ইস্পাতকঠিন অবস্থানে রয়েছেন।