মো. খায়রুল আবেদীন
মো. খায়রুল আবেদীন ছবি: সংগৃহীত
১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি ও তৎকালিন আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সীমান্ত চুক্তি হল ডুরান্ত লাইন চুক্তি। আফগান ও ব্রিটিশ ভারতের সীমানা নির্ধারণের জন্য ২৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন নির্ধারণ করা হয়। যা নির্ধারিত হয় বিট্রিশ ভারতের কূটনৈতিক প্রতিনিধি মর্টিমার ডুরান্ড এর নামানুসারে।
ডুরান্ড লাইন মূলত সামরিক শক্তিতে বলিয়ান ব্রিটিশদের দুর্বল আফগানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া চুক্তি। যার মাধ্যমে পশতু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তৎকালিন আফগান আমির আব্দুর রহমান খান নিজ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ডুরান্ড লাইন চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হন। পশতুনরা ডুরান্ড লাইনের মাধ্যমে আফগানিস্তানও পাকিস্তান দুইদেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যা তাদের মধ্যে স্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দেয়।
পশতুস্থান সৃষ্টির জন্য লড়াই
পশতুভাষী জনসমষ্টি তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পশতুস্থান নামে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম শুরু করে। যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে এক কঠিন সমিকরণে নিয়ে দাড় করায়। আফগানিস্তানে বসবাস কারী পশতুনরা পাকিস্তান ঢুকে সীমান্ত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষ
পাকিস্তান সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষার্থে কাটা তারের বেড়া নির্মাণ শুরু করলে, দুইদেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বৃদ্ধি পায়। আফগানিস্তানের ভিতর থেকে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী সীমান্ত পেরিয়ে পাক নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে হামলা চালায়, ফলে শুরু হয় পাক আফগানিস্তান সীমান্ত লড়াই।
টিটিপির কার্যক্রম
২০০৭ সালে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) গঠিত হয়। যাদের লক্ষ্য আফগান ও পাকিস্তান উভয় দেশে অবস্থিত পশতুন এলাকা নিয়ে নতুন শরীয়াহ ভিত্তিক রাষ্ট গঠন করা। পাকিস্তান টিটিপি কে তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি মনে করে। পাকিস্তানের অভিযোগ টিটিপি আফগান অভ্যন্তর থেকে এসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সশস্ত্র হামলা চালায়। টিটিপির রয়েছে আফগান তালেবানদের সাথে কৌশলগত সর্ম্পক। তারা আফগান তালেবানদের নিকট থেকে সামরিক ও লজিস্টিক সমর্থন পেয়ে থাকে। মনে করা হয় আল কায়েদার সাথেও টিটিপি গভীর সর্ম্পক রয়েছে। ২০২৬ সালে আল কায়েদা এক বিবৃতি প্রকাশ করে টিটিপি কে নৈতিক সর্মথন ব্যক্ত করে। টিটিপি বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মির (BLA) সাথে পারস্পারিক অপারেশনাল সর্ম্পক গড়ে তুলেছে।
"কাতার, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের যুদ্ধ বিরতির উদ্যোগ প্রশংসনীয় কিন্তু তা স্থায়ী রূপ পায়নি। কাজেই মুসলিম বিশ্বকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আফগান ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে পরস্পরকে এগিয়ে আসতে হবে।"
টিটিপির অভিযান
টিটিপি ২০২৬ সালে অপারেশন খাইবার ঘোষণা করে। যার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি স্থাপনা। ২০২৬ সালের ফেব্রয়ারী মাসে বাজাওয়ার জেলায় চালানো ভয়াবহ হামলায় পাকিস্তানের ১১ জন সেনা সদস্য নিহত হন। আত্মঘাতী হামলা হয় ইসলামাবাদের একটি মসজিদে, টিটিপি ছোট অস্ত্রের সাথে ড্রোন ও ব্যবহার করে। ২০২৬ সালে টিটিপি পাকিস্তানে ৩১৪৫ টির মত সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটায় সেখানে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ৮১৯ জনের। যার মধ্যে ছিল বাজাওয়ার সেনা চৌকিতে আত্মঘাতী হামলায় ৮জন পাকিস্তানি সেনা নিহত। ২০২৬ সালের জুন মাসে পেশোয়ারে ৬ জন আধাসামরিক সেনা নিহত হয়। জুলাই মাসে ট্যাংক ডিস্ট্রিক্টে ১২ জন সেনাসহ ১৫ জন নিহত হন।
টিটিপির হামলায় পাকিস্তানে সংকট
