নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রফেসর শরীফ হোসেন ছবি: সংগৃহীত
যশোর : বাংলাদেশের লাইব্রেরি আন্দোলনের পথিকৃৎ, উপমহাদেশের বইমেলার স্বপ্নদ্রষ্টা, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক প্রফেসর মো. শরীফ হোসেন-এর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের এই নিবেদিতপ্রাণ কারিগর আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে গোটা দেশ।
১৯৩৪ সালে যশোরের খড়কীতে জন্ম নেওয়া এই মহান ব্যক্তিত্ব ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন অনন্য মেধার অধিকারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে রেকর্ড নম্বরসহ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা শরীফ হোসেন কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থেকে তিনি প্রমাণ করেছিলেন তাঁর দেশপ্রেম। তিনি শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘকাল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত খুলনায় সরকারি ব্রজলাল কলেজের অধ্যাপক এবং ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাইকেল মধুসূদন কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের লাইব্রেরি আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল বই আর পাঠাগার। দীর্ঘ ২০ বছর অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যশোর পাবলিক লাইব্রেরিকে তিনি পরিণত করেছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালায়। আজ আমরা যে বইমেলা নিয়ে গর্ব করি, তার প্রেক্ষাপট রচনায় প্রফেসর শরীফ হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৬৭ সালে যশোরে তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত বইমেলাটি ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম প্রারম্ভিক আয়োজন, যা পরবর্তীকালে সারা দেশে বইমেলার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তৃণমূলের মানুষের কাছে বই পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ বেসরকারি গ্রন্থাগার পরিষদ’। তাঁর অনুপ্রেরণায় দেশের গ্রামে-গঞ্জে কয়েক হাজার পাঠাগার গড়ে ওঠে।
প্রফেসর শরীফ হোসেন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রখ্যাত শিল্পপতি সেখ আকিজ উদ্দিনের সাথে মিলে ১৯৮০ সালে ‘আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক বিশাল আশ্রয়স্থল।
এছাড়াও তিনি যশোর এতিমখানা (আঞ্জুমানে খালেকিয়া), শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ‘সন্দীপন’ এবং আরও অসংখ্য শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
২০০৭ সালের এই দিনে তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারায় একজন সত্যিকারের অভিভাবককে। তাঁর কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। আজ ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সবার কামনা প্রফেসর শরীফ হোসেনের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়; তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারগুলোর প্রতিটি বইয়ের পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
আমরা এই মহান কীর্তিমান মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি।