❒ বাড়ছে অসংক্রামক রোগ
শেখ জালাল
ছবি: এআই প্রণীত
শৈশবে নেই কোনো শারীরিক কসরত, হারিয়ে গেছে খেলার মাঠ। ধুলোবালি মাখা শৈশবের বদলে চার দেয়ালে বন্দি প্রজন্মে ভর করছে প্রযুক্তি-আসক্তি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নাগরিক জীবনের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যবিধি মানার চরম উদাসীনতা। মূলত এই তিন আত্মঘাতী অভ্যাসের চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে যশোরবাসীকে। জেলায় এখন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও কিডনি বিকলের মতো অসংক্রামক রোগ। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, ভুল জীবনযাত্রার কারণে মানুষ নিজেই নিজের শরীরে এসব মরণব্যাধি ডেকে আনছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন সাফায়েতের মতে, রোগগুলো হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না। এর বীজ বোনা হয় মূলত শৈশবে। বর্তমান সময়ের শিশুরা শারীরিক পরিশ্রমহীন এক অলস বৃত্তে বড় হচ্ছে। ফলে অল্প বয়সেই তাদের মেটাবলিজম বা হজমপ্রক্রিয়া ভেঙে পড়ছে, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। কেবল মাঠের অভাব নয়, রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের চর্চাও রোগ ছড়ানোর বড় অনুঘটক। অতিরিক্ত ভোজ্যতেল এবং খাবারে কাঁচা বা বাড়তি লবণের লাগামহীন ব্যবহার প্রতিটি পরিবারকে স্ট্রোক ও লিভার সিরোসিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে তামাকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণ পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোগের এই ভয়াবহ বিস্তারের একটি স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। সরকারের বিশেষ আর্থিক সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরের মাত্র শেষ ছয় মাসেই (তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তি) আবেদন জমা পড়েছে ৭৮০টি। অথচ বিগত ২০২৪-২৫ পুরো অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৯৮২। মাত্র ছয় মাসের এই চিত্র প্রমাণ করে, ঘরের দোরগোড়ায় রোগ কতটা নিঃশব্দে থাবা বসাচ্ছে।
আবেদনকারীদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ক্যানসারে—যার সংখ্যা ৪০৪ জন। এছাড়া স্ট্রোকে প্যারালাইজড ১৪৫ জন, কিডনি রোগে ৯০ জন, জন্মগত হৃদরোগে ৬৫ জন, থ্যালাসেমিয়ায় ৬০ জন এবং লিভার সিরোসিসে ভুগছেন ১৬ জন। ভৌগোলিক দিক থেকে যশোর সদর উপজেলায় আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি, সেখান থেকে আবেদন এসেছে ২৩৭টি। এছাড়া মণিরামপুরে ১১০, কেশবপুরে ৯১, শার্শায় ৮৫, বাঘারপাড়ায় ৭৩, শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে ৫৪, চৌগাছায় ৪৯, ঝিকরগাছায় ৪৮ এবং অভয়নগরে ৩৩ জন এই তালিকায় রয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর ৮৫ শতাংশই ঘটছে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। যশোরেও এর ব্যতিক্রম নয়। ২৫০ শয্যা হাসপাতালের বিশেষায়িত এনসিডি (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) কর্নারে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন রোগী ভিড় করছেন। কিন্তু জেলা পর্যায়ে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় এই বিপুলসংখ্যক রোগীকে ছুটতে হচ্ছে দূর-দূরান্তে। ফলে চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
এই বিপর্যয় থেকে বাঁচার উপায় কেবলই সচেতনতা। হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন সাফায়েত স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওষুধ খেয়ে এই রোগ ঠেকানো যাবে না, পরিবর্তন আনতে হবে অভ্যাসে। শিশুদের প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা মাঠে দৌড়ঝাঁপ নিশ্চিত করতে হবে। রান্নাঘরে মাসের তেলের খরচ দেড় লিটারে নামিয়ে আনা, দৈনিক লবণ খাওয়া ৫ গ্রামের নিচে রাখা এবং খাদ্যতালিকায় ৪০০ গ্রাম শাকসবজি রাখা এখন আর কেবল পরামর্শ নয়, বেঁচে থাকার বাধ্যতামূলক শর্ত। সরকার অবশ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের সুবিধার্থে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত এই চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করেছে।
যশোরের সিভিল সার্জন মাসুদ রানা বলেন, ক্যানসার বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা সামলাতে সমন্বিত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন ঠিকই, তবে ব্যক্তি সচেতনতাই এখানে শেষ কথা। অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং নিজের চারপাশের পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার মাধ্যমেই কেবল এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।