Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বাতাসে বারুদের গন্ধ: বিপন্ন শৈশব

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন,২০২৬, ০৮:১৪ এ এম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন,২০২৬, ০৯:৪৪ এ এম
বাতাসে বারুদের গন্ধ: বিপন্ন শৈশব

 যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন তুলি, গল্পের বই কিংবা খেলার পুতুল, সেই বয়সে আজ বিশ্বজুড়ে লাখো শিশুর হাত রক্তাক্ত হচ্ছে বারুদের কালচে দাগে। রাজনীতির দাবার ঘুটি, ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য আর বুলেটের হুংকারে আজ বিপন্ন মানবতা। প্রতি বছর ৪ জুন 'আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস' যখন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন তা কোনো উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে না; বরং তা নিয়ে আসে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার গ্লানি। সিরিয়া থেকে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন থেকে ইয়েমেন—বিশ্বের মানচিত্রে চোখ রাখলেই দেখা যায়, বোমারু বিমানের বিকট শব্দে হারিয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ শৈশবের খিলখিল হাসি। আগ্রাসনের আগুনে পুড়তে থাকা এই পৃথিবীতে আজ প্রতিটি শিশুর আর্তনাদ আমাদের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস

 লেবাননে ১৯৮২ সালের জুনে ইসরাইলি আগ্রাসনে নিহত অসংখ্য ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ শিশুর স্মরণে জাতিসংঘ ৪ জুনকে 'আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে আজ ২০২৬ সালেও যখন বিশ্বজুড়ে শিশুদের ওপর চলমান নিষ্ঠুরতা আমরা দেখি, তখন প্রশ্ন জাগে—বিগত ৪৪ বছরে মানবসভ্যতা আসলে কতটা সভ্য হতে পেরেছে? আজ এই দিবসটি কোনো উৎসবের নয়, বরং বিশ্ব বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক চরম আত্মসমালোচনার দিন।

​আজকের পৃথিবী প্রযুক্তি আর আধুনিকতায় যতটাই এগিয়ে যাক না কেন, শিশুদের জন্য তা ক্রমশ এক নরকে পরিণত হচ্ছে। গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে ইউক্রেন, সুদান, সিরিয়া কিংবা মিয়ানমার—বিশ্বের প্রতিটি সংঘাতপ্রবণ এলাকার বাতাস আজ গোলাবারুদের গন্ধে ভারী। আর সেই বিষাক্ত বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব। যে চোখগুলো রঙিন প্রজাপতির পিছে ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই চোখগুলো আজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে বোমারু বিমানের আতঙ্কে। যে হাতগুলোতে থাকার কথা ছিল খেলার পুতুল আর স্কুলের খাতা, সেই হাতগুলো আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে আপনজনদের মরদেহ হাতড়ে বেড়ায়। বর্তমান বিশ্বে কোটি কোটি শিশু কোনো না কোনোভাবে সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রত্যক্ষ আগ্রাসনের শিকার। যুদ্ধ শুধু একটি শিশুর বর্তমানকেই কেড়ে নেয় না, বরং তার পুরো ভবিষ্যৎকে পঙ্গু করে দেয়। বোমার স্প্লিন্টারে হাত-পা হারানো একটা শিশুর শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও ভয়াবহ হলো তার মনের ভেতরের ক্ষত। চোখের সামনে মা-বাবাকে মরতে দেখা, নিজের চিরচেনা ঘরটিকে ধূলিসাৎ হতে দেখার যে মানসিক ট্রমা (Post-Traumatic Stress Disorder), তা কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ কোনোদিন সারিয়ে তুলতে পারে না।এই শিশুরা বড় হয় একরাশ ক্ষোভ, ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে, যা পরবর্তী প্রজন্মকেও এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়।

​​আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন কিংবা জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ—সবই আজ পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের রাজনীতির কাছে কেবলই কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে।নিচে কয়েকটি রাষ্ট্রের অবুঝ শিশুদের কান্নার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো -

​১. ফিলিস্তিন (গাজা ও পশ্চিম তীর)

​দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর ভয়াবহ সামরিক অভিযানের ফলে ফিলিস্তিনি শিশুদের পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম অধ্যায়ে রূপ নিয়েছে।

​প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ব : ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাতের পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ২১,০০০ এরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৪৪,০০০ এর বেশি শিশু, যাদের একটি বিশাল অংশ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।

​দুর্ভিক্ষ ও পুষ্টিহীনতা : উত্তর গাজা সহ পুরো উপত্যকায় তীব্র খাদ্য ও মানবিক সহায়তার অবরোধের কারণে তীব্র পুষ্টিহীনতা (Malnutrition) দেখা দিয়েছে। ক্ষুধায় এবং তীব্র শীতে (হাইপোথার্মিয়া) নবজাতক ও শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

​অনাথ ও আশ্রয়হীন : গাজায় হাজার হাজার শিশু তাদের মা-বাবা উভয়কেই হারিয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছে (জাতিসংঘ যাদের 'WCNSF' বা Without Surviving Family হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে)।

​শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস : গাজার শতভাগ শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অধিকাংশ স্কুল ভবন হয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, না হয় বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও বিধিনিষেধের কারণে শিশুদের শিক্ষা ও জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

​২. লেবানন

​লেবাননের শিশুরা গত কয়েক বছর ধরে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি বিমান হামলা ও সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে গভীর সংকটে পড়েছে।

​গণ-বাস্তুচ্যুতি : সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসনে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি শিশু তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে (যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৯,০০০ শিশু)। লেবাননের প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন বাস্তুচ্যুত।

​আশ্রয় ও মৌলিক সংকট : শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে পার্ক, গণপরিবহন, অসমাপ্ত ভবন কিংবা উপচে পড়া আশ্রয়কেন্দ্রে (যার সিংহভাগই স্কুল) মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাশিল ও বালবেকের মতো এলাকায় বোমাবর্ষণে পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় শিশুরা টাইফয়েড ও কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছে।

​মানসিক ট্রমা : লেবাননের শিশুরা এক দশকের মধ্যে বারবার যুদ্ধ এবং বোমাবর্ষণের মুখোমুখি হওয়ায় গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার (Psychological Scars) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশকে স্থবির করে দিচ্ছে।

​৩. সিরিয়া

​গত দেড় দশক (১৫ বছর) ধরে চলা গৃহযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের শেষের দিকে হওয়া ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সিরিয়ার শিশুরা এক দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

​মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা : সিরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৭৪ লাখ (৭.৪ মিলিয়ন) শিশু জরুরি মানবিক সহায়তার ওপর টিকে আছে। ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬ লাখ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

​শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়া : সিরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রায় ২৭ থেকে ৩০ লাখ শিশু সম্পূর্ণভাবে স্কুলের বাইরে (Out of school)। প্রায় ৭,০০০ স্কুল ভবন যুদ্ধের কারণে পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে।

​অবিস্ফোরিত বোমার আতঙ্ক : যুদ্ধক্ষেত্রের পুরনো ফ্রন্টলাইনগুলোতে ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও গোলাবারুদ (Explosive Ordnance) প্রতিনিয়ত শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। প্রতিদিন খেলতে গিয়ে বা পথ চলতে গিয়ে শিশুরা এর শিকার হচ্ছে। এছাড়া দারিদ্র্যের কারণে বিপুল সংখ্যক শিশু 'শিশুশ্রম' এবং কন্যাসন্তানরা 'বাল্যবিয়ে'র শিকার হচ্ছে।

​৪. সুদান

​২০২৩ সাল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী (SAF) এবং আধাসামরিক বাহিনী (RSF)-এর মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সুদানকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিশু বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষুধা সংকটের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

​বিশ্বের বৃহত্তম শিশু বাস্তুচ্যুতি সংকট : সুদানের চলমান যুদ্ধে ৫০ লাখের (৫ মিলিয়ন) বেশি শিশু ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। বাস্তুচ্যুত প্রতি ৩ জন মানুষের মধ্যে ২ জনই শিশু।

​ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্রের আঘাত : ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সুদানে শিশুদের হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে (গত বছরের তুলনায় ৫০% বেশি)। বিশেষ করে দারফুর ও কর্দোফান অঞ্চলে আধুনিক ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বেশি শিশু মারা যাচ্ছে।

​মারাত্মক অনাহার ও মহামারি : সুদানের আল-ফাশির ও কাদুগলিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় আনুষ্ঠানিক 'দুর্ভিক্ষ' (Famine) দেখা দিয়েছে। প্রায় ৪২ লাখ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যার মধ্যে ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে থাকার কারণে হাম, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও কলেরার মতো মহামারি শিশুদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

