সাবরিনা মমতাজ
চিত্রকল্প হচ্ছে 'শব্দের ছবি' আমাদের দৃষ্টির অন্তরালের সূক্ষ্ম কল্পনা, চিন্তা- চেতনা যা আমরা শব্দে প্রকাশ করতে চাই; তাই হচ্ছে চিত্রকল্প। চিত্রকল্প ছাড়া সকল শিল্পই অসম্পূর্ণ, আর কবিতা তো চিত্রকল্পের প্রাণ।
জগতবিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস তার স্ত্রীর কথার দ্বারা আঘাতে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হতেন। সক্রেটিসের এক শিষ্য এই দৃশ্য দেখে ব্যাথিত চিত্তে জিজ্ঞেস করেছিলে, এতো খোঁজা, এতো অপমানের পর আপনি কীভাবে এতো অসামান্য লেখা মাথা থেকে লেখায় প্রকাশ করেন? সক্রেটিস মৃদু হাসলেন এবং শান্তভাবেই বলেছিলেন তার এই কথার আঘাতের জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ তার এই আঘাতই আমাকে লেখক সক্রেটিস করে তুলেছে।
এখানে আমরা বুঝতে পারি তার স্ত্রীর আচরণে তিনি খুশি ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু সে কথার আঘাতের ওজন তার মনে একটা চিত্র সৃষ্টি করেছিলেন, আর সেই কল্পনাকেই তিনি রূপ দিয়েছিলেন লেখায়।
জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা "বনলতা সেন"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা। এখানে কবি মনের অসাধারণ কল্পনার রং সাধারণ চুলের রং মোহনীয় হয়ে ওঠেছে।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতার একটা কাল জয়ী লাইন, "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি"-লেখকের এই আত্মপোলব্ধি স্পর্শ করেছে অভাব ও সংস্কৃতির সেই রূপের রহস্য যেখানে দারিদ্র্যই নয় ক্ষুধা ও কবিতার সৌন্দর্যে চাঁদের রূপ ধরা পড়ে। এ যেন চিত্রকল্প ও কবিতার এক অনবদ্য সৃষ্টি। কবির কল্পনা আত্মা যে ক্ষতবিক্ষত করার যে অনুভূতি এখানে ওঠে এসেছে তা সত্যি বলতে বাধ্য হতে হয় কবিতা চিত্রকল্প ছাড়া অপূর্ণ।
এভাবেই কবি তার অন্তর দিয়ে প্রকৃতিকে অনুভব করে এবং মনের মধ্যে ধারণ করে তার চিত্র যা লেখার রং তুলিতে ফুটিয়ে তোলেন। আমার মনে কবিতায় চিত্রকল্পই প্রাণ ঢেলে কবিতাকে বাসযোগ্য করে তোলে এ ধরায় সবার চিত্তে।
কবিতা ও চিত্রকল্প একে অন্যের পরিপূরক। যেমন চোখ ছাড়া আলো আর আলো ছাড়া আঁখি।
লেখক: কবি ও গদ্যকার