ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
৩০ জুন শেষ হলো ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের হিসাব বা ‘জুন ক্লোজিং’। প্রতি বছর জুন ক্লোজিংয়ের এই সময়টায় ব্যাংক পাড়ায় এক ধরণের উৎসবমুখর ব্যস্ততা থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই জুন ক্লোজিংয়ে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা কোনো উৎসবের নয়; বরং চরম উদ্বেগ ও গভীর সংকটের। সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কারের নানা উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কড়া নীতির কথা শোনা গেলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তগুলো খাতের যে কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচন করেছে, তা এক কথায় বেশ আশঙ্কাজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন এক চরম বৈপরীত্য ও কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে লিকুইডিটি বা অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই বিপুল তারল্য দেশের উৎপাদনশীল বা বেসরকারি খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না। ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলো এখন তাদের অর্থ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের না দিয়ে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছে। একে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ক্রেডিট ক্রাউডিং আউট’, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে।
ব্যাংক খাতের এই ভঙ্গুরতার মূল কারণ খুঁজতে আমাদের তাকাতে হবে খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড়ের দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (মার্চ ২০২৬) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মোট বিতরণকৃত ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশই এখন খেলাপি! মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়, সেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন আমরা জানতে পারি, খেলাপি, অবলোপন (write-off) এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণসহ পুরো খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ আসলে প্রায় ১০ লাখ ৮৭ কোটি টাকা—যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ ! অর্থাৎ, ব্যাংকের হাতে থাকা অর্ধেকের বেশি সম্পদ থেকে কোনো প্রকার আয় আসছে না।
ঋণের এই গুণগত মান নষ্ট হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা গুঁড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যেখানে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CRAR) সাড়ে ১২ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে আমাদের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের এই অনুপাত নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে (নেগেটিভ)। প্রায় ২০টি ব্যাংক এখন মারাত্মক মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
আরও পড়ুন-
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড : শতবর্ষের আলো ও আগামী দিনের প্রত্যাশা
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে ব্যাংকগুলোর লাভ-ক্ষতির হিসাবে। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক বা পূবালী ব্যাংকের মতো হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি ও বহুজাতিক ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা করলেও, রাজনৈতিক প্রভাব ও লুণ্ঠনের শিকার হওয়া ১০টি বড় ব্যাংকের বিপুল লোকসানের কারণে পুরো খাতটিই এখন লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে, পুরো খাতের সামগ্রিক বার্ষিক লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে জুন ক্লোজিংয়ের ঠিক শেষ মুহূর্তে (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ বা এককালীন বিদায় সুবিধা এবং প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সুদ মওকুফের মতো কিছু বিশেষ শিথিলতা ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এর মাধ্যমে ব্যালেন্স শিট বা হিসাবের খাতা কিছুটা পরিষ্কার হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বারবার এমন বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দেওয়া আসলে ‘টোটকা চিকিৎসা’ মাত্র। এতে সাময়িকভাবে কাগজের কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো গেলেও, ব্যাংকিং খাতের মূল রোগ—দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রাজনৈতিক অনুকম্পায় ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের প্রশ্রয় দেওয়া—তা নিরাময় হয় না।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংক খাত সংস্কার ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষায় ৪৫ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (ADB) নজর রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বা ঋণের চেয়েও বড় প্রয়োজন আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
আরও পড়ুন-
নাফ নদীর ওপারে ভূ-রাজনীতি, এপারে নিরাপত্তা হুমকি
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই জুন ক্লোজিং কেবল একটি অর্থ-বছরের হিসাব মেলানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর ঋণ আর শর্তের বেড়াজালে পড়ে যে সংস্কারের গল্প আমরা শুনছি, তা দিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মূল রোগ নিরাময় অসম্ভব। ব্যাংক খাতকে এই লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করে আনতে হলে সবার আগে প্রয়োজন ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance)। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, কোনো অদৃশ্য সুতোর টান ছাড়া কাজ করতে দিতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটি যেন রাজনৈতিক অনুকম্পার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা একবার পুরোপুরি ভেঙে পড়লে, তা জোড়া লাগানোর মতো কোনো অর্থনৈতিক সূত্র দুনিয়ার কোথাও নেই। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই ভঙ্গুর হৃৎপিণ্ডে বড় অস্ত্রোপচার আজ অপরিহার্য।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত।