Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

খেলাপি ঋণ ও আইনি জটিলতা : কসমেটিক সমাধান নাকি প্রকৃত সংস্কার

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : বুধবার, ১৯ আগস্ট,২০২৬, ০৮:২৮ এ এম
খেলাপি ঋণ ও আইনি জটিলতা : কসমেটিক সমাধান নাকি প্রকৃত সংস্কার

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ছবি: ধ্রুব নিউজ

​বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন ও সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের গভীর রক্তক্ষরণ। এই সংকেটের কেন্দ্রে রয়েছে খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতা। বহু বছর ধরে ব্যাংক খাতের এই ব্যাধিটি নিয়ে আলোচনা, সভা-সেমিনার ও পরিসংখ্যান প্রকাশ হচ্ছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং সময়ের সাথে সাথে ব্যাধিটি ক্রমান্বয়ে ক্যান্সাররূপ ধারণ করেছে।

​বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের মূল প্রশ্নটি আর কেবল ‘খেলাপি ঋণ কত?’ তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটি এখন—আমরা কি সমস্যার গোড়ায় হাত দিয়ে প্রকৃত সংস্কার করতে চাই, নাকি রুটিনমাফিক কিছু 'কসমেটিক' বা উপরিউক্ত সংস্কারের নাটক সাজিয়ে খেলাপিদের আইনি সুরক্ষার ছাতা উপহার দেব?

​ খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র ও আইনি বেড়াজাল
​পরিসংখ্যানের খাতা উল্টালে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে আনুষ্ঠানিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন রেকর্ড ভঙ্গ করছে। কিন্তু অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের অঙ্কটা হিমশৈলের চূড়া (Tip of the iceberg) মাত্র। বিশেষ সুবিধা দিয়ে অবলোপনকৃত ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং উচ্চ আদালতের রিট বা স্থগিতাংশের আড়ালে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ মূল অঙ্কের দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়াবে।
​টাকা আটকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মন্থর গতি ও ফাঁকফোকর। ব্যাংক ঋণ আদায়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ২০০৩ সালে ‘অর্থঋণ আদালত আইন’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। আইনটি করার মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিচার শেষ করে ব্যাংকের টাকা ফেরত আনা। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
​অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এবং আটকে থাকা টাকার পরিমাণ পাহাড়সম। দীর্ঘসূত্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একটি মামলা শেষ হতে হতে যুগের পর যুগ পার হয়ে যায়। ফলে আইনি ব্যবস্থাটি ব্যাংকের পাওনা আদায়ের জন্য যতটা না কার্যকর, খেলাপিদের সময়ক্ষেপণ ও পার পাওয়ার জন্য তার চেয়ে বেশি সহায়ক হয়ে উঠেছে।

​‘কসমেটিক’ সমাধান : ক্ষত ঢেকে রাখার বিপজ্জনক প্রবণতা
​গত এক বা দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের নামে যা হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই ‘প্রকৃত সংস্কার’ বলা যায় না। এগুলো মূলত ‘কসমেটিক সমাধান’ বা উপরিউক্ত মেকআপ। ক্ষত যেখানে পচে গ্যাংগ্রিন হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
​এই কসমেটিক পদক্ষেপগুলোর কয়েকটা রূপ তুলে ধরা যাক:

​১. বারংবার নীতি শিথিল ও ছাড় :
বড় বড় ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুবিধার্থে বারবার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ (Rescheduling) ও পুনর্গঠনের (Restructuring) সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ডাউনপেমেন্টের হার ২ শতাংশে নামিয়ে এনে দীর্ঘমেয়াদে কিস্তি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফল কী হয়েছে? ঋণ সাময়িকভাবে ‘নিয়মিত’ দেখান গেছে, ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট দেখতে সুন্দর লেগেছে, কিন্তু দিনশেষে ব্যাংকে কোনো নগদ টাকা ফেরত আসেনি।
​২. সংজ্ঞাগত পরিবর্তন :
খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা বারবার বদলে বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে সরে এসে খেলাপি ঋণের হিসাব কৃত্রিমভাবে কম দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে করে সমস্যার মূল কারণ দূর হয়নি, বরং ব্যাংকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

​৩. কাগজে-কলমে আইনি সংশোধনী : ব্যাংক কোম্পানি আইনে বিভিন্ন সময় যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে, তার অনেকগুলোই মূল সমস্যা সমাধানের চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করেছে। পরিচালক পদে থাকার মেয়াদ বাড়ানো বা একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ব্যাংকের বোর্ডে থাকার সুযোগ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো সুশাসনকে আরও দুর্বল করেছে।

​এ ধরনের কসমেটিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল সত্যকে আড়াল করা এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী খেলাপিদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু এর মাশুল গুণতে হচ্ছে দেশের সাধারণ আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে।

