Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো : সাধারণ গ্রাহকের আস্থা, না কি বিভ্রান্তি ?

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট,২০২৬, ১১:৪৭ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট,২০২৬, ১১:৫৭ পিএম
কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো : সাধারণ গ্রাহকের আস্থা, না কি  বিভ্রান্তি ?

​বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গত এক-দেড় দশকে একটি নীরব কিন্তু ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। তা হলো পরম্পরাগত বা কনভেনশনাল (সুদী) ব্যাংকগুলোতে ‘ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো’ বা ‘ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা’ খোলার হিড়িক।

সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, হালাল উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং সুদমুক্ত অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে প্রায় সব বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকই এখন ইসলামিক ব্যাংকিং সেবাকে তাদের বিপণন কৌশলের শীর্ষে নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড এবং প্রচারপত্রগুলোতে অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফি ও সবুজ রঙের জমকালো ব্যবহারে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে ‘পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ সম্মত’ সেবার প্রতিশ্রুতি।

​কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্য এবং বিজ্ঞাপনী বুলির পেছনে সাধারণ গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ঠিক কতটা স্বচ্ছ? এক ছাদের নিচে, একই কর্মী দিয়ে, একই মূলধন কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত এই ‘ইসলামিক উইন্ডো’ কি সত্যিই একটি আদর্শিক ও শরীয়াহভিত্তিক সমাধান, নাকি এটি কেবল বাণিজ্যিক কৌশলে সাধারণ গ্রাহকের দ্বীনদারিকে কাজে লাগানোর একটি সুচতুর উপায়? সাধারণ আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের মনে এখন এ নিয়ে জমা হয়েছে একরাশি প্রশ্ন ও গভীর বিভ্রান্তি।

​বিভ্রান্তির গোড়ার কথা : একই ছাদের নিচে দুই ভিন্ন দর্শন

​কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ের মৌলিক ভিত্তি হলো ‘সুদ’ বা ইন্টারেস্ট—যেখানে টাকা দিয়েই টাকা তৈরি করা হয় এবং অর্থ নিজেই একটি পণ্য। অন্যদিকে, ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন হলো ‘লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি’ (Profit-Loss Sharing) এবং সম্পদ-ভিত্তিক লেনদেন (Asset-backed Transaction), যেখানে সরাসরি কোনো ব্যবসা, পণ্য বা সেবার মাধ্যমে অর্থ লাভজনক হয় এবং সুদের কোনো স্থান নেই।

​এখন প্রশ্ন ওঠে, যে ব্যাংকের মূল দর্শন, পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান কার্যালয় এবং সিংহভাগ মূলধন পরিচালিত হয় সুদী ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে, সেটিরই একটি ছোট কোণে বা শাখায় কীভাবে সম্পূর্ণ সুদমুক্ত লেনদেন সম্ভব?

​সাধারণ গ্রাহক যখন দেখেন, একই ব্যাংকিং কর্মকর্তা সকালে সুদী ঋণের ফাইল প্রসেস করছেন আর বিকেলে ইসলামিক উইন্ডোর ‘মুদারাবা’ বা ‘মুশারাকা’ ফাইলের হিসাব মেলাচ্ছেন, তখন তাদের মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে যে, একই ম্যানেজমেন্টের অধীনে কেবল আলাদা খাতা বা আলাদা সফটওয়্যার মডিউল ব্যবহার করলেই একটি লেনদেন রাতারাতি ‘সুদ’ থেকে ‘হালাল’ হয়ে যাবে !

​হিসাবের স্বচ্ছতা ও তহবিলের পৃথকীকরণ : কতটুকু বাস্তব ?

​ইসলামিক উইন্ডো চালুর প্রধান শর্ত হলো—কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ের মূল তহবিল (Fund) এবং ইসলামিক উইন্ডোর আমানত ও বিনিয়োগের তহবিল সম্পূর্ণ পৃথক বা Segregated থাকতে হবে। ইসলামিক উইন্ডোর টাকা কোনোভাবেই কনভেনশনাল ট্রেজারি বা সুদী ঋণে ব্যবহার করা যাবে না।

​কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে ? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

১.​তহবিল মিশ্রণ (Co-mingling of Funds) :

সাধারণ গ্রাহকের বড় সংশয় হলো, ব্যাংকের সামগ্রিক তারল্য সংকটের সময় ইসলামিক উইন্ডোর আমানতের টাকা মূল সুদী ব্যাংকিংয়ের চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না তো ?

২.​কেন্দ্রীয় ট্রেজারি ব্যবস্থার দ্বৈততা :

বেশিরভাগ ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগ একটাই। তারা কীভাবে ইসলামিক উইন্ডোর সুদমুক্ত হিসাব এবং কনভেনশনাল ব্যবস্থার সুদী হিসাব পুরোপুরি আলাদা রাখে, তার একটি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে অনুপস্থিত।

​গ্রাহক যখন দেখেন তার জমাকৃত টাকা কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে বা কীভাবে মুনাফা হিসাব করা হচ্ছে সেটির কোনো দৃশ্যমান বিবরণ তিনি পাচ্ছেন না, তখন শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি তার আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন-

খেলাপি ঋণ ও আইনি জটিলতা : কসমেটিক সমাধান নাকি প্রকৃত সংস্কার খেলাপি ঋণ ও আইনি জটিলতা : কসমেটিক সমাধান নাকি প্রকৃত সংস্কার

৩.​পরিভাষা ও বাস্তবায়নের বৈপরীত্য :

​সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে সুদী ও ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মধ্যে পরিভাষাগত মিল এবং প্রয়োগের কৌশল । ​ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে ‘সুদ’ শব্দটির বদলে ‘মুনাফা’ (Profit), ‘ঋণ’ শব্দটির বদলে ‘বিনিয়োগ’ (Investment), এবং ‘ইন্টারেস্ট রেট’-এর বদলে ‘প্রফিট রেট’ বা ‘মার্জিন’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গ্রাহক যখন বাস্তব লেনদেনে যান, তখন তিনি দেখেন—

১. নির্দিষ্ট হারের মুনাফা : অনেক সময় ব্যাংকের কর্মীরা গ্রাহককে আগে থেকেই বলে দেন, "আমাদের উইন্ডোতে টাকা রাখলে আপনি বছরে ৮% বা ৯% মুনাফা পাবেন।" অথচ শরীয়াহ অনুযায়ী ব্যবসায় আগাম নির্দিষ্ট হারে প্রফিট গ্যারান্টি দেওয়া বৈধ নয়; মুনাফা হতে হবে অর্জিত লাভের শতাংশে (Ratio)।

২. বাজার সুদের হারের সাথে অনেকটা হুবহু মিল : কনভেনশনাল সুদী ব্যাংকের সুদের হার বাড়লে বা কমলে ইসলামিক উইন্ডোর ‘মুনাফার হার’ও ঠিক একই অনুপাতে ওঠানামা করে। যদি এটি সম্পূর্ণ সম্পদ-ভিত্তিক ও স্বতন্ত্র ব্যবসা হয়, তবে কনভেনশনাল সুদের হারের (যেমন: কল মানি রেট বা সিক্স-মান্থ ট্রেজারি বিল রেট) সাথে এর হুবহু মিল থাকে কীভাবে?

৩. বায়-মুয়াজ্জল বা বায়- মুরাবাহার নামে কাগজপত্রের খেলা : ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে লাভ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো পণ্য কেনেই না; কেবল কিছু দলিলে গ্রাহকের স্বাক্ষর নিয়ে টাকা হস্তান্তর করে দেয়। এই ‘কাগজে-কলমে শরীয়াহ’ পালন গ্রাহকদের প্রতারিত বোধ করায়।

​কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শরীয়াহ বোর্ডের ভূমিকা : আস্থার সংকট

​যেকোনো ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো পরিচালনার জন্য একটি ‘শরীয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি’ বা শরীয়াহ বোর্ড থাকে, যেখানে প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী অর্থনীতিবিদরা থাকেন। এটি গ্রাহকদের আস্থার অন্যতম প্রধান জায়গা। প্রচলিত সকল ব্যাংকে কার্যকর শরিয়া বোর্ড আছে কিনা সে বিষয়েও গ্রাহকদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে।

​তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে এসব বোর্ডের কার্যকারিতা নিয়ে :

​বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা : শরীয়াহ বোর্ড কি কেবল একটি ‘উপদেষ্টা’ বা আলংকারিক সংস্থা, নাকি তাদের ব্যাংকের ভুল লেনদেন বন্ধ করার মতো নির্বাহী ক্ষমতা আছে? যেহেতু শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদের সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষই, তাই তারা কতটুকু স্বাধীনভাবে ব্যাংকের অনিয়ম বা কনভেনশনাল ব্যবস্থার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেন—তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।

​একক শরীয়াহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভাব : দেশে এখনও পূর্ণাঙ্গ এবং বাধ্যতামূলক কোনো ‘জাতীয় শরীয়াহ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ’ (Central Shariah Regulatory Authority) গড়ে ওঠেনি। ফলে একেক ব্যাংক তাদের নিজেদের সুবিধামতো শরীয়াহর ব্যাখ্যা দিচ্ছে এবং উইন্ডো পরিচালনা করছে বলে অনেকে মনে করেন।

​গ্রাহকের বিভ্রান্তি নিরসনে করণীয় :

​কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো চালু হওয়াটা ইসলামী অর্থনীতির প্রসারের জন্য একটি ভালো সুযোগ হতে পারত। কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে তা এখন আস্থার সংকটে পড়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আমানতের সুরক্ষায় দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি :

​১. সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও দৃশ্যমান স্বচ্ছতা :

ইসলামিক উইন্ডো কেবল খাতা বা অনলাইন সফটওয়্যারের আলাদা একটি মডিউল হলে চলবে না। উইন্ডোর জন্য আলাদা ট্রেজারি, আলাদা অ্যাকাউন্টস এবং সম্পূর্ণ আলাদা কর্মীবাহিনী নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও বিবরণীতে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে গ্রাহকের টাকা ঠিক কোন সেক্টরে ও কোন পণ্যে বিনিয়োগ হয়েছে।

​২. কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ডের প্রতিষ্ঠা :

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বাধীন ও সর্বক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় শরীয়াহ গভর্নিং বডি’ গঠন করতে হবে। এই বডি প্রতিনিয়ত সব ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো অডিট করবে এবং শরীয়াহ লঙ্ঘিত হলে কঠিন জরিমানা বা উইন্ডোর লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেবে।

​৩. পরিভাষাগত ও আচরণগত সততা :

ব্যাংকের কর্মীদের কেবল ইসলামিক পরিভাষা মুখস্থ করালেই হবে না, তাদের ইসলামী অর্থব্যবস্থার দর্শন ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গ্রাহককে প্রফিটের নামে সুদের নিশ্চয়তা দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং নামমাত্র কাগজপত্রের খেলা বাদ দিয়ে বাস্তবমুখী সম্পদ-ভিত্তিক বিনিয়োগে যেতে হবে।

​৪. গ্রাহক সচেতনতা :

গ্রাহকদেরও অন্ধবিশ্বাস না করে সচেতন হতে হবে। কোন লেনদেনটি কীভাবে হচ্ছে, চুক্তিটি কিসের—সে বিষয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংকের সাথে লেনদেনের বিষয়টি যেন শরিয়াসম্মত হয় সেদিকে সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতার সাথে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

মোদ্দাকথা- ​ইসলামিক ব্যাংকিং কেবল একটি ব্যবসায়িক স্লোগান বা বাড়তি মুনাফা জেনারেট করার ‘প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন’ নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ও নৈতিক অর্থনীতি। কনভেনশনাল ব্যাংকগুলো যদি কেবল ডিপোজিট টানার এবং ধর্মপ্রাণ মানুষকে আকর্ষণ করার কৌশল হিসেবে ‘ইসলামিক উইন্ডো’ ব্যবহার করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকেই মানুষের আস্থা কমিয়ে দেবে।

​সচেতন গ্রাহকরা আর শব্দের মায়াজাল বা সবুজ ব্যানারের প্রলোভনে ভুলতে চায় না; তারা দেখতে চায় খাঁটি সুদমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন। কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোগুলো যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্বের সার্থকতা প্রমাণ করতে চায়, তবে তাদের পরিভাষার অন্তরালে থাকা সুদী মানসিকতা ত্যাগ করে প্রকৃত শরীয়াহ নীতি ও পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ‘ইসলামিক উইন্ডো’ নামটির অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় অনুভূতির বাণিজ্যিক ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)