Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আততায়ী ছায়া ছায়া মানুষ

মুনীর মুসান্না মুনীর মুসান্না
প্রকাশ : শুক্রবার, ৫ জুন,২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ৫ জুন,২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
আততায়ী ছায়া ছায়া মানুষ

কয়েকদিন হলো ভাদাইম্মাটার উৎপাত বেড়েছে চৌরাস্তায়, বড় বাজারে। দোকান প্রতি টাকা তোলার প্রতিবাদ করার পর এক সপ্তাহ চুপচাপ ছিল বদমাশগুলো। তারপর অজানা কোন ভয়ে চুপসে গেলো সবাই। দুপুরবেলা বাজার জামে মসজিদের বারান্দায় শফিক মাস্টারকে একা পেয়ে রওশন কানে কানে কিছু একটা বলতে গেল।
—ভয় পেয়েছিস নাকি?
—না।
—তাহলে একটু জোরে বল।
কী হয়েছে? এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে রওশন ইতস্তত করে বলল,
—ওরা আবার টাকা চাইতেছে মাস্টার। কিসের একটা অনুষ্ঠান করবে তার জন্য। আমি জানি, এটা একটা বাহানা মাত্র।
—আগে কী করতিস?
—যা চাইতো দিয়ে দিতাম।
—এখন দিবি না কেন?
—এবার বেশি চাচ্ছে। খুব চাপ দিচ্ছে।
শফিক মাস্টার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—দিয়ে দে।
রওশন থমকে গেল।
—তাহলে ব্যবসা বন্ধ করতে হবে।
— বন্ধ কর। বাদ দে ব্যবসা।
কথাগুলো এমনভাবে বললেন যেন অন্য কেউ বলছে। রওশনের মুখ যেন হতাশায় ভেঙে পড়ল।
—আপনিও এমন বলেন মাস্টার? গলাটা চেপে ধরার উপক্রম করছে যেন তাকে কেউ।
শফিক মাস্টার এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "দূরে রোদে ধুলা উড়ছিল। মসজিদের সাদা দেয়ালে আলো কাঁপছিল। ঘুলঘুলিতে ধুলোর আলো। আলো না পড়লে ধুলোর পরিমাণ বোঝা যায় না।"
—আচ্ছা, দেখি। তুই বাড়ি যা এখন।

পরের শুক্রবার বিকেলবেলা।
“আলোর পথ সমাজ কল্যাণ সংস্থা”র অফিস, বারান্দা আর সামনের মাঠ মানুষে গিজগিজ করছে। চার গ্রামের মানুষ এসেছে। নয়জন ইমাম, মুরুব্বি, গ্রাম পুলিশ, সন্ত্রাস প্রতিরোধ যুব কল্যাণ সংস্থার ছেলেরা—সবাই। লোকে লোকারণ্য বলা যায়। উৎসুক এসব লোকজনের চোখে আগুন ঝরে পড়ছে। ক্ষোভের আগুন।
—আজ একটা বিহিত হইবো।
—আর না। আর সহ্য করা হইবো না।
—ধর শালারে!
চিৎকারে মাঠ ফেটে যাচ্ছিল। শফিক মাস্টার এবার হাত তুলে দাঁড়ালেন।
—চুপ করেন সবাই। একটু থামেন।
ধীরে ধীরে শব্দ থেমে গেল।
—কই, ভাদাইম্মা ইবনুল কই? সাহেবালি কই?
সামনে আনো।
ইবনুল আর সাহেবালিকে যখন আনা হলো, তখন তাদের মুখে আগের সেই দাপটের লেশমাত্র নেই। ফরিদ উদ্দীন সাহেব দোকানদারদের অভিযোগ বলতে বললেন। একে একে সবাই মুখ খুলতে লাগল—চাঁদা, ভয়, হুমকি, মারধর। এসব বিষয়ের অভিযোগ যেন শেষই হয় না।
মাঝে মাঝে উত্তেজিত জনতা গর্জে উঠছে—
—ধর শালারে!
—পিটা শালারে!
শফিক মাস্টার আবার থামালেন। পুরাতন ক্ষোভে জনতা আজকে আরো উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে।
—আমরা বিচার করতে আইছি। হট্টগোল করতে না।
তারপর ইবনুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোদের কিছু বলার আছে? থাকলে বল?
ইবনুল মাথা নিচু করে রইল। সাহেবালিও চুপ।
হঠাৎ দেলবার বক্স জুতা খুলে প্রবল ঘৃণা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু-চারটা বাড়ি পড়তেই জনতা কঠিন উল্লাসে ফেটে পড়লো। যুব সংগঠনের ছেলেরা কষ্টে সামলালো সেই পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত স্ট্যাম্পে লিখে মুক্তি দেওয়া হলো—চাঁদাবাজির টাকা ফেরত দিতে হবে। আবার এমন বেআইনি কাজকর্ম করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে। এসব কঠিন সিদ্ধান্ত হলো।
সেদিনের পর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
ফেরার পথে অনেকে বলাবলি করতে লাগলো,
—জব্বর হইছে। একদম।
— বিচার এই রকমই দরকার আছিল।

তারপর দিন গড়াতে লাগল। উত্তরে জলেশ্বরে নতুন ফসলের সবুজ কতবার রঙ বদলে গেলো! নতুন করে লোকচক্ষুর সামনেই হাটের বটতলায় গাঁজার আড্ডা জমতে শুরু করল। আলমের মাছের খামারের পেছনে সন্ধ্যার পর নতুন নতুন মুখ দেখা যেতে লাগলো। ধোঁয়ার ভিতর বসে থাকে ইবনুলের সাঙ্গপাঙ্গরা। সাহেবালি আড়াল থেকে সব সামলায়। কার নির্দেশে কী হয়, কেউ জানে না; অথচ সবই ঠিকঠাক ছককষে চলতে থাকে। কেউ কেউ এসব দেখে ও না দেখার ভান করে। গোল্লায় যাক। এমন করতে করতেই এর মধ্যে একসময় মাদক ব্যবসার ভাগ নিয়ে খুনও হলো একজন। কেউ ভাবতে পারেনি বিষয়টি এতো হিংস্রতার পথে গড়াবে।
কয়েকদিন থমথমে অবস্থা।
কী বাজে এক পরিস্থিতি? সন্ধ্যার পর এমনিতেই বাজার এলাকা ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো কয়েকদিন।

"তারপর আবার সব স্বাভাবিক। মানুষ খুব দ্রুত ভয়কে মেনে নেয়। তারপর তাকে দৈনন্দিন স্বাভাবিক ঘটনা বলে ভাবতে শুরু করে।" এভাবে একদম স্বাভাবিক হয়ে এলো সব। দিন বদলের হাওয়ায় অনেক কিছু বদলে যেতে থাকে।
ইবনুলের নামে শহরের বড় বাজারে মাল্টিপারপাস মার্কেট ইবনুল প্লাজায় চা খেয়ে এসে লোকজন সেই গল্প করে এলাকায় চা দোকানে। শহরে যেতে যেতে বাসটার্মিনালের পাশে সাহেবালি আর দুলুর হাউজিং সোসাইটির সাইনবোর্ড সচরাচর চোখে পড়ে। যাদের একদিন জনতার সামনে কান ধরে ঘুরানো হয়েছিল, তারা এখন বীরদর্পে গাড়িতে ঘোরে।
মানুষ ধীরে ধীরে সব ভুলে গেল স্বাভাবিক গতিতে।
ফাল্গুনের শেষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলো। চায়ের দোকানে আলোচনা—শফিক মাস্টার আর আব্দুল কাদির পীরজাদার মধ্যে লড়াই হবে।
বিড়িতে টান দিতে দিতে হাসান বলল,
—দেখেন, এবার ইবনুল পাশ।
মতিন মাস্টার থমকে তাকালেন।
—তোরা এত তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে গেলি?
কেউ উত্তর দিল না।
চৌরাস্তায় যে দোকানে আগে শুধু চা মিলত, এখন সেখানে নাস্তার বাহার। সন্ধ্যার পর ইবনুলের মিছিলের ছেলেদের জন্য লালপানির আয়োজন হয়। রাজমিস্ত্রি, ভ্যানচালক, ঘাট শ্রমিক—সবাই হাজিরা খাটে তার সভায়।
টাকা কথা বলতে শিখেছে। অনেকে অতি উৎসাহী হয়ে উঠছে বিশেষ কারো জন্য। এসব প্রচারণার মধ্যে
এক সন্ধ্যায় ইবনুল দামী গাড়ি থামিয়ে ঢুকে গেল সুরুকজানের ভাঙা ঘরের উঠানে।
—খিদা লাগছে। কিছু খাওয়া দে।
সুরুকজান হতভম্ব। তারপর বলল,
—পাঁচটা দয়াকলা ঘুটছি। একপোয়া চাল জ্বালাইছি শুধু।
—হ, ওইডাই দে।
টিনের প্লেটে ভাত আর দয়াকলা ঘন্ট এগিয়ে দিল সুরুকজান। ইবনুল বারান্দার মাটিতে বসে খেতে লাগল। বাইরে তার গাড়ির কাচে শেষ সন্ধ্যার আলো পড়ছিল। অন্ধকারের মধ্যে আলোর পোকার রঙ চেনা যায় না।

জৈষ্ঠ্যের শেষ দিকে একদিন।
“আলোর পথ সমাজ কল্যাণ সংস্থা”র নাম বদলে এখন “উন্নয়ন মডেল এলাকা অফিস”। চেনা দুষ্কর।
সেখানে আজ বিচার বসিয়েছে চেয়ারম্যান ইবনুল। রাতের অন্ধকারের মতো ভয়ানক আততায়ী ছায়া মোড়া এক অচেনা চরিত্রের সামনে নিঃশব্দে বারান্দায় ভয়ার্ত মুখে বসে আছে মহর আলী। ওপাশে বিশ্ব আর জামশেদ বিড়ি টানছে। মেম্বর আক্কাজ বলল,
—চেয়ারম্যান সাব, শালারে এখন দড়ি দিয়া ঝুলাইতে হয়। আপনার অবাধ্য হয়!
খুব অবাধ্য!
হাসান, হাকিম, জয়নাল—যারা একদিন চিৎকার করেছিল “ধর শালারে, ধর”—আজ তারা ইবনুলের পাশে বসে মাথা নাড়ছে।
মিজান আগ বাড়িয়ে বলল,
—অনেকদিন ধইরা শুনতেছি চেয়ারম্যান সাব। মহর নাকি আপনার বিরুদ্ধে কথা কয়।
সাহস দেখো!
জব্বার মিয়া এই সুযোগে ফোঁড়ন কাটল,
—ও কি চেয়ারম্যান হইতে চায় নাকি?
মহরের বৃদ্ধ বাবা হাত জোড় করলেন।
—বাবা, পোলাডারে মাফ কইরা দেন। ভিটেমাটি ছাড়া কইরেন না চেয়ারম্যান সাব। মিনতি।
একটু দয়া দেন চেয়ারম্যান সাব।
ইবনুল চুপচাপ শুনছিল। বিড়ি ফুকতে ফুকতে তার দৃষ্টি কোথায় রেখেছে কেউ তাকানোর সাহস করে না। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ করে।
ঘরের ভেতর হঠাৎ সুনসান নীরবতা নেমে এলো।
—এখনই এলাকা ছাড়া হবি, মহর।
এখনই।
কথাটা খুব আস্তে বলল সে। অথচ সেই স্বরেই সবাই কেঁপে উঠল। ধারালো ছুরির মতো ভয়। তাতেই মুহূর্তে যেন লুকানো চকচকে নিখুঁত ছুরির মতো ভয়ে ছেয়ে গেলো চারপাশটা।
মহরের ছেলেমেয়েরা কাঁদতে লাগল। বৃদ্ধ বাবা পা জড়িয়ে ধরলেন। কেউ এগিয়ে এল না। এগিয়ে আসার সাহস কারো হবে না, এমন পরিবেশ বহু আগেই সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়।
সাহেবালির ধমকে মুহূর্তে সবাই চুপ হয়ে গেল। কিছু একটা বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে গেল মোহরের।
বারান্দার বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে। বাতাসে পুরনো বটগাছের পাতা নড়ছে ধীরে ধীরে।
ইবনুল বেরিয়ে গেল।
লোকজন বোবা হয়ে বসে রইল।
কেউ আর মনে করতে চাইলো না-
এই উঠানেই একদিন ইবনুল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল।
কার যেন বিচার হয়েছিল? মনে পড়ছে না!
মনে করতে চায় না কেউ।



ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)