Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বিংশ শতাব্দীর বিদগ্ধ সৈনিক এম আহমদ আলী সাহিত্যরত্ন

মো. জাহিদুর রহমান মো. জাহিদুর রহমান
প্রকাশ : বুধবার, ১৮ মার্চ,২০২৬, ০৫:০২ পিএম
আপডেট : বুধবার, ১৮ মার্চ,২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
বিংশ শতাব্দীর বিদগ্ধ সৈনিক এম আহমদ আলী সাহিত্যরত্ন

একজন মানুষ মধ্যাহ্নের সূর্যের মত প্রসন্ন প্রখর আলো দিয়ে আলোকিত করেছে ভৈরব ও কপোতাক্ষীর অদূরে প্লাবিত সমভূমির নিভৃত পল্লীর প্রত্যন্ত অঞ্চল, এক জীবন সায়াহ্নে কোনো প্রতিদান না নিয়ে চলে গেছেন। সেই শিক্ষানুরাগী কবি, সাহিত্যিক নাম মুনসুর উলমূলক আহমদ আলী, যেখানে নীল বিদ্রোহের নায়ক পীতাম্বর নীলম্বরের জন্ম, যেখানে স্বাধীনতার প্রথম লাল সূর্য ও লাল সবুজের পতাকা উড্ডয়ন হয়েছিল, সেই চৌগাছার এক সাদামাটা গ্রাম কয়ারপাড়ায়। পিতা মুন্সি কফিল উদ্দীন মাতা নবিছন নেছা।

তিনি জন্ম গ্রহণ করে ছিলেন এমন এক সময় যখন পূর্ব বাংলার অবহেলিত মানুষের জন্য বঙ্গভঙ্গ পূরনে কাঙ্খিত বঙ্গভঙ্গ অর্থাৎ আলাদা প্রদেশ গঠিত হয়। মুসলিম সমাজ এই সংকটময় মুহূর্তে অবহেলিত পূর্ব বঙ্গের মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য, নতুন প্রদেশ টিকিয়ে রাখার জন্য নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে, ধান বাড়ীর জমিদার নবাব আলী চৌধুরী ও পূর্ব বাংলার উদীয়মান নেতা আবুল কাসেম ফজলুল হক নতুন প্রদেশের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন এবং জনমত গড়ার চেষ্টা করেন। ঠিক তেমনি এক সময় অর্থাৎ ১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আহমদ আলীর মাত্র সাত বছর বয়সে পিতা মুন্সি কফিল উদ্দীন এ পৃথিবী ছেড়ে পরপারে চলে যান।

মাতা নবিছন নেছা দুই সন্তান আহমদ আলী ও আফছার আলীকে নিয়ে দুঃখের তিমিরে নিমজ্জিত হন। মনের জোরে ছেলেদের লেখাপড়া শেখানোর জন্যে কয়ারপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত খোশাল মুন্সির মক্তবে, বাংলা, উর্দু, ফার্সী ও আরবি শিক্ষার জন্যে ভর্তি করে দেন। মাত্র দুই বছর তিনি ছেলেদের পড়াশুনার খরচ যোগাড় করতে পারেন, পরবর্তীতে তিনি হাল ছেড়ে দেন, ছেলেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার জেনেও কিছু করার ছিল না তাঁর। মায়ের অসহায় অবস্থা, পিতৃহারা এই পুত্র তখন দিকভ্রান্ত ঠিক সেই সময় একজন আলোক বর্তিকা হয়ে দাঁড়ায় এম আহমদ আলীর চলার পথে তিনি হলেন ফুফু আম্মা নিঃসন্তান লাল বানু ওরফে পিরানী বুড়ী। ফুফু আম্মা নিঃসন্তান লালবানুর ব্যক্তিত্বের কথা মনে হলে মনে পড়ে ঐতিহাসিক এক মহীয়সী নারীর কথা, তিনি ছিলেন মাতা মহী আয়সন দৌলত বেগম, মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা বালাক বাবুর যখন পিতাকে হারিয়ে দিশেহারা তখন ওই মানুষটির অনুপ্রেরণা, সচেতনতা, ও দৃঢ়তা ও শক্তি সাহস পেয়েছিল। যদিও দুজনার কর্মক্ষেত্র ভিন্ন অবস্থান ভিন্ন, তবুও একটি জায়গায় ছিল দারুণ মিল, তা হলো- হতাশা ও অন্ধকারের প্রেরণা দাত্রী দুজনই মহীয়সী নারী।

ফুপু পিরানী বুড়ীর চেষ্টায় আবার মক্তবে ভর্তি হলেন এবং মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করলেন। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে যায়, বাড়ী হতে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত লক্ষণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে বিদ্যার্জনের জন্য পায়ে হেঁটে যেতেন যা আজ কল্পনা করা যায় না। ১৯২১ সালে কৃতিত্বের সাথে ৪র্থ শ্রেণী পাশ করেন, পরবর্তীতে যশোর জেলা স্কুল হতে জিটি পাশ করেন।

এ দিকে বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়, স্বদেশী আন্দোলনে রূপ নেয়, বাংলার মুসলিম সমাজ যদিও এই স্বদেশী আন্দোলন, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন, অবস্থার প্রেক্ষিতে বেশীর ভাগ মুসলিম সমর্থন করতে পারেনি তবুও মুসলিম নেতাদের মধ্যে সমর্থন করেছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল, খান বাহাদুর, মোহাম্মদ ইউছুফ, আব্দুল হালিম গজনবী, লিয়াকত হোসেন মোহাম্মদ ইসমাইল প্রমুখ। ইংরেজরা যখন স্বদেশী আন্দোলন দমন করবার জন্য স্কুল কলেজের ছাত্রদের সম্পৃক্ততা থাকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেন এবং যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত তাদের ইংরেজরা কোন সহযোগীতা দিবেন না।

এম আহমদ আলী বাল্য বয়সে ইংরেজ বিরোধী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হন। তাঁর মনে স্বদেশকে স্বদেশের মানুষ কে দৃঢ়তার সাথে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা জেগে উঠে। লর্ড হার্ডিঞ্জ এর সময় ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে মহামান্য সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী দিল্লীর দরবারে ১২ই ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন যা ১৯১২ সালে জানুয়ারী মাসে কার্যকরী হয়।

মুসলিম সমাজ বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় অবহেলিত মুসলমানদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করতে থাকে। তিনি তরুণ বয়স থেকে এই বিরাজমান সমস্যা উপলব্ধি করেন। অবহেলিত বাংলার জনমানুষের শিক্ষার আলো জ্বালাবার জন্য পদক্ষেপ নেন।

যাই হউক বাঙালী মুসলিম সমাজের কথা চিন্তা করে এম আহমদ আলী শিক্ষা জীবন শেষ করে। মক্তব, স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার কাজে হাত লাগান। তার পরিশ্রমে গড়ে ওঠে পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়। যা সাদীপুরের প্রভাবশালীদোর অসহযোগীতায় পুড়াহুদা গ্রামে সেই স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ওই গ্রামে মহৎ ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায়।

প্রতিটি এলাকায় নিরক্ষর বাঙালী সমাজের চিত্র উপলব্ধি করে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে ব্রত হন। চৌগাছা হতে দুই কিলোমিটার দূরে আন্ধারকোতায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে যেয়ে তাঁর অনেক দুঃখভোগ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কারণ জমিদার ও সমাজপতিরা এটাকে বাড়াবাড়ি বলে মনে করতো। তবু তিনি দমে যাননি, হতাশাগ্ৰস্থ মানুষের জন্য শিক্ষার আলো জ্বালার অভিপ্রায়ে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, শত বাঁধার পাহাড় অতিক্রম করে ৩৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চা এই সময় বাঙালী মুসলিম চিন্তা চেতনার প্রধান স্থান ছিল, সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত, ও দৈনিক আজাদ পত্রিকা, কলিকাতা হতে পরে প্রকাশিত হয়। আবুল মুনসুর আহমদ সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেহাদ (১৯৪৬-৪৮) সওগাত সাহিত্য মজলিস নামে একটি সাহিত্য সভা বসতো।

১৯৪২ সালে দুটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ঢাকা ও কলকাতায় ছিল একটির নাম “পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ” আর একটির নাম “রেনেসাঁ সোসাইটি” ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে দিয়ে জেগে উঠেছিল বাংলার লেখক বুদ্ধিজীবী সমাজ, ভারত কয়েক খন্ডে বিভক্ত হবে বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। এই সময় মুসলমানরা বাংলায় সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক চেতনায় জাগ্রত হয়। এই জাগ্রত চেতনার এক অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন পল্লীর কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজ সংস্কারক এম আহমদ আলী।

কলিকাতা থেকে প্রকাশিত “দৈনিক আজাদ” পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন তিনি, মাসিক পত্রিকা নকিব এর সম্পাদক ও মালিক ছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় আজকের দৈনিক পূর্বাঞ্চল ও দৈনিক জনবার্তার সম্পাদক ওয়াহেদ আলী আনসারীর যশোর গেজেট পত্রিকার দায়িত্ব এম আহমদ আলী কাঁধে তুলে নেন। আয়শা সরদার সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা শত দলের নিয়মিত লেখক ছিলেন, এম আহমদ আলী। তার প্রকাশিত গ্রন্থ পাক যশোরে কাব্য ভূগোল ও ছোটদের কায়েদে আজম “কাব্যে আমপারা” পবিত্র কুরআন এর কাব্য অনুবাদ।

এম আহমদ আলী পঞ্চাশ দশকে যশোর সাহিত্য সঙ্ঘ থেকে সাহিত্যরত্ন উপাধিতে ভূষিত হন। কর্মদক্ষ দুই হাজার কবিতার পাণ্ডুলিপি এখন অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। এম. আহমদ আলী এমন একজন সচেতন মানুষ ছিলেন। যার মধ্যে ধর্মের গোড়ামী ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ছিল না।

তাঁর লেখায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যেমন স্থান দিয়েছেন, তেমনি ভাবে জিয়াউর রহমানের স্থান করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন কোনো ব্যক্তি বৈষম্যের ঊর্ধ্বে। ১৯৯১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তিন পুত্র ও তিন কন্যা রেখে গেছেন। প্রথম পুত্র লিয়াকত আলী শিক্ষকতা করতেন। ২য় পুত্র ড. এম শওকত আলী আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, ৩য় পুত্র এম মুজাহিদ আলী সাংবাদিকতা ও সমাজসেবামূলক পেশার সাথে জড়িত।

আহমদ আলী বাঙালী সমাজের মাঝে বট বৃক্ষের ছায়ার মত অথবা মায়ের আঁচলের মত, যার স্নেহের ছায়াতলে সুশোভিত করেছিল এই নিরক্ষর জনপদ আর আমাদের সাহিত্যের আঙ্গিনা। এ যুগের শিক্ষক আহমদ আলী অন্ধকার সমাজে আলো জ্বালাবার জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে গেছেন। আর এখন, কি শিক্ষক, কি ডাক্তার, কি ইঞ্জিনিয়ার কি কর্মকর্তা কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা বেশীর ভাগ মানুষ অন্ধ-ভাবে স্বার্থের পিছনে ঘুরছে তাদের অসীম অর্থের ক্ষুধা বৈভব এর ক্ষুধা, বড় হওয়ার ক্ষুধা, নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অবৈধ সম্পদ গড়বার প্রাণান্ত চেষ্টা। এমন কোন আনাড়ীপনা নেই যা তারা করছে না। এরা সত্যই আজ বৈভবের ভিখারী। এদের আত্মার ঘর শূন্য।

আর আমাদের অহংকার এম আহমদ আলী কোন কিছুর বিনিময়ে নয়, দরিদ্রের কারাগারে বন্দি হয়ে শিক্ষার আলো জ্বালাবার জন্য কতনা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন, এই মানুষটি। জন্মেছিলেন পৃথিবীকে দেওয়ার জন্য নেবার জন্য নয়, তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আলোর পথে হাটার স্বপ্ন। তিনি শত বাঁধায় একা চলেছেন কোন দৈন্যতা তাকে ম্লান করতে পারেনি, তিনি জানতেন তার পথ চলা সহজ নয়, তবু যারা অগ্রপথিক তারা চলবে আলোর পথে আজীবন। আমাদের এই বিদগ্ধ কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক এম আহমদ আলী বাঙালী সমাজের কালজয়ী পুরুষ, আলোর দিশারী, আমাদের চলার পথের অনুপ্রেরণা। তিনি বিংশ শতাব্দীর এক অতন্দ্র প্রহরী কবিতা, সাহিত্যের এবং সমাজ সংস্কারের এক নির্ভীক সৈনিক।

লেখক: অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত) চৌগাছা সরকারী কলেজ, যশোর

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)