​আইনি জটিলতা ও খেলাপিদের আইনি ‘সুরক্ষাকবচ’
​কেন আইনি প্রক্রিয়ায় টাকা আদায় হচ্ছে না? এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ বিদ্যমান :
১.​আদালতের অপর্যাপ্ততা ও বিচারক সংকট :
অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বিচারাধীন মামলার তুলনায় অত্যন্ত কম। প্রতিটি বিচারকের ওপর হাজার হাজার মামলার চাপ রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২.​রিট আবেদনের মাধ্যমে আইনি স্থগিতাদেশ :
অর্থঋণ আদালতে মামলা চলার সময় বা ডিক্রি জারি হওয়ার পর ঋণগ্রহীতারা উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) রিট পিটিশন দায়ের করে স্থগিতাদেশ (Stay order) নিয়ে আসেন। একটি রিট নিষ্পত্তিতে বছর পার হয়ে যায়, আর এই সুযোগে খেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ হস্তান্তর বা গায়েব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

৩.​ভুয়া ও জামানতের ঘাটতি :
ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের যোগসাজশে ভুয়া জামানত দেখানো হয় কিংবা জামানতের মূল্য বাস্তবে যা, তার চেয়ে বহু গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় জামানত বাজেয়াপ্ত বা নিলাম করতে গিয়ে দেখা যায়, সম্পত্তিটির অস্তিত্বই নেই অথবা তার মূল্য পাওনা ঋণের ১০ শতাংশও নয়।
​আইনের উদ্দেশ্য ছিল পাওনাদারের অধিকার রক্ষা করা, কিন্তু ব্যবস্থার ফাঁক গলে সেই আইনই আজ খেলাপিদের অন্যতম ঢাল বা আইনি সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​প্রকৃত সংস্কারের রূপরেখা: এখন কী করা প্রয়োজন?

​যদি আমরা সত্যি সত্যি ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে চাই, তবে অর্ধেক মন নিয়ে বা সাময়িক ছাড় দিয়ে কোনো কাজ হবে না। আমাদের কঠোর ও বাস্তবমুখী ‘প্রকৃত সংস্কার’-এর পথে হাঁটতে হবে। এই সংস্কার হতে হবে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে :

​১. আইনি ও বিচারিক সংস্কার ​বিশেষ অর্থঋণ বেঞ্চ গঠন : উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট বিভাগে) অর্থঋণ সংক্রান্ত রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ডেডিকেটেড বা বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন, যাতে রিট আবেদনের আড়ালে মামলা ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ বন্ধ হয়।

আরও পড়ুন-

ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারতন্ত্র : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কেন জরুরি ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারতন্ত্র : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কেন জরুরি

২.​সময়সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ :
অর্থঋণ আদালতে মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে রায় ও নিলাম কার্যক্রম শেষ করার জন্য সময়সীমা সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে বিচার শেষ করতে না পারলে বিচারক ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

৩.​বাজেয়াপ্তি ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি : ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শুধু ব্যাংকে রাখা জামানত নয়, বরং তাদের ব্যক্তিগত অন্য সম্পদ ও বিদেশে পাচার করা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট বিধান আইনে যুক্ত করতে হবে।
​২. ​ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিতকরণ ও সামাজিক বয়কট : যারা ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টাকা ফেরত দিচ্ছেন না, তাদের 'ইচ্ছাকৃত খেলাপি' (Wilful Defaulter) হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা, নতুন ব্যবসা ও ট্রেড লাইসেন্স না দেওয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করার মতো কঠোর পদক্ষে নেওয়া প্রয়োজন।

৪.​কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা :
বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে হবে। কোনো বড় খেলাপি বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী যেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তার আইনি নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

৫.​ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা :
ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় পরিচালনা পর্ষদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ভুয়া জামানত বা ভ্যালুয়েশন রিপোর্টের ভিত্তিতে ঋণ দিলে সংশ্লিষ্ট অ্যাসেসর, ব্যাংকার ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের বিধান করা দরকার।
​৬. ট্রাইব্যুনাল ও এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (AMC) গঠন
​খেলাপিদের সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে পাওনা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ‘এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে, তবে তা যেন খেলাপিদের ঋণ মাফ করার নতুন কৌশল না হয়। এটি হতে হবে কেবলই পেশাদারিত্বের সাথে পাওনা আদায়ের মাধ্যম।

আরও পড়ুন-

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায়

​অর্থনীতিতে কোনো ম্যাজিক বা অলৌকিক সমাধান নেই। কসমেটিক সমাধান বা কৃত্রিম উপশম দিয়ে আমরা অনেক বছর সময় নষ্ট করেছি। এর ফলে খেলাপি ঋণের সমস্যা তো কমেইনি, বরং সাধারণ ব্যাংক গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা যেকোনো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক সংকেত। ​খেলাপি ঋণ ও আইনি জটিলতার অবসান ঘটাতে হলে দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার (Political Will)। ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা যত শক্তিশালী বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

​কসমেটিক সমাধানের দিন শেষ। এখন সময় কঠোর আইনি পদক্ষেপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন নজরদারি এবং বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিশ্চিত করা। তা না হলে, খেলাপি ঋণের এই বিষবৃক্ষ পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকেই একদিন ধসিয়ে দেবে। সংস্কার এখনই, এবং তা হতে হবে সমূলে।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)