মো. খায়রুল আবেদীন
ইউরোপে ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তারিক ইবন জিয়াদের (জ. আনুমানিক ৬৭০-মৃ. ৭২০) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জিব্রাল্টার পেরিয়ে স্পেন ও পর্তুগালের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করেন। এ অঞ্চলটি পরে আন্দালুস নামে পরিচিত হয়। তারিক ইবন জিয়াদ যখন প্রথম জিব্রাল্টার প্রণালী পেরিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করেন তখন এ অঞ্চলটির অধিকাংশ অংশ ছিল ভিসিগযদের শাসনে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে ইউরোপে হাতে গোনা স্বল্প সংখ্যক মুসলমান বাস করত।
স্পেন
স্পেনে মুসলমানরা প্রায় আটশত বছর (৭১১-১৪৯২) রাজত্ব করেন। শুরুতে এটি দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতো কিন্তু ৭৫৬ সালে আব্বাসীয়দের হাতে উমাইয়া বংশের পতনের পর রাজপুত্র আব্দুর রহমান স্পেনে পালিয়ে আসেন এবং স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। আব্দুর রহমান প্রতিষ্ঠিত কর্ডোভা খিলাফত ৭৫৬ থেকে ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকেছিল। সে সময়টাকে মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ১০৩১ সালে কর্ডোভা খিলাফতের পতনের পর মুসলিম স্পেন প্রায় ২০-৩০টি ছোট স্বাধীন রাজ্যে (তায়েফা) বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে খ্রিষ্টান শাসকরা ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। ১৪৯২ সালে নাসিরি রাজবংশের শেষ শাসক দ্বাদশ মোহাম্মদ স্পেনের ক্যাথলিক রাজাদের কাছে গ্রানাডার চাবি হস্তান্তর করেন। এর মধ্যদিয়ে স্পেনে মুসলিম শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। খ্রিষ্টান শাসকরা মুসলিম ধর্ম বিশ্বাসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে স্পেনের সব মুসলিমকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচলাখ মুসলিম আফ্রিকা বা অন্য কোনো মুসলিম দেশে যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠতে বাধ্য হয়। গ্রানাডার পতন ও সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম নির্বাসিত অথবা নিহত হয়।
পর্তুগাল
পর্তুগালে মুসলিম শাসন শুরু হয় ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে। উমাইয়া খিলাফতের সময় উত্তর আফ্রিকার মুসলিম বাহিনী আইবেরীয় উপদ্বীপ দখল করে। পরবর্তীতে বর্তমান পর্তুগালের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। মুসলমান শাসন পর্তুগালে প্রায় ৫০০ বছর চালু ছিল। মুসলিম শাসনের সময় পর্তুগালে কৃষি সেচব্যবস্থা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে। ইউরোপে খ্রিস্টান রাজ্যগুলো পুনঃদখল অভিযান অর্থাৎ Reconquista এর সময় মুসলিম শাসন শেষ হয়। ১২৪৯ সালে সর্বশেষ ভূখণ্ডটি পর্তুগিজরা দখল করে। এভাবে ইউরোপের দেশ পর্তুগালে মুসলিম শাসনের জবনিকা ঘটে।
গ্রীস
১৪শ শতকে গ্রিসে খণ্ড খণ্ড অংশে মুসলিম শাসন শুরু হয়। ১৪৫৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে কনস্টান্টিনোপল (Constantinople) এর পতন ঘটে এবং ইউরোপে মুসলিম প্রভাব বিস্তার হতে থাকে। ১৪৫৮ থেকে ১৪৬০ সালের মধ্যে গ্রিসের বড় অংশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ১৮শ শতকে গ্রিসের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।
১৮২১ সালে গ্রীকরা যুদ্ধ করে দীর্ঘ ৯ বছর যুদ্ধের পর ১৯৩০ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। দীর্ঘ ৪০০ বছর শাসনের পর গ্রিস মুসলমানদের হাতছাড়া হয়।
হাঙ্গেরি
হাঙ্গেরিকে অটোমান সাম্রাজ্য মুসলিম শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। ১৫৪১ সালে বুদাপেস্ট দখলের পর হাঙ্গেরির বড় অংশে অটোমান শাসন চালু হয়। মুসলমানরা এখানে ১৫৮ বছর শাসন ধরে রাখে। অতঃপর ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে কার্লোভিটস চুক্তির (Treaty of Karlowitz) মাধ্যমে হ্যাবসবার্গ বা Habsburg ( ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাজপরিবার হলো হ্যাবসবার্গ। তারা ১২৮২ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়াসহ মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিল।) এর নিকট হাঙ্গেরিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং হাঙ্গেরিতে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। মুসলমানদের উদারতা এবং খ্রিস্টানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করায় শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরি খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে যায়।
সার্বিয়া
১৪৫৯ সালে অটোমানরা সার্বিয়া জয় করার মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। অতঃপর প্রায় ৩৫০ বছর সার্বিয়া মুসলিম তথা অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় কিছু স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। বিশেষ করে শহরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল। ১৮০৪ সালে প্রথম সার্বীয় বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৮১৫ সালে দ্বিতীয় বিদ্রোহের পর সার্বীয়রা স্বায়ত্বশাসন লাভ করে। ১৮৭৮ সালে সার্বিয়ার স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সার্বিয়া একটি খ্রিষ্টানপ্রধান রাষ্ট্র হলেও সানজাক অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এখনও বসবাস করে।
বসনিয়া
১৫শ শতকে বসনিয়ায় প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। ১৪৬৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্য বসনিয়া দখল করে মুসলিম শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। এ সময় অনেক স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। অটোমানদের ৪০০ বছরের শাসনে বসনিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৮৭৮ সালে বসনিয়ায় মুসলিম শাসনের অবসান হয় এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বর্তমানে বসনিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র। সেখানে মুসলিম জনসংখ্যার হার ৫০.৭%। বসনিয়া ইউরোপের একটি বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক।
আলবেনিয়া
১৪ শতকের শেষভাগে আলবেনিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ১৪৭৯ সালে অটোমানরা পুরো আলবেনিয়ার উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে। আলবেনিয়ায় ৪০০ বছরের মুসলিম শাসন আমলে অধিকাংশ আলবেনীয় ইসলাম গ্রহণ করে। ১৯১২ সালে অটোমান শাসনের অবসান হলেও বর্তমানে আলবেনিয়া একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। বর্তমানে আলবেনিয়ায় প্রায় ৫০-৬০% মানুষ মুসলিম।
কসোভো
১৪৫৫ সালে কসোভো অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ৪০০ বছরের মুসলিম শাসনে মানুষ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। ১৯১২ সালে এখানে অটোমান শাসনের অবসান ঘটে। বর্তমান কসোভো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। বর্তমানে কসোভোর জনগোষ্ঠীর ৯০-৯৫% মানুষ মুসলিম।
আজারবাইজান
৭ম শতকে আজারবাইজানে ইসলামের আগমন ঘটে। এখানে একপর্যায়ে স্থানীয় মানুষ ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। পর্যায়ক্রমে এ অঞ্চল শিরভানশাহ, সাফাভিদ ও অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে আজারবাইজান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত এই দেশটিতে ৯৫ ভাগের বেশি মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী।
দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলি
৮৩১ সালে মুসলিমরা সিসিলি জয় করে। আস্তে আস্তে মুসলমানদের হাতে নতুন নতুন এলাকার পতন হয় এবং মুসলিম শাসন স্থায়ী হয়। প্রায় ২৬০ বছর মুসলমানরা সিসিলিতে শাসন বজায় রাখে। এ সময় দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন অংশে মুসলিমদের প্রভাব বাড়তে থাকে। নরম্যানদের সিসিলি বিজয়ের মাধ্যমে এবং পরবর্তী সময়ে মূল ভূখণ্ডে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।
উপসংহার
ইউরোপে মুসলিম শাসনের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নয়, বরং তা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। আন্দালুস ও সিসিলির জ্ঞানচর্চা এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তি পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া, আলবেনিয়া ও কসোভোয় দীর্ঘ অটোমান শাসনের ফলে ইসলাম আজও স্থায়ী সামাজিক ও ধর্মীয়ধারা হিসেবে সগৌরবে টিকে আছে। স্পেনে চরম দমনপীড়নের পরও আলহামরা বা কর্ডোভার স্থাপত্যের মতো সাংস্কৃতিক চিহ্ন আজও অম্লান। সংঘাত ও সহাবস্থানের এই বৈচিত্র্যময় ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইউরোপের রূপান্তর বোঝা অসম্ভব। ইউরোপীয় সভ্যতার বিকাশে মুসলমানদের এই অবদান চিরকাল এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক: ব্যাংকার ও ইতিহাস বিষয়ে বিদগ্ধ
আরও পড়ুন-
ইরান রাষ্ট্রের সৃষ্টি: ইহুদিরা বন্ধু থেকে শত্রু