ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ছবি: ধ্রুব নিউজ
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে—যেখানে সুদমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং শরিয়াহ অনুমোদিত অর্থায়নের আশ্বাস ছিল মূল ভিত্তি। আশির দশকে যখন প্রথম ইসলামী ব্যাংক চালু হয়, তখন তা কেবল ধার্মিক মানুষের ব্যাংকিং চাহিদা মেটায়নি, বরং স্বচ্ছতা ও আমানতদারিতার কারণে দ্রুত সাধারণ মানুষের আস্থাও অর্জন করেছিল। সময়ের ব্যবধানে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ ইসলামী ব্যাংকগুলোর দখলে চলে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকিং খাত এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। তারল্য সংকট, আমানতকারীদের অনাস্থা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং একের পর এক অনিয়মের সংবাদ এখন সাধারণ ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে, যেসব নীতি ও আস্থার ওপর ভর করে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার ভিত কীভাবে নড়ে গেল? এই ধ্বংস বা বিপর্যয়ের নেপথ্যে অনেকগুলো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে—শরিয়া পরিপালনে চরম শিথিলতা ও অনীহা।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলভিত্তি : শরিয়াহ পরিপালন
সাধারণ বা সনাতনী (Conventional) ব্যাংকিং এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল পার্থক্য কেবল শব্দের ব্যবহারে নয়, বরং নীতি ও প্রথার জায়গায়। সনাতনী ব্যাংক মূলত অর্থের বেচাকেনা করে—কম সুদে আমানত নেয় এবং বেশি সুদে ঋণ দেয়। অপরদিকে ইসলামী ব্যাংক সরাসরি অর্থ কেনাবেচা বা সুদের ব্যবসা করতে পারে না। এখানে ব্যাংক কাজ করে একজন অংশীদার, ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী হিসেবে।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলো 'শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স' বা শরিয়া বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা। এতে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক-
১. হালাল ও নৈতিক খাতে বিনিয়োগ : অনৈতিক, ক্ষতিকর বা শরিয়াহ-বিরোধী কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করা।
২. প্রকৃত সম্পদ-ভিত্তিক অর্থায়ন (Asset-backed financing) : বাস্তবে অস্তিত্ব আছে এমন পণ্য বা সম্পদের বিপরীতে অর্থ লেনদেন করা (যেমন: মুরাবাহা, মুশারাকা, মুদারাবা)।
৩. ঝুঁকি ও লাভের সুষম বণ্টন : লাভ হলে চুক্তিনুযায়ী বণ্টন এবং লোকসান হলে নিয়মানুযায়ী তা বহন করা। যখন এই তিনটি মৌলিক শর্ত মেনে চলা হয়, তখন সেখানে কাগুজে ঋণ সৃষ্টি কিংবা জালিয়াতির সুযোগ থাকে না। কিন্তু শরিয়া পরিপালনে শিথিলতা আসার সাথে সাথেই ব্যাংকটি কেবল কাগজে-কলমে ইসলামী থাকে, বাস্তবে রূপ নেয় এক অনিয়ন্ত্রিত সনাতনী ব্যাংকে।
ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিপর্যয়ের নেপথ্যে
১. প্রকৃত কেনাবেচার অভাব এবং ‘কাগুজে মুরাবাহা’ (Fake Murabaha):
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পদ্ধতি 'মুরাবাহা' (খরচ ও লাভ উল্লেখ করে ক্রয়-বিক্রয়)। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকের দায়িত্ব হলো প্রথমে পণ্য কেনা, তারপর সেই পণ্য গ্রাহকের কাছে লাভসহ বিক্রি করা। কিন্তু বর্তমানে বহু ব্যাংকে পণ্য না কিনে কেবল কাগুজে দলিলে অর্থ হস্তান্তর করা হচ্ছে। শরিয়া বোর্ডের চোখ এড়িয়ে বা বোর্ডের অকার্যকারিতার সুযোগ নিয়ে অস্তিত্বহীন পণ্যের নামে কোটি কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। বাস্তব সম্পদ ছাড়া যখন ব্যাংকের টাকা বাইরে চলে যায়, তখন তা ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না, যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণের পাহাড় গড়ে তোলে।
২. অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন :
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, অর্থায়নের পূর্বে গ্রাহক ও ব্যবসার প্রকৃত উপস্থিতি যাচাই করা ব্যাংকের প্রধান কাজ (Know Your Customer/Business)। অথচ গত কয়েক বছরে বিভিন্ন নামে-বেনামে বেনামী ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে শরিয়ার বাধ্যবাধকতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নিয়মগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। ফলে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা পাচার ও আত্মসাৎ হয়েছে।
৩. শরিয়াহ বোর্ডের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা হ্রাস :
একটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা 'শরিয়াহ সুপারভাইজারি বোর্ড'-এর। শরিয়া বোর্ডের কাজ ব্যাংকের প্রতিটি অর্থায়ন নীতিসম্মত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা এবং প্রয়োজনে যেকোনো অনৈতিক প্রস্তাবে ভেটো (Veto) দেওয়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষের অনৈতিক প্রভাবে শরিয়া বোর্ডকে কেবল একটি 'রাবার স্ট্যাম্পে' পরিণত করা হয়েছে। নিরপেক্ষ শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে যখন স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ শুরু করে, তখনই ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।
৪. আমানতকারীদের আস্থার সংকট :
ইসলামী ব্যাংকে মানুষ টাকা রাখে লাভের আশায় যতটা না, তার চেয়ে বেশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ থেকে এবং ব্যাংকের আমানতদারিতার ওপর বিশ্বাস রেখে। যখন সংবাদমাধ্যমে আসে যে, একটি ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ মানছে না, সুদের ছদ্মবেশে অনৈতিক অর্থায়ন করছে কিংবা আমানতের টাকা ভুয়া প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে—তখন আমানতকারীদের সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। ফলে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে এবং তীব্র তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের একাধিক ইসলামী ব্যাংকে ঠিক এই চিত্রই দেখা গেছে।
৫. পেশাদারিত্বের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা :
শরিয়া পরিপালনকে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মনে করা এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অনেক ব্যাংকার শরিয়ার মূল চেতনা না বুঝে সনাতনী ব্যাংকিংয়ের মানসিকতা নিয়ে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করছেন, যা শরিয়া লংঘনকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
সংকট উত্তরণে ও গ্রাহক আস্থা ফেরাতে করণীয়
ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে এই ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে শরিয়া পরিপালনকে পুনরায় কঠোর ও বাধ্যতামূলক রূপ দিতে হবে। এজন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
১.শরিয়া বোর্ডের পূর্ণ স্বাধীনতা ও ক্ষমতা প্রদান : শরিয়া সুপারভাইজারি বোর্ডকে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ব্যাংকের যেকোনো বিনিয়োগ শরিয়া বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া চূড়ান্ত করা যাবে না।
২.কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মনিটরিং : বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন 'কেন্দ্রীয় শরিয়াহ তদারকি সেল' গঠন করা উচিত, যারা নিয়মিতভাবে ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স অডিট করবে এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।
৩.বাস্তব সম্পদ-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ : প্রতিটি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাস্তব পণ্যের অস্তিত্ব, চালান ও পরিবহন নথি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কাগুজে লেনদেনের সুযোগ রাখা যাবে না।
আরও পড়ুন-
কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো : সাধারণ গ্রাহকের আস্থা, না কি বিভ্রান্তি ?
৪.ব্যাংকারদের প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতি, লক্ষ্য ও শরিয়া সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের নিয়মিত ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫.অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করা : শরিয়া পরিপালনের নামে যারা প্রতারণা করেছে এবং ভুয়া ঋণের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ব্যাংকিং খাতে আবার শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতে আর কোন ধরনের দুর্নীতির সুযোগ কারো মনের মধ্যে না আসে।
মূলকথা হচ্ছে- ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুভূতিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং টেকসই অর্থনৈতিক নীতি। তবে এই ব্যবস্থার প্রাণভোমরা হলো—শরিয়া পরিপালন। মূল নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে ইসলামী ব্যাংকিং চালানো আর তাসের ঘর বানানো একই কথা। শরিয়া পরিপালনে শিথিলতা প্রদর্শন করেই আজ ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই খাতকে বাঁচাতে হলে নীতি ও আদর্শের জায়গায় কোনো আপস করা চলবে না। যত দ্রুত ব্যাংকগুলো আবার শরিয়ার কঠোর নীতিতে ফিরে আসবে, তত দ্রুতই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটবে।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা