Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

চিত্রকল্প : কবিতার নান্দনিক ঘ্রাণ

সৈয়দ আহসান কবীর সৈয়দ আহসান কবীর
প্রকাশ : শুক্রবার, ৫ জুন,২০২৬, ১২:২৯ পিএম
চিত্রকল্প : কবিতার নান্দনিক ঘ্রাণ

বিতায় চিত্রকল্প কোনো বাহ্যিক অলংকার নয়, বরং কবিতার ঘ্রাণ। যে ঘ্রাণ কৌশলে কবিতার কথাকে পাঠকের ইন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে মানসচিত্র বা অনুভবযোগ্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। যে কবিতায় চিত্রকল্প যতোটা শক্তিশালী, সেই কবিতাটি সাহিত্যের ইতিহাসে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কবিতাটি রাজত্ব করে যুগের পর যুগ। যদিও চিত্রকল্প ছাড়া অসংখ্য বিখ্যাত কবিতা রয়েছে এবং সে-সব কবিতার আয়ুও বেশ লম্বা।

কবিতার ভাষা পাঠকের ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিলেই তাকে চিত্রকল্প বলা চলে। যে চিত্রকল্প যতটা সহজে পাঠকের হৃদয়ে কল্পনার রঙ ছড়ায়, ছাপ আঁকে, সেসব চিত্রকল্প ততটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কবি জীবনানন্দ দাশ কিংবা কবি আল মাহমুদের কাছে চলুন, চিত্রকল্পে তারা গড়েছেন কবিতার ইমারত। ‘সোনার তরী’র কথা মনে আছে? বয়স কতো হলো তার? ১২৫ থেকে ১৩৫ বছরের মধ্যে কোনো একটি। অথচ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতাটির গায়ে বয়সের কোনো ছাপ পড়েনি। আমার তো এখনই মনে পড়ছে কয়েকটি পঙক্তি, যেখানে তিনি লিখেছেন,

‘একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,/চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।/পরপারে দেখি আঁকা/তরুছায়ামসীমাখা/গ্রামখানি মেঘে ঢাকা/প্রভাতবেলা’।

পঙক্তিগুলো পড়তেই আমার হৃদয়পটে নদীর জল, দূরের গ্রাম, মেঘে ঢাকা প্রভাতের একটি জীবন্ত দৃশ্য জেগে উঠে চোখের সামনে ফুটে থাকে। টিএস এলিয়টের ‘The Burial of the Dead’ কবিতার ‘And I will show you something different from either/Your shadow at morning striding behind you/Or your shadow at evening rising to meet you;/I will show you fear in a handful of dust’

অংশের ‘I will show you fear in a handful of dust’ পঙক্তিতে প্রতীকী, মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে, যেখানে ‘dust বা ধুলো’ মানবজীবনের ক্ষয়, মৃত্যু ও শূন্যতার প্রতীক হয়ে ভয়কে দৃশ্যমান করে তোলে।

কবি শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতার পুরোটা জুড়েই শক্তিশালী চিত্রকল্পে ভরপুর। ‘গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা দেখে দেখে রঙিন মাছের/আশায় চিকন ছিপ ধরে গেছে বেলা। মনে পড়ে, কাঁচি দিয়ে/নকশা কাটা কাগজ এবং বোতলের ছিপি ফেলে/সেই কবে আমি ‘হাসিখুশি’র খেয়া বেয়ে/পৌঁছে গেছি রত্নদ্বীপে কম্পাস বিহনে’, অংশটি আমার খুব টানে। তারমধ্যে ‘গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা দেখে দেখে রঙিন মাছের/আশায় চিকন ছিপ ধরে গেছে বেলা’র চিত্রকল্প অন্তত আমাকে অন্য এক জগতে পরিভ্রমণ করায়, ভাবায়। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী দৃশ্য ও বর্ণচিত্র বলে আমার মনে হয়। ‘গলিত কাচ’ তরল, ঝলমলে ও ভাঙা আলোর মতো আমাকে নতুন জগতে নিয়ে যায় আর ‘রঙিন মাছ’ পানির ভেতর জীবন্ত রঙের চলাচলকে ফুটিয়ে তোলে। চোখে ভেসে ওঠে এক ধরনের স্বচ্ছ, ঝিলমিল করা পানির জগৎ। যেখানে আলো, জল ও রঙ; সব মিলিয়ে এক জীবন্ত চিত্র তৈরি হয়।

চিত্রকল্পের শব্দচয়নের থাকতে হয় মুনশিয়ানা, আর কাব্যিক প্রকাশে থাকতে হয় দক্ষতা। কবিতা আমার সঙ্গী। তাই যতটুকু বুঝি বা বিশ্বাস করি, তাতে এই দুটি গুণ অর্জিত হয় শব্দসাধনার মাধ্যমে। কবিতা লেখা ও কবিতা আসা যেমন দুটি ভিন্ন বিষয়, তেমনই চিত্রকল্প ভর করা আর চিত্রকল্পকে লিখে দেওয়া আলাদা কিছু। চিত্রকল্প সাধকের কলমকে স্পর্শ করে অনুভূতি সৃষ্টিতে বাধ্য করে। তাই শব্দসাধনার বিকল্প এখানে আর কিছু নেই। এই সাধনা গড়ে ওঠে প্রকৃতিপাঠ থেকে। আপনি হাঁটছেন, চলছেন, বসছেন বা ঘুরছেন যখন, তখন আশপাশ খেয়াল করুন, আত্মস্থ করুন—প্রকৃতি আপনার ওপর ভর করবে, নাড়া দেবে। একটি গাছের পাতা ঝরে পড়াকে সাধারণ মানুষ যেভাবে দেখে, কবির চোখ দেখে অন্যভাবে। কারণ, কবি সেই ঝরা পাতার কান্না শুনতে পান। গরুর ডাকে যখন কেউ ‘হাম্বা’ শোনেন, কবি তখন সেখানে বৃষ্টির পূর্বাভাস জানতে পারেন। এটাই সাধনা, এটাই প্রকৃতিপাঠ। 

কবি আল মাহমুদের কবিতা বলে দেয়, তিনি প্রকৃত প্রকৃতিপাঠক ছিলেন। তাই তার অধিকাংশ কবিতায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির উজ্জ্বল চিত্রকল্প খুব শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ প্রায় সব কবিতা পাঠকের কাছে পরিচিত নাম। সেটির কাছেই চলুন যাই। এটি পড়লে কয়েকটি পঙক্তি আপনাকে কবিতাটি থেকে বের হতে দেবে না। কারণ সেখানে আছে বাস্তবতা, দেহজ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিজ্যুয়াল রোমান্টিসিজম। কবি লিখেছেন, ‘ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন,/ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;/দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন/আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি।’ তার যে কবিতাটির শরীরজুড়ে চিত্রকল্পের মধুর মিশ্রণ রয়েছে,  সেটি ‘নোলক’। ‘বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে/শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে’ অথবা ‘হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে’ কিংবা ‘বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক/হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ/এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম/পা আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।’

অর্থাৎ, শব্দ দিয়ে যিনি ছবি আঁকেন কবি। শব্দ-তুলিতে আঁকা সেই ছবিই যখন চিত্রকল্প। সেখানে জেগে থাকে কবির আনন্দ-বেদনার রঙ, ভেসে থাকে ভাবনা-পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও অনুভবের সঞ্চিত স্রোত। যে স্রোতই ঢেউ খেলে যায় পাঠকের অন্তরে। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর গীতি কবিতাটি মনে নেই কার! যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ঢেকে রাখে যেমন কুসুম,/পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।/তেমি তোমার নিবিড় চলা/মরমের মূল পথ ধরে।/....../পুষে রাখে যেমন ঝিনুক,/খোলশের আবরনে মুক্তার সুখ।/তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া/ভিতরের নীল বন্দরে।’ পঙক্তিগুলো পড়লেই পাঠকের মন কবিতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর অন্তর্জগতের গভীর স্তরে নাড়া দেয় এর প্রতিটি শব্দ। সেটি গন্ধ ছড়ায়। যে গন্ধ শব্দের অন্তরালে জাগিয়ে তোলা দৃশ্যে অনুভবের দরজা খুলে দেয়। তাই তা জড়িয়ে ও ছড়িয়ে যায় মস্তিষ্কে।

যে নামটি শুরুতেই বলে এসেছিলাম তিনি চিত্রকল্পের কবিখ্যাত জীবনানন্দ দাস। তিনি তার ‘বনলতা সেন’-এ লিখেছেন, ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন/সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’। প্রকৃতি যেন এই পঙক্তিদ্বয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার এই ‘বনলতা সেন’জুড়েই চিত্রকল্পের সিনকোনাইজড অঙ্কন রয়েছে। চলুন, কিছু অংশ পড়ি, “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর/হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা/সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,/তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’/পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” শুরু থেকে যা বলে এসেছি, বোধ হয়, এই কয়েকটি পঙক্তি নিয়ে আর কিছু না বললেই পাঠক বরং চিত্রকল্প সম্পর্কে ভালো বুঝতে পারছেন।

যদিও কবি হেলাল হাফিজের লেখা ‘অশ্লীল সভ্যতা’র মতো শক্তিশালী বক্তব্য ‘নিউট্রন বোমা বোঝ মানুষ বোঝ না!’ চিত্রকল্প ছাড়াই টিকে থাকে। তাই চিত্রকল্পকে আমি কবিতার অপরিহার্য কৌশল বলে মনে করি না। তবে, চিত্রকল্পকে কবিতার নান্দনিক ঘ্রাণ বলে ধারণ করি। এটি কবিতায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিই। কারণ, নান্দনিক এই ঘ্রাণ শুষে কবিতাকে নিঃস্ব করার মতো কোনো ঠোঁট আজও সৃষ্টি হয়নি।

অনেক বেশি উদাহরণ টেনে এ লেখাটিকে আর ভারি করতে চাচ্ছি না। তবে, ইংরেজি সাহিত্যের ইমেজারি বা চিত্রকল্পকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারসোনিফিকেশন, মেটাফোর জানা থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

সাহিত্যে ভাষাকে শুধু অর্থ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে অনুভূতি ও কল্পনার জগৎ নির্মাণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই কবিতা নির্মাণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো পারসোনিফিকেশন, মেটাফোর ও ইমেজারি।

পারসোনিফিকেশন বা মানবায়ন হলো এমন একটি অলংকার, যেখানে জড় বস্তু, প্রকৃতি, প্রাণী বা বিমূর্ত ধারণাকে মানুষের মতো গুণ, আচরণ বা অনুভূতি প্রদান করা হয়। এর উদ্দেশ হলো অমানবিক বিষয়কে জীবন্ত ও মানবিক করে তোলা যেন পাঠক সহজে তার সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হতে পারে। যেমন : ‘বললো কেঁদে তিতাস নদী...’, এখানে নদী কাঁদছে এবং কথা বলছে। কিন্তু নদী কাঁদতে, বাস্তবে কথা বলতে পারে না। এখানে নদীকে মানুষের মতো আচরণ করতে দেখানো হয়েছে।

মেটাফোর বা  রূপক হলো এমন একটি অলংকার, যেখানে ‘মতো’, ‘যেন’ ইত্যাদি শব্দ ছাড়াই এক বস্তুকে সরাসরি অন্য বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে দুইটি ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অর্থগত সাদৃশ্য তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ হলো অর্থকে গভীর, প্রতীকী ও কল্পনাময় করে তোলা। উদাহরণ হিসেবে ‘তুমি আমার সূর্য’ এবং ‘জীবন এক সমুদ্র’-এর দিকে তাকাই। এখানে মানুষকে সূর্য বা জীবনকে সমুদ্র হিসেবে সরাসরি বলা হয়েছে।

ইমেজারি বা  চিত্রকল্প হলো এমন ভাষাগত কৌশল, যার মাধ্যমে পাঠকের মনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্পর্শ, স্বাদ) একটি মানসচিত্র বা অনুভবযোগ্য দৃশ্য তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ হলো পাঠককে বোঝানোর পাশাপাশি দেখানো, শোনানো ও অনুভব করানো। ‘শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে’ পঙক্তিতে আমরা চোখের সামনে সাদা বকের দৃশ্য দেখতে পাই। এটি ভিজ্যুয়াল ইমেজারি বা দৃশ্যকল্প। এ ছাড়া এই পঙক্তিতে স্পেশাল ইমেজারি, কালচারাল সিম্বলিজমও কাজ করেছে। এখানে সরাসরি চোখে দেখা যায় এমন একটি দৃশ্য তৈরি হয়েছে শাদা পালকের বক (পাখি) যেখানে বসে বা উড়ে আছে। শাদা পালক, বক, পাখ ছাড়িয়ে থাকা—এই শব্দগুলো পাঠকের মনে একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি করে। আর স্পেশাল ইমেজারি বা স্থানিক ধারণাতে আছে, ‘যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে’ অংশটি। এটি নির্দিষ্ট স্থান বা বিস্তৃত আকাশ বা জলাভূমির ধারণা দেয়। অর্থাৎ বকরা কোথায় অবস্থান করছে—এর একটি স্থানিক বিন্যাস বোঝা যায়। এতে উচ্চতা, দূরত্ব ও পরিবেশের একটি মানসিক মানচিত্র তৈরি হয়। এদিকে, বাংলা সংস্কৃতিতে বক সাধারণত নির্জনতা ও শুদ্ধতার অর্থ বহন করে। শাদা রং আবার পবিত্রতা বা শান্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। ফলে পুরো পঙক্তিটি শুধু দৃশ্য নয়, একটি সাংস্কৃতিক অর্থও তৈরি করে নির্জন প্রকৃতি, শুদ্ধতা বা ধ্যানমগ্নতার প্রতীকী ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ‘ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও’ অংশে ঘ্রাণের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। এটি অলফ্যাক্টরি ইমেজারি বা ঘ্রাণগত চিত্রকল্প ইত্যাদি।

পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, পারসোনিফিকেশন, মেটাফোর ও ইমেজারি—এই তিনটি ধারণা আলাদা হলেও অনেক সময় একসঙ্গে কাজ করে। এটি আগেও বলেছি। এখন, পারসোনিফিকেশন বিষয়কে জীবন্ত করে, মেটাফোর অর্থকে প্রতীকী করে আর ইমেজারি সেই অর্থকে অনুভবযোগ্য দৃশ্যে রূপ দেয়। অর্থাৎ, পারসোনিফিকেশন ও মেটাফোর অনেক ক্ষেত্রে ইমেজারি নির্মাণে সহায়তা করে, তবে ইমেজারি নিজে একটি বিস্তৃত অনুভূতিনির্ভর কাঠামো।

আবার নোলক কবিতায় চলুন। এই কবিতার ‘বললো কেঁদে তিতাস নদী’ থেকে পারসোনিফিকেশন, মেটাফর, ইমেজারির পার্থক্য খুঁজি। এখানে পারসোনিফিকেশন ও ইমেজারি আছে। ইমপ্লিসিট মেটাফোরিক্যাল আইডেন্টিটি বা অন্তর্নিহিত রূপক আছে। নদীকে মানুষ বানানো হয়েছে এবং দৃশ্যও তৈরি হয়েছে। নদীকে অন্তর্নিহিত রূপকে আকারে তুলে ধরা হয়েছে। ‘হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে’ পঙক্তিতে আবার তিনটিই আছে। পারসোনিফিকেশন (নদীর শরীর আছে), ইমেজারি (বোয়াল মাছে ভরা নদীর দৃশ্য) এবং আংশিক মেটাফোট (নদীকে শরীর হিসেবে ভাবা)। একইভাবে ‘এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন’-এও তিনটিই একসঙ্গে কাজ করছে। রাত্রি একজন নারী অর্থাৎ পারসোনিফিকেশন, রাত্রিকে নারীরূপে কল্পনা হলো মেটাফোর এবং এলিয়ে থাকা খোঁপার দৃশ্য হলো ইমেজারি।

অর্থাৎ, সহজে বলতে গেলে পারসোনিফিকেশনের কাজ মানুষ বানানো, মেটাফোরের কাজ এক জিনিসকে অন্য জিনিস হিসেবে উপস্থাপন আর ইমেজারির কাজর পাঠকের মনে অনুভূতির ছবি তৈরি করা। তার মানে গিয়ে দাঁড়ায়, ইমেজারি তৈরিতেও পারসোনিফিকেশন ও মেটাফোরের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।

সঙ্গায়িত করতে বললে বলবো, চিত্রকল্প সাহিত্যে ব্যবহৃত এমন ভাষাগত কৌশল, যার মাধ্যমে শব্দ ও বাক্য প্রয়োগের সাহায্যে পাঠকের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতাকে সক্রিয় করে একটি স্পষ্ট, জীবন্ত ও অনুভবযোগ্য চিত্র সৃষ্টি করে; যা কেবল দৃশ্য নির্মাণ নয়, বরং অনুভূতি, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ইন্দ্রিয়ভিত্তিক পুনর্গঠন ঘটায়। সংক্ষেপে বলা যায়, চিত্রকল্প হলো ভাষার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মানসচিত্র সৃষ্টির কৌশল।

পরিশেষে বলবো, কবিতাকে শুধু ভাবপ্রকাশ মনে করলে ভুল হবে। কবিতা ভাবকে দৃশ্যে রূপান্তরিত করার একটি ঐশ্বরিক শক্তি বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই সেখানে চিত্রকল্পের নির্মাণ শক্তিশালী না হলে বর্তমানে কবিতার পাঠক সেই দৃশ্যের ভেতরে প্রবেশ থেকে বিরত থেকেই যাবেন। আর কবিতা দিনদিন দুর্বল হতে হতে মারা যাবে। বর্তমানের পাঠক এজন্য বললাম যে, এ সময়ের মানুষ ভিজ্যুয়াল বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে কাল্পনিক রেখা অতিক্রমে বিশ্বাসী।

 লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)