❒ প্রবন্ধ
তহীদ মনি
মনের আবেগ, চিন্তা-দর্শন এবং আনন্দ-বেদনার কাব্যময় প্রকাশ ও ছন্দময় উপস্থাপনই কবিতার মূল ভিত্তি। অনেকে মনে করেন কবিরা জন্মগতভাবেই কবি এবং তাদের নতুন করে শেখানোর কিছু নেই; তবে আধুনিক যুগে এই ধারণার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার গুরুত্বও সমানভাবে স্বীকৃত। বর্তমান বিশ্বে কবিতা, গল্প বা সৃজনশীল লেখালেখি শেখাতে অনেক নামী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপ’ সৃজনশীল লেখালেখির জগতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রোগ্রাম।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়াও এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক, যেখান থেকে বের হয়েছেন নোবেলজয়ী কাজুও ইশিগুরোর মতো লেখক। আবার অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সৃজনশীল লেখার ওপর উচ্চতর ডিগ্রি ও সার্টিফিকেট কোর্স করানো হয়।
আমাদের এই অঞ্চলেও শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক আবহে সাহিত্য সৃষ্টি ও সৃজনশীল শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এটা ঠিক যে শুধু অধ্যয়ন করলেই কবি হওয়া যায় না, এর জন্য প্রয়োজন গভীর জীবনানুভূতি ও নিরলস পরিশ্রম; তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সেই বন্ধুর পথকে অনেকটাই মসৃণ ও গতিশীল করে তোলে।
আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো চিত্রকল্প। অলংকার হিসেবে উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা ও মিথ যেভাবে কবিতাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, তেমনি চিত্রকল্প হলো কবিতার অন্তশ্চক্ষু বা অন্তঃশ্বাস। কবিতা মানে কেবলই ছন্দবদ্ধ শব্দবিন্যাস কিংবা অন্ত্যমিলের ঝংকার তোলা নয়। এমনকি আধুনিক ছড়া—যা কেবল শিশুতোষ বিনোদন নয়, বরং সমাজ সচেতনতা, রাজনৈতিক কশাত ও দ্রোহের বার্তা বহন করে—সেখানেও যেমন স্বরবৃত্ত ছন্দকে রপ্ত করতে হয়, তেমনি সেই ছন্দের সীমা অতিক্রম করে আলাদা অর্থ ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য চিত্রকল্পের প্রয়োজন পড়ে। কবিতা নির্মাণে উপমা, মিথ, অলংকার ও অনুষঙ্গের প্রয়োজনীয়তাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। একটি রূপকের সাহায্যে বিষয়টি বোঝা যেতে পারে।
চিরায়ত সৌন্দর্যের বর্ণনায় আমরা যখন কোনো তরুণীকে হরিণ-আঁখি, নিটোল গড়ন, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের বরণ, চম্পা কিংবা সবরী কলার মতো আঙুল, বাঁকা ভ্রু বা গোলাপি ঠোঁটের উপমায় সাজাই, তখন তা কেবল অবয়বের বাহ্যিক বর্ণনা মাত্র। কিন্তু কবি আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘নোলক’ কবিতার মতো সেই তরুণীকে যখন কপালে টিপ পরানো হয়, কানে ঝোলানো হয় দুল, গলায় সোনা ও মুক্তার মালা দেওয়া হয় এবং খোঁপার বাঁধনে গুঁজে দেওয়া হয় বুনো ফুল, তখন তার সৌন্দর্য নতুন এক রূপে ও আকর্ষণে ধরা দেয়। অলংকার ও অনুষঙ্গ ঠিক এভাবেই কবিতাকে শতগুণ আবেদনময়ী করে তোলে, কবিতায় আনে প্রাণবন্ততা এবং সৃষ্টি করে দৃশ্যমান ছবি।
কবিতা লিখতে গেলে অলংকারের গঠন ও এর সঠিক প্রয়োগ জানা অত্যন্ত জরুরি। কবিতায় বোঝাপড়ার সুবিধার্থে প্রধান অলংকারগুলোকে উপমা, রূপক ও উৎপ্রেক্ষা হিসেবে ভাগ করা হয়। দুটি ভিন্নধর্মী বস্তুর মধ্যে কোনো বিশেষ গুণের সাদৃশ্য দেখিয়ে তুলনা করাকে উপমা বলে, যার একটি পক্ষকে বলা হয় উপমেয় অর্থাৎ যাকে তুলনা করা হচ্ছে এবং অন্যটিকে বলা হয় উপমান অর্থাৎ যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। যেমন সাধারণ উদাহরণে যখন বলা হয় “মুখখানি যেন পদ্মফুল”, তখন মুখ হলো উপমেয় এবং পদ্ম হলো উপমান। এদের বাহ্যিক বা গুণগত কোনো সরাসরি মিল না থাকলেও কেবল সুন্দরের অভিপ্রায়ে এই তুলনা করা হয়; ঠিক যেমন চাঁদের রুক্ষতা বা কলঙ্ককে বাদ দিয়ে আমরা শুধু তার স্নিগ্ধ সৌন্দর্যকে মুখের সাথে মেলাই।
জীবনানন্দ দাশের একটি পঙ্ক্তিতে যখন দেখি, “শিউলি ফুলের মতো সাদা সাদা ভাতে পূর্ণ থালা”, তখন ভাত ও শিউলি ফুলের রঙের সরাসরি সাদৃশ্য আমাদের চোখের সামনে এক চেনা বাস্তব ছবি ফুটিয়ে তোলে। কেবল বাংলা কবিতায় নয়, বিশ্বসাহিত্যেও উপমার এই দোলাচল চিরন্তন। স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নস যখন তাঁর প্রিয়ার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, ‘ও মাই লাভ ইজ লাইক আ রেড, রেড রোজ’ (আমার প্রেম যেন জুনের সদ্য ফোটা লাল গোলাপ), তখন সেখানেও ভালোবাসার সতেজতাকে গোলাপের জীবন্ত রূপের সমান্তরালে আনা হয়। আবার ইংরেজি রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ যখন নিজেকে একটি নিঃসঙ্গ মেঘের সাথে তুলনা করে বলেন, ‘আই ওয়ান্ডারড লোনলি এজ আ ক্লাউড’, তখন সেখানে উপমার হাত ধরে এক গভীর একাকীত্বের অনুভূতি মনের আকাশে ভেসে ওঠে।
উপমার পরবর্তী ধাপটি হলো রূপক, যেখানে উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে কোনো ভেদ না রেখে তাদের অভেদ কল্পনা করা হয়, অর্থাৎ সরাসরি একটিকে অন্যটি বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন, "তুমি আমার জীবন-সূর্য"—এই বাক্যে জীবনকে সূর্যের মতো বলা হয়নি, সরাসরি জীবনকেই সূর্য বলে অভেদ কল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে কবি ও গীতিকারদের পঙ্ক্তিতে যখন বলা হয়, “যে আঁখিতে এত হাসি লুকানো, কূলে কূলে তার কেন আঁখিজল”, তখন চোখের হাসিকে নদীর কূলের উপমানে এনে চোখের সাথে কূলের এক অভিন্ন রূপ সৃষ্টি করা হয়। রূপকের এই অভেদ কল্পনা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। উইলিয়াম শেকসপিয়রের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—‘অল দ্য ওয়ার্ল্ডস আ স্টেজ’ (সমগ্র পৃথিবীটাই একটা রঙ্গমঞ্চ এবং সব মানুষই কেবল অভিনেতা)—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবন কোনো তুলনা নয়, সরাসরি এক একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের নাট্যশালা। আবার উপমেয়কে যখন উপমান বলে প্রবলভাবে সংশয় বা সম্ভাবনা প্রকাশ করা হয়, যেখানে বুঝি, যেন, মনে হয় ইত্যাদি সংশয়বাচক শব্দ ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে উৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন, "আকাশে বুঝি আগুন লেগেছে!"—এখানে আকাশে আসলেই আগুন লাগেনি, গোধূলির রক্তিম আভা দেখে মনে হচ্ছে যেন আগুন লেগেছে। এই মনে হওয়া বা অনুমানের নান্দনিক প্রকাশই হলো উৎপ্রেক্ষা, যা কবিতাকে অলংকৃত ও নাটকীয় করে তোলে।
উপমা, রূপক বা উৎপ্রেক্ষা হলো কবিতার অলংকার, কিন্তু চিত্রকল্প কোনো সাধারণ অলংকার নয়; এটি কবিতার নিজস্ব অবয়ব ও উপস্থাপনার অনন্য ভঙ্গি। চিত্রকল্প পাঠককে শব্দের মাধ্যমে মনে মনে একটি দৃশ্যমান ছবি আঁকতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাকে গভীরভাবে ভাবায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চেনা পঙ্ক্তি, "তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে", পড়ার সাথে সাথেই পাঠকের মনের অজান্তে একটি দীর্ঘ তালগাছ এক পায়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য ভেসে ওঠে—এটিই চিত্রকল্পের শক্তি। কিংবা জীবনানন্দ দাশের সেই জাদুকরী লাইন, "হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে", যেখানে বাস্তবে কোনো মানুষ হাজার বছর বাঁচে না বা অবিরাম হাঁটতে পারে না, কিন্তু পঙ্ক্তিটি উপমা ও রূপকের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠকের মনে এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও চিরায়ত যাত্রার স্পষ্ট ছবি এঁকে দেয়।
পাশ্চাত্য সাহিত্যে চিত্রকল্প আন্দোলনের (Imagism) পুরোধা কবি এজরা পাউন্ডের ‘ইন আ স্টেশন অব দ্য মেট্রো’ কবিতাটি এর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মাত্র দুই লাইনের এই কবিতায় তিনি যখন মেট্রো স্টেশনের ভিড়ে চেনা মুখগুলোকে দেখে লেখেন, ‘দ্য অ্যাপারিশন অব দিজ ফেসেস ইন দ্য ক্রাউড; / পেটালস অন আ ওয়েট, ব্ল্যাক বাউ’ (ভিড়ের মাঝে এই মুখগুলোর আকস্মিক আবির্ভাব; / ভেজা, কালো ডালে ঝরে পড়া ফুলের পাপড়ি), তখন চোখের সামনে এক পরাবাস্তব ও বেদনাময় সৌন্দর্যের চিত্রকল্প ভেসে ওঠে। একইভাবে কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় যখন দেখি—‘থুরথুরে এক বুড়ো বসে আছেন উঠোনে—যাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের দুর্বল আলোর ঝিলিক’—তখন তা কেবল শব্দ থাকে না, পাঠকের মনের পর্দায় এক জীবন্ত ও করুণ চলচ্চিত্রের রূপ নেয়। মূলত চিত্র ও কল্পনার যৌথ রসায়নেই তৈরি হয় চিত্রকল্প।
কবিতা পড়ার সময় মনের আয়নায় এবং চোখের তারায় যে ছবি কল্পিত হয়, শব্দের মধ্য দিয়ে রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধের যে বাস্তব বা পরাবাস্তব অনুভূতি পাঠক মনে আলোড়ন তোলে, তা-ই চিত্রকল্প। চিত্রকল্পহীন কবিতা হয়তো চমৎকার ছন্দোবদ্ধ হতে পারে, তবলায় নিখুঁত তাল এনে দিতে পারে; কিন্তু তা পাঠকের মনোজগতে নতুন কোনো অনুভূতির জগৎ তৈরি করতে পারে না। তাই কবিতার অসীম অর্থবোধকতা সৃষ্টি এবং কল্পনার আকাশে ডানা মেলার জন্য চিত্রকল্পের সার্থক প্রয়োগ অপরিহার্য, যা একজন প্রকৃত কবির সৃষ্টিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
নতুন উপশহর,যশোর|