এম কে জামান
ছবি: এ আই প্রণীত
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা প্রাচ্যবিদ্যার উদ্ভব ও এর নেপথ্যে থাকা মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। এই পর্বে আমরা এমন কিছু শীর্ষস্থানীয় প্রাচ্যবিদের কাজের ধরণ, তাদের গবেষণার আড়ালে থাকা লুকানো এজেন্ডা এবং মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। ইতিহাস ও গবেষণার স্বচ্ছ চশমা দিয়ে প্রাচ্যবিদদের এই কর্মকাণ্ডকে বিচার করলে আমরা তাদের কথিত 'নিরপেক্ষ' গবেষণার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থের যে কঙ্কালরূপ দেখতে পাই, তা নিয়ে আমরা এখানে আলোকপাত করছি।
এইচ এ আর গিব (H. A. R. Gibb) তিনি আমেরিয়ান হার্টফোরড ইউনিভারসিটি অধ্যাপক ও ইসলামী বিশ্বকোষের প্রকাশক ও প্রথম সারির লেখক । তার লেখা তারিকুল ইসলাম, আল মাযহাবুল মুহাম্মাদি, আল ইসলাম অয়াল মুজতামাউল গরবি বই বিশেষ প্রসিদ্ধ লাভ করে । গোল্ড যেহের (Gold Ziher) ইসলাম বৈরী লেখক হিসাবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে তার । কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে তার প্রচুর লেখালেখি রয়েছে । এস এম জুইমার (S. M Zweimer) একজন মিশনারি প্রাচ্যবিদ । মার্কিন মিশনারিদের পত্রিকা আল আলামুল ইসলামিয়া এর প্রতিষ্ঠাতা । ১৯১১ সালে ভারতের লাখনৌতে দ্বিতীয় মিশনারি কনফারেন্সে পঠিত সকল প্রবন্ধ তার তত্ত্বাবধানে আল ইসলাম নামে একটি সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল । জি ভন গ্রাউনবাম ( G. Von Graunbaum) প্রাচ্যবিদ মহলে তার লেখা অনেক জনপ্রিয় । আমেরিকায় বসবাস করলেও তিনি মূলত জার্মান ইয়াহুদি । ইসলামুল উসুরিল উসতা (১৯৪৬), আল আইয়াদুল মুহাম্মাদিয়াহ (১৯৪৭), আল ইসলাম (১৯৫৭) বিশেষ ভাবে প্রসিদ্ধ । A.J Ar Arberry তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইসলামী বিশ্বকোষের লেখক । ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি প্রসিদ্ধ ।
ফিলিপ কে হিট্টি ( Ph. K. Hitti ) তিনি আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভারসিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অনুষদের অধ্যাপক ছিলেন । মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেন । তার চিন্তা চেতনা ছিল মানব সভ্যতা বিনির্মাণে ইসলামকে খাটো করা । প্রসিদ্ধ লেবানিজ মিশনারি হয়েও তিনি প্রাচ্যবিদদের নেতৃত্ব দিয়েছেন । তার লেখা “The History of the Arabs” এশিয়ায় ইসলাম চর্চায় সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে । যদিও তার লেখায় চরম মিথ্যাচার ও ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব ফুটে উঠেছে । তথাপি বাংলাদেশসহ এশিয়ার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে তার বই পড়ানো হয় । এল ম্যাসিগণন ( L Massignon) শীর্ষস্থানীয় ফরাসী প্রাচ্যবিদ । সাম্রাজ্যবাদী ফরাসী সরকারের দক্ষিণ আফ্রিকা বিষয়ক উপদেষ্টা । প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে একাধারে পাঁচ বছর ফরাসী সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন । ইসলামী তাসাউফ ও দর্শন শাস্ত্রে তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল আর এন নিকলসন (R.N Nickolson) আধুনিক প্রজন্মের শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ । ইসলামী বিশ্বকোষের অন্যতম লেখক । তিনি মনে করেন ইসলাম এমন একটি বস্তুবাদী ধর্ম যা মানবিক মূল্যবোধের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ নয় । তার লেখা বেশ জনপ্রিয় । আত তাসাউউফু ফিল ইসলাম ও মুহাম্মাদ ওয়া মাতলাউল ইসলাম বই দুটি প্রাচ্যবিদ মহলে বিশেষ স্থান পেয়েছে । প্রাচ্যবিদরা ইসলাম ও ইসলামঘনিষ্ঠ বিষয়ে লেখালেখির সময় কখনোই স্বতঃসিদ্ধ মানদণ্ড অনুসরণ করে না । তাদের অধিকংসই কোন বিষয়ে গবেষণার পূর্বে সেই বিষয়ে নিজেদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি বসিয়ে নেয় । তারপর বিষয়টিকে যুক্তিযুক্ত ও প্রমাণ করার জন্য দলিল সংগ্রহ শুরু করে । সেই দলিল শুদ্ধ কি অশুদ্ধ সেটা নিয়ে মাথা ব্যাথা থাকে না । যদি তারা তাদের গবেষণাকর্মে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ না করতো তবে তা বিশ্বাসীর কাজে আসতো ।
তাদের কিছু দুরভিসন্ধি ও স্বার্থসিদ্ধির গবেষণার প্রমাণ মেলে ধরতে চাই । গোল্ড যেহের একজন প্রসিদ্ধ প্রাচ্যবিদ । তিনি জীবনভর একটি জলজ্যান্ত সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে, হাদিসের সুবিশাল ভাণ্ডার রাসুল (সঃ) এর কথা নয় । এগুলো হিজরি প্রথম তিন শতাব্দীর আবিষ্কার । গোল্ড জেহের দাবি তুলেছে যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীতে মুসলমানদের সামনে শরিয়তের বিধি বিধান স্পষ্ট ও সুবিদিত ছিল না । বড় বড় ইমামগনও রাসুলের সিরাহ ও জীবনপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিল না । তিনি দিমইয়ারির “হায়াতুল হাইওয়ান” থেকে বর্ণনা নকল করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছে যে, বদর যুদ্ধ আগে হয়েছে না ওহুদ যুদ্ধ তা ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও জানতেন না । অথচ যে ক’জন ইমামের জ্ঞান সারা দুনিয়ায় মুগ্ধতা ছড়িয়েছে ও ফেকহার মাঝে যুদ্ধনীতি সম্পর্কে সর্বাধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফাই স্ববিশেষ প্রসিদ্ধ । তার এ দাবিগুলোর পক্ষে তিনি ইতিহাসের নর্দমা খুঁড়ে কয়েকটি ছুড়ে ফেলা বর্ণনা এনে হাজির করেছে ।
ভারসাম্যহীন এক চোখা মুসতারিকদের প্রবৃত্তির নিক্তিতে জ্ঞানচর্চার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি । জারাহ ও তা’দীল তথা হাদিসের শুদ্ধতা নিরীক্ষণ শাস্ত্রের সকল জ্ঞানী গুণীজন এক বাক্যে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব যুহরী রহঃ কে নির্ভরযোগ্য হাদিসবেত্তা মনে করেন । সাথে তার আল্লাহভিরুতা, বিশ্বস্ততা ও ধার্মিকতা নিয়ে বহু বই পুস্তক দলিল দস্তাবেজ পাওয়া যায় । কিন্তু প্রাচ্য পণ্ডিতেরা কিছুতেই তা মানতে নারাজ । তাদের দাবি তিনি উমাইয়া শাসক আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে খুশি করতে জাল হাদিস বানায়েছেন । পশ্চিমা পণ্ডিতেরা মূলত তাদের লেখনীর দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ঘাত ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে সবসময় । তারা এটা বলার চেষ্টা করেছে যে, বিজয়ী আরবরা অধীনস্থ আরবদের সাথে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করতো । ব্রুকলিমান (Broclemann) রায়িয়াতি শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা করে বলেন, “ যখন আরব জাতী শাসকরূপে আবির্ভূত হয় তখন অনারবদের দ্বিতীয় স্তরের পণ্য মনে করতো । অথচ আরবরাই প্রথম জাত-পাতের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণ করেছিলেন । সাম্য আর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে যে আইন-আদালত ও সামাজিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম গবেষক নবী চরিতের যে বিষয় গুলোতে একমত পোষণ করেছেন প্রাচ্যবিদরা সেগুলোকে ভেঙ্গে চুরে একাকার করে ফেলতে উঠে পড়ে লেগে আছে । তাদের দীর্ঘ অধ্যবসায় ও শেকড় স্পর্শী সাধনার পরিমাণ এতো বেশি যে সেগুলোর ঝড়ে নবিজীর সিরাতের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়গুলো বিতর্কিত না হলেও তাতে তারা সংশয়ের ঘুন ধরাতে সক্ষম হয়েছে । তারা যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিল তা আজ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সুইডেন সহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে । এই ওরিয়েন্টালিস্ট পাদ্রী পণ্ডিতরা পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষাগুরু হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে । স্কটল্যান্ডের এডিনবরা ও গ্লাস্কো ইউনিভার্সিটির ইসলামী গবেষণা বিভাগের প্রধান একজন পাদ্রী ওরিয়েন্টালিস্ট । ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইসলামিক এন্ড এরাবিক স্টাডি অনুষদের প্রধান হলেন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ এ জে আরবারি (A. J. Arberry) । ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রোবোসন ইসলামের ইতিহাসের উপর প্রচুর লেখালেখি করেছেন । নেদারল্যান্ডের লিডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোসেফ স্কচ ও সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নিরবারজ দুজনই ইয়াহুদি ওরিয়েন্টালিস্ট । ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবের জন্য তারা বেশ প্রসিদ্ধ । গোল্ড জেহেরের যোগ্য শিস্য । এভাবে ইউরোপ থেকে আমেরিকা সব জায়গায় ওরিয়েন্টালিস্টরা ইসলাম ও মুসলামানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে । তাদের মিশন হলো, ইসলামের শুভ্র বদনে কালিমা লেপন করে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী মনোবাসনা পূর্ণ করা ।
পরিশেষে বলতে চাই, যখন সামরিক ও রাজনৈতিক ভাবে ক্রুসেডাররা পরাজিত হয় তখন পশ্চিমারা ইসলাম ও মুসলমানদের থেকে ভিন্ন কৌশলে প্রতিশোধ নেয়ার পথ খুঁজতে থাকে । সেই প্রতিশোধ প্রবৃত্তি থেকেই তারা ইসলামের উপর গভীর জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করে । মুসলামদের সেনসিটিভ জায়গা গুলো চিহ্নিত করে সেখানে আঘাত করতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের প্রোজেক্ট হাতে নেয় । মুসলমানদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধঃপতনের সুযোগ পশ্চিমারা হাতছাড়া করেনি। মুসলামদের দুর্বল দিক গুলো নিয়ে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে । তাদের ক্ষুরধার গবেষণায় ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি আমরা । বড্ড বেশি জুলুম করে ফেলি নিজেদের আত্মার উপর । অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দী ধরে পশিমারা বস্তবাদ ও জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় প্রভূত উন্নতি লাভ করে । এ সফলতা প্রাচ্য পণ্ডিত লেখকদের মনে প্রচণ্ড অহমিকা সৃষ্টি করে । নিজেদেরকে নতুন করে মেলে ধরে । মুসলিম শিক্ষিত সমাজ তাদের সর্বগ্রাসী বক্তব্য ও গবেষণার রচনাশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে মনের অজান্তেই তাদের ভক্ত হয়ে পড়ছে । এমনকি তাদের গবেষণা পত্রে পশ্চিমাদের রচনাবলী থেকে রেফারেঞ্চে টুকতে শুরু করে । এভাবে ধীরে ধীরে মুসলিম লেখকদের শাশ্বত নীতিমালার বিপরীতে ইউরোপিয়ানদের চিন্তাধারা উপর আস্থা জন্মাতে থাকে । মুসলিম স্কলাররা ইসলামি জ্ঞান উৎসের মূলভিত্তির দ্বারস্থ না হয়ে ওরিয়েন্টালিস্ট ও অপারাপর ইউরোপিয়ান গবেষকদের জ্ঞানচর্চার ধারা অনুসরণ করে । দীর্ঘ দিন ধরে এই হীনমন্যতাবোধ ও মানসিক বৈকল্য অব্যাহত থাকে ।
এক পর্যায়ে এসে আমাদের মাঝে ইউরোপীয় উপনিবেশিকের গোলামীর জিঞ্জির ভেঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের স্পৃহা জেগে উঠে । এতোদিন আমরা যেভাবে নিজেদের ঐতিহ্য বিশ্বাস আর শরিয়ত জানার জন্য মুসতারিকদের উপর নির্ভর করেছিলাম, তা নিয়ে নিজেদের মাঝে অনুতাপ ও অনুশোচনা হয় । তাদের রচনাবলীর নেপথ্যের কাহিনী, সাম্রাজ্যবাদী ও ধর্মীয় স্বার্থের কালো মুখোশ উম্মোচন করতে চেষ্টা করি । যদিও আমরা এখনো যথেষ্ট পরিপক্ব হয়ে উঠেনি, তবু লক্ষ্য পানে ছুটে চলছি নিরন্তর । আল্লাহ চাহেন তো সে দিন বেশি দুরে নয়, যেদিন আমরা ওরিয়েন্টালিস্টদের প্রতারণার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবো । আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের জ্ঞান বিজ্ঞান ও চিন্তাধারা পরখ করবে । অপবাদের সেই জঞ্জাল খোদ তাদের উপর আঁচড়ে পড়বে যা এতদিন তারা আমাদের উপর ছোড়ার চেষ্টা করেছে । তারা কুরআন সুন্নাহ পরখ করার যে মাপকাঠি ও নীতিমালা দাঁড় করিয়েছে তা অন্তঃসারশূন্য হিসাবে বিবেচিত হবে । প্রতিরোধের কোন হাতিয়ার তাদের হাতে থাকবে না । আমরা তাদের হাঁটু কাঁপার দৃশ্য দেখার অপেক্ষা করছি ।
প্রথম কিস্তি পড়ুন-
প্রাচ্যবিদদের ইসলাম চর্চার আড়ালে/এক
প্রাচ্যবিদরা যে নিক্তিতে ইসলামকে সমালোচনা করেছে তার বিপরীতে মুসলিম গবেষকরা সঠিক তথ্য আবিষ্কার করে তাদের ভদ্র পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঙ্কাল দেহ বের করে নিয়ে আসবে । আর ওই সমস্ত কৃষ্টি কালচার যে সকল জ্ঞানী-গুণী, ঋষি-মুনি বহন করছেন তাদের সফেদ বদন ফ্যাকাসে হবে । যে মানদণ্ড ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবী মহল দাঁড় করিয়েছে সেই মানদণ্ডে তাদের ধর্ম বিশ্বাস শিক্ষা সভ্যতার চিত্র অংকন করবে । সেই শৈলীতে কলম ধরবে যে শৈলীতে প্রাচ্যবিদরা আমাদের বিরুদ্ধে মসি চালিয়েছে । এখন সময় হয়েছে ফিরে আসার । মুসলিম মনিষীদের রেখে যাওয়া জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে মণিমুক্তা সংগ্রহ করে আত্ম লাঞ্ছনার কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে । সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে আমাদের মাটিচাপা জ্ঞান ঐতিহ্য বিশ্ব দরবারে মেলে ধরবো। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পূর্ণ জাতি হিসাবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হওয়ার শুভ লগ্ন চলে এসেছে । গোল্ড জেহেরের মতো বিকৃতিবাজ প্রাচ্যবিদের প্রতি মোহ কাটিয়ে উঠে ন্যায়নিষ্ঠ প্রাচ্যবিদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে । যারা প্রাচীন মূল্যবান কিতাবাদি অনুসন্ধানে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এবং সততার মানদণ্ড থেকে কখনো বিচ্যত হননি । কারণ জ্ঞান কারো পৈত্রিক সম্পত্তি নয় । ইসলাম সার্বজনীন । সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর দেয়া এক বিশেষ নেয়ামত । পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ তা অনুসরণ করতে পারে ।