দীর্ঘদিনের সীমান্ত যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট তিব্র হয়। মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট দেখা দেয়। বিদ্রোহীদের হামলা প্রতিরোধ ও পালটা আক্রমনের জন্য পাকিস্তানের সামরিক ব্যয় প্রায় ২৫% বেড়ে যায়। দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড থমকে যায়। সীমান্ত বন্দরগুলো বন্ধ থাকায় আঞ্চলিক বাণিজ্যে ধস নামে। সরকারের শুল্ক আদায় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেয়। বিদ্রোহীরা বিদেশী নাগরিকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন হামলা চালালে বিদেশী বিনিয়োগ থমকে যায় এমনকি অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড স্পর্শ করে (৩২%)। দেশে খাদ্য সংকট জ্বালানি সংকট তিব্র আকার ধারণ করে। মানুষের জীবন যাত্রার মান মারাত্মক ভাবে কমে যায়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণ
টিটিপির আক্রমণ প্রতিরোধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাখতুন খোয়া জুড়ে অভিযান শুরু করে। ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগরহার পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। আফগানিস্তান পাল্টা জবাব দিলে পাকিস্তান পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং অভিযান “গজব লিল-হক” ঘোষণা করে কাবুল ও কান্দাহারে বিমান ও ড্রোন হামলা চালায়।
আফগান হাসপাতালে হামলা
২০২৬ সালের ১৬ মার্চ পাকিস্তান কাবুলের এক মাদক নিরাময় হাসপাতালে হামলা করে বসে। এই ভয়াবহ হামলায় ২৬৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। পাকিস্তান জঙ্গী কেন্দ্র বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও বিশ্বব্যাপি নিন্দার ঝড় উঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর মতে পাকিস্তানি হামলায় কমপক্ষে ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে ৪৬ জন শিশু ও ১৩ জন নারী রয়েছে। তবে তালেবান সরকারের দাবি প্রায় ৭৭৯ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের দাবি তাদের হামলায় প্রায় ৫০০ তালেবান সেনা বা সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন এবং বিমান হামলায় ৮০ জন টিটিপি সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে সীমান্ত লড়াইয়ে পাকিস্তান সরকারের হিসাব মতে মোট ২০৮৪ জন উগ্রপন্থী নিহত হয়েছেন।
মানবিক বিপর্যয়
পাক হামলায় আফগানিস্তান এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ বিধবস্ত আফগান নাগরিকদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। কোনো কোনো সূত্রের মতে, যার পরিমাণ প্রায় ১০০০ ছাড়িয়েছে। বিমান হামলার বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। সীমান্ত অঞ্চলের অনেক ক্লিনিক ও হাসপাতাল সেবা দানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
নানা সংকটে ধুকতে থাকা আফগান জনগণের মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকট ও শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। ইউনিসেফের তথ্য মতে এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে ৩৭ লক্ষ শিশু তিব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। যার মধ্যে ১০ লাখ শিশুর জীবন মারাত্মক ঝুকিতে রয়েছে।
আরও পড়ুন-
ইরান রাষ্ট্রের সৃষ্টি: ইহুদিরা বন্ধু থেকে শত্রু
সমগ্র আফগান জুড়ে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেলের দাম জনগণের নাগালের বাইরে অবস্থান করছে। তালেবান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে যে সকল আফগান নাগরিক দেশে ফিরে এসেছে তাদের খাদ্য, বাসস্থানের নিম্নতম চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে যুদ্ধের ভয়াবহতায় ডুরান্ত লাইন পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
শেষকথা- পাক আফগান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত অবসান জরুরী। কাতার, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের যুদ্ধ বিরতির উদ্যোগ প্রশংসনীয় কিন্তু তা স্থায়ী রূপ পায়নি। কাজেই মুসলিম বিশ্বকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আফগান ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে পরস্পরকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে বহুজীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। মুসলিম শক্তিকে ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বুমেরাং হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও ইতিহাস বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু