ধ্রুব ডেস্ক
বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস) আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ছবি: সংগৃহীত
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন করার প্রবণতায় লাগাম টানতে আগামী শনিবারের (১১ জুলাই) মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস) আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই হুঁশিয়ারি দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণি অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদে সন্তান প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। এখন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটলেও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা বেড়েছে।
মন্ত্রীর দাবি, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’—এমন আশঙ্কা তৈরি করে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় পরিবারগুলো এই ফাঁদে পা দেয়।
তিনি বলেন, কিছু বেসরকারি ক্লিনিক ও দালালচক্র গর্ভবতী নারীদের নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে সিজারিয়ান করাতে উদ্বুদ্ধ করছে। এই অবস্থা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
সব ক্লিনিকে লেবার রুম ও মিডওয়াইফ বাধ্যতামূলক
সিজারিয়ানের এই প্রবণতায় লাগাম টানতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী শনিবারের (১১ জুলাই) মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, সব বেসরকারি ক্লিনিকে মিডওয়াইফ (ধাত্রী) নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে গর্ভবতী নারীরা স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক পরামর্শ পাবেন এবং স্বাভাবিক প্রসবে উৎসাহিত হবেন।
স্বাস্থ্যখাতে ১ লাখ নতুন কর্মী নিয়োগ
মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্য শিশুদের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিডওয়াইফদের ভূমিকা অপরিসীম।
তিনি জানান, চলতি বছর স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের একটি বড় অংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
ধাত্রীদের কর্মসংস্থানের সংকট
কর্মশালায় জানানো হয়, একজন ধাত্রী (মিডওয়াইফ) ৪০টি নরমাল ডেলিভারি করানোর পর রেজিস্ট্রেশন পান। প্রতি বছর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রায় ৫ হাজার ৮০০ জন দক্ষ ধাত্রী তৈরি হলেও স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের সিংহভাগই ঝরে পড়ছেন। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বছরে মাত্র ৫০০ জন ধাত্রী কাজের সুযোগ পান, বাকিরা সাধারণ নার্স হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে দক্ষ জনবলের অভাব ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সন্তান প্রসবের সময় দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার এবং বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতার প্রমুখ।