বজলুর রহমান
একটি স্থান বা মসজিদ প্রাঙ্গণে অবলীলায় সাধারণ মানুষের পানির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য বসানো টিউবওয়েলটি আজ শক্ত লোহার শিকল আর ভারী তালায় বন্দি। মানুষের সেবায় নিয়োজিত একটি অতি সাধারণ বস্তুকেও চোরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার চিত্রটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক নগ্ন দলিল।
লোহার শিকল কি সত্যিই সম্পদ রক্ষা করতে পারে?
প্রশ্ন জাগে—এই লোহার শিকল কি সত্যি চোরের হাত থেকে কোনো সম্পদ স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে পারে?
উত্তর হলো, কখনোই নয়।
যে লোহা দিয়ে শিকল তৈরি করা হয়েছে, সেই লোহাকে কাটার জন্য মানুষই তৈরি করেছে কাটার বা করাত। শিকল কেবল চোরকে সামান্য কিছুটা সময় বিলম্বিত করতে পারে কিংবা ক্ষণিকের সুরক্ষা দিতে পারে; কিন্তু চুরির মূল প্রবণতা বা লালসাকে তা ধ্বংস করতে পারে না। যে অন্তরে চুরির বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে, তাকে কোনো বাহ্যিক শৃঙ্খল দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়। আজ আমরা টিউবওয়েল বাঁধছি, কাল বাসাবাড়ির গেট, পরশু বাজারের দোকানপাট বা গাড়ি বাঁধছি—কিন্তু চুরি কি থামছে? থামছে না, কারণ সুরক্ষার এই বাহ্যিক চেষ্টা অপরাধের শিকড় স্পর্শ করতে ব্যর্থ।
নফসের দাসত্ব ও বিবেকের শিকল
মানুষের ভিতরের সীমাহীন লোভ, ক্ষণিকের লালসা এবং কুপ্রবৃত্তিকে বলা হয় 'নফস'। যখন মানুষের এই নফস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের সামান্য লাভের জন্য সমাজের সার্বজনীন কল্যাণ ও অন্যের অধিকার হরণ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
যদি চোরের কুপ্রবৃত্তি বা নফসকে 'বিবেকের শিকল' দিয়ে বাঁধা যেত, তবে সমাজের কোনো সম্পদই আর চুরি হতো না। বিবেক হলো মানুষের অন্তরের সেই অলৌকিক বিচারক, যা অন্যায় করার মুহূর্তে মানুষকে বাধা দেয়, লজ্জিত করে এবং পাপকর্ম থেকে দূরে রাখে।

যে সমাজে মানুষের বিবেকের শিকল মজবুত, সে সমাজে স্বর্ণের দোকান খোলা থাকলেও চুরি হয় না; আর যে সমাজে বিবেকের শিকল ছিঁড়ে গেছে, সে সমাজে বিশাল সিন্দুক ভেঙেও সম্পদ লুট হয়ে যায়।
সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের করণীয় ও কার্যকরী প্রচেষ্টা-
অন্তরের এই নীতিবোধ ও বিবেকের শিকল রাতারাতি তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সমাজ, রাষ্ট্র এবং সরকারের সুসংগঠিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা:
নৈতিক ও সুশিক্ষা প্রদান: কেবল ডিগ্রিভিত্তিক বা জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষা নয়, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই চরিত্র গঠন, সততা ও পরোপকারের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আইনের সঠিক প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীকে বেপরোয়া করে তোলে। ছোট-বড় প্রতিটি চুরির অপরাধে পক্ষপাতহীন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি: পরিবার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে নীতিশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করতে হবে, যাতে শিশুরা অন্যায়কে ঘৃণা করতে শেখে।
দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: অনেক সময় চরম অভাব ও কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে অপরাধে জড়ায়। রাষ্ট্রকে সামাজিক নিরাপত্তা ও আয়ের পথ নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন-
তুমি ফ্যাসিস্ট তাই পঙ্গু হলো দেশমাতৃকা
শেষ আহ্বান
শিকলে বাঁধা টিউবওয়েলের এই করুণ দৃশ্যটি আমাদের যান্ত্রিক সভ্যতার অহংকারকে চাবুক মারে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আমরা বাহ্যিক উন্নতি করলেও আত্মিকভাবে কতটা দেউলিয়া হয়ে পড়েছি। আসুন, কেবল লোহা বা তামার শিকলের ওপর ভরসা না করে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের অন্তরে 'বিবেকের শিকল' পরাতে আত্মনিয়োগ করি। যেদিন মানুষের বিবেক জেগে উঠবে, সেদিন আর কোনো টিউবওয়েল বা সম্পদকে শিকলে বেঁধে রাখতে হবে না—সমাজ হবে প্রীতি, শান্তি ও নিরাপত্তার এক অনন্য অভয়ারণ্য।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
*মতামত লেখকের নিজস্ব