​৫. ইউক্রেন

​২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন আজ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ ইউক্রেনের শিশুদের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​ক্রমবর্ধমান হতাহত : জাতিসংঘের সাম্প্রতিকতম (মে ২০২৬) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩,৫০০ এরও বেশি ইউক্রেনীয় শিশু নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছে (যা প্রায় ১৭৭টি ক্লাসরুমের মোট শিক্ষার্থীর সমান)। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ড্রোনের ব্যবহার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু হতাহতের সংখ্যা গত বছরগুলোর তুলনায় প্রায় ২৭% বেড়েছে।

​বিশাল বাস্তুচ্যুতি সংকট : ইউক্রেনের প্রতি ৩ জন শিশুর মধ্যে ১ জনই আজ বাস্তুচ্যুত (প্রায় ২৬ লাখ শিশু)। এর মধ্যে ১৭ লাখেরও বেশি শিশু নিজ দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে এবং প্রায় ৮ লাখ শিশু দেশের ভেতরেই এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

​হিমশীতল অন্ধকার ও ট্রমা : ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে উপর্যুপরি বিমান হামলার কারণে তীব্র শীতে (মাইনাস তাপমাত্রায়) শিশুরা বিদ্যুৎ, হিটার এবং পানিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। দিনের পর দিন সাইরেনের শব্দ আর মাটির নিচের বাঙ্কারে অন্ধকার কাটানোর ফলে ১-৪ ভাগ কিশোর-কিশোরী ভবিষ্যতের সব আশা হারিয়ে তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছে।

​অনলাইন আগ্রাসন ও সাইবার ঝুঁকি : সংঘাতের এক নতুন ও উদ্বেগজনক রূপ হিসেবে সাইবার জগতের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনলাইন প্রভাব খাটিয়ে শিশুদের সামরিক স্থাপনায় হামলা বা তথ্য সংগ্রহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তাদের জীবনকে আরও বেশি বিপন্ন করছে।

​৬. মায়ানমার

​২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মায়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং সম্প্রতি ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও ২০২৬-এর তীব্র সামরিক অভিযান দেশটির শিশুদের জীবন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মায়ানমার আজ বিশ্বের অন্যতম অবহেলিত শিশু সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।

​মানবিক সহায়তার তীব্র সংকট : মায়ানমারের মোট শিশুর এক-তৃতীয়াংশ—অর্থাৎ প্রায় ৬৯ লাখ (৬.৯ মিলিয়ন) শিশু বর্তমানে জরুরি মানবিক সহায়তার ওপর কোনোমতে টিকে আছে।

​আকাশপথের হামলা ও বোমাবর্ষণ : জান্তা সরকার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষের তীব্রতা ২০২৬ সালে এসে অনেক বেড়েছে। রাখাইন রাজ্য ও সাগাইং অঞ্চলে সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো সরাসরি জনাকীর্ণ স্থানীয় বাজার এবং শিশুদের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে হচ্ছে, যেখানে প্রতিনিয়ত নিষ্পাপ শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে।

​ল্যান্ডমাইনের করাল গ্রাস : মায়ানমার বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ল্যান্ডমাইন-আক্রান্ত দেশগুলোর একটি। খেলতে গিয়ে বা স্কুলে যাওয়ার পথে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও বোমার আঘাতে সবচেয়ে বেশি অঙ্গহানি ঘটছে শিশুদের (মোট হতাহতের ২৭% শিশু)।

​শিক্ষা ও মৌলিক অধিকারের বিলুপ্তি : মায়ানমারের প্রায় ৪৭ লাখ (৪.৭ মিলিয়ন) শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সামরিক ঘাঁটি বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় শিশুরা বাল্যবিয়ে, মানবপাচার, এবং জোরপূর্বক সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের (Child Soldiers) মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি শিশু এখন চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

লেখকের আরও লেখা-

বিলুপ্তির পথে পারিবারিক বন্ধন? বিলুপ্তির পথে পারিবারিক বন্ধন?

৭. ইয়েমেন

ইয়েমেন এর গৃহযুদ্ধ এবং চলমান সংকটকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘ (UNICEF, OCHA) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (Save the Children) সাম্প্রতিকতম ও নির্ভরযোগ্য কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।

​ হতাহত ও শারীরিক আঘাত (ল্যান্ডমাইন ট্রাজেডি)

​দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতির পরেও ইয়েমেনের শিশুদের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

​দৈনিক হতাহত : আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন শিশু ল্যান্ডমাইন, অবিস্ফোরিত বোমা অথবা সামরিক হামলায় নিহত বা পঙ্গু হচ্ছে।

​লুকানো মৃত্যুর ফাঁদ : বর্তমানে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফ্রন্টলাইনের চেয়েও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেলে যাওয়া ল্যান্ডমাইন এবং অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্র। সংঘাত-সম্পর্কিত শিশু হতাহতের প্রায় অর্ধেকই (৪৫%-এর বেশি) ঘটছে এই লুকানো বোমার বিস্ফোরণে, যখন শিশুরা মাঠে খেলছে বা লাকড়ি কুড়াতে যাচ্ছে।

​তীব্র অপুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়

​গোলাবারুদের গন্ধ ইয়েমেনের শিশুদের শুধু ফুসফুসকেই ক্ষতবিক্ষত করছে না, কেড়ে নিচ্ছে তাদের বেঁচে থাকার পুষ্টিও।

​তীব্র অপচয় (Severe Wasting) : ইয়েমেনে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ (৫,০০,০০০) শিশু তীব্রতম অপুষ্টি বা 'সিভিয়ার ওয়েস্টিং'-এ ভুগছে, যা চিকিৎসা না পেলে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ৫ বছরের কম বয়সী প্রতি ২৫ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু মারা যাচ্ছে।

​অপুষ্টির উচ্চ হার : ইয়েমেনের প্রায় ৪১% শিশু তাদের ওজনের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল এবং প্রায় অর্ধেক (৪৯%) শিশু অপুষ্টির কারণে দীর্ঘস্থায়ীভাবে খর্বকায় বা শারীরিকভাবে অবিকশিত (Stunted Growth) রয়ে যাচ্ছে।

​চিকিৎসার অভাব: দেশটির অর্ধেকের কাছাকাছি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কলেরা এবং হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের মহামারি।

আরও পড়ুন

মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি

​ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ও শৈশব

​যুদ্ধ ইয়েমেনের শিশুদের হাত থেকে বই-খাতা কেড়ে নিয়ে শ্রম বা অস্ত্রের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

​স্কুলছুট শিশু : ইয়েমেনে বর্তমানে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন (৪৫ লাখ) শিশু শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। হাজার হাজার স্কুল ভবন হয় বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়তো বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​শিশু সৈনিক ও শোষণ : চরম দারিদ্র্য এবং সুরক্ষার অভাবে হাজার হাজার নাবালক শিশুকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধে ঢাল হিসেবে বা তল্লাশি চৌকিতে ব্যবহার করছে।

মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা

​জাতিসংঘের হিসাব মতে, ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ মানবিক সহায়তার ওপর বেঁচে আছে, যার মধ্যে ১২.২ মিলিয়ন (১ কোটি ২২ লাখ) জনই শিশু। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ত্রাণ ছাড়া তাদের একদিনও বেঁচে থাকা অসম্ভব।

শেষকথা- ​যুদ্ধ কখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না, তা শুধু রেখে যায় লাশের স্তূপ আর একঝাঁক এতিম, পঙ্গু ও ট্রমাটাইজড শিশু। আগ্রাসনের শিকার এই শিশুদের বোবা কান্না কেবল তাদের চারপাশের দেয়ালগুলোতেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না, তা ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে। যদি আমরা সত্যিই একটি সুন্দর ও নিরাপদ আগামী গড়ে তুলতে চাই, তবে এখনই যুদ্ধবাজদের কামান থামাতে হবে। বন্ধ হোক গোলা বারুদের এই মরণখেলা, প্রতিটি শিশুর জন্য নিশ্চিত হোক একটি নিরাপদ আকাশ। কারণ, আজকের যে শিশুটি বারুদের গন্ধে শ্বাস নিতে পারছে না, তার কান্নার দায় কিন্তু এই পৃথিবীর প্রতিটি সভ্য মানুষের। ​৪ জুনের এই আন্তর্জাতিক দিবসে কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ কিংবা সেমিনারের গণ্ডিতে আটকে থাকলে চলবে না। আজ সময় এসেছে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক গণজোয়ার সৃষ্টি করার। প্রতিটি রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, বুলেটের চেয়ে একটি শিশুর হাসির দাম অনেক বেশি। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীকে আবার শিশুদের জন্য নিরাপদ, সবুজ এবং বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।কারণ, আজকের শৈশবকে যদি আমরা গোলাবারুদের গন্ধ থেকে মুক্ত করতে না পারি, তবে মানবজাতির ভবিষ্যৎটাই চিরতরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন-

তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)