প্রাচ্যবিদরা তাদের নিরন্তন গবেষণা ও অনুসন্ধানের যেসব কীর্তি স্থাপন করেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রে নিঃশর্ত প্রশংসা, অন্ধ অনুকরণ ও নিরংকুশ সমালোচনা কোনোটাই সঠিক নয় । আমরা মুসলমান । ইসলাম আমাদের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা । ইসলাম ধর্ম আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে, আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে চলবো । আপন পর সবার সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবো । স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন – কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না । সুবিচার করো । এটই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী । সুরা মায়েদা
বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে তারা আমাদের এক উম্মাহমুখী দৃষ্টিভঙ্গি মাটিচাপা দিতে সবকিছু কর যাচ্ছে। যেমন, মিশরে ফিরআউনিয়তের উন্মেষ ঘটাচ্ছে । সিরিয়া লেবানন আর ফিলিস্তিনে ফেনোশিয়ান মতবাদ উগড়ে দিচ্ছে । গোটা দুনিয়াতে আজ তারা আধুনিক সভ্যতার নামে নিজেদের মনগড়া কৃষ্টি কালচার ও মতবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে । আমরাও তা নীরবে নিভৃতে অতি সানন্দে মাথা পেতে মেনে নিচ্ছি । তারা সবসময় চেয়েছে, আমরা যেন নতুন করে সভ্যতা-সংস্কৃতির নেতৃত্বভার তুলে নিতে না পারি । আমরা অভিন্ন স্বার্থ, একক ইতিহাস, উন্নত নৈতিকতা ঈরষনীয় মূল্যবোধ ও অদ্বৈত বিশ্বাসের সূত্রে এক প্লাটফর্মে সংঘবদ্ধ হতে না পারি । তাই যদি সত্যি হয় তবে বিশ্বাসীদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার অদম্য স্পৃহা ও ঐশ্বরিক শক্তি হারিয়ে যাবে মহাকালের গর্ভে । আসুন, আবার আপন করে ভাবি আর নিজেদেরকে মুক্ত করি ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে । ফুল হয়ে ফুটি আর প্রভাতের স্নিগ্ধ আলো গায়ে মেখে নতুন করে সাজি ।
কেননা প্রাচ্যবিদদের এই জ্ঞানচর্চা নিছক কোনো নিরপেক্ষ গবেষণা ছিল না, বরং তা ছিল সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার। আমাদের সোনালি ইতিহাসের ওপর যে কুয়াশা তারা তৈরি করেছে, তা ভেদ করা নতুন প্রজন্মের প্রধান দায়িত্ব। ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে আমরা আমাদের শেকড়কে পুনরায় খুঁজে পাই এবং বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
আমাদের মুসলিম মনীষীদের রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার থেকে মণিমুক্তা সংগ্রহ করে আত্মলাঞ্ছনার কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে। সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে আমাদের মাটিচাপা জ্ঞান-ঐতিহ্য বিশ্বদরবারে মেলে ধরতে হবে। এখন জাতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হওয়ার শুভ লগ্ন চলে এসেছে।
এই লড়াই কেবল ইতিহাসের পাতা উল্টানোর নয়, বরং নিজেদের সত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করার। প্রাচ্যবিদদের তৈরি করা কুয়াশা ভেদ করে আমরা কতটা সফল হতে পেরেছি, তা জানতে এবং এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের চূড়ান্ত রূপরেখা বুঝতে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা আলোচনা করে দেখিয়েছি, নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই বৈকল্য কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক