Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

❒ গল্প

তৌফিকুর রহমানের গল্প চক্রবূহ্য

গল্প গল্প
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ,২০২৬, ০৪:২১ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ,২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
তৌফিকুর রহমানের গল্প চক্রবূহ্য

মা অনেক অসুস্থ। ঘরের মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে আর “আল্লাহ আল্লাহ” বলে নিজের কষ্টের বোঝা প্রকাশ করছে। তখন বড় ছেলে এসে ধমক দিয়ে বলল-

“এত চিৎকার করছ কেন? কী হয়েছে তোমার? চুপ করো।”

ছেলের কথা শুনে সুফিয়ার মনে পড়ে গেল তার জীবনের অনেক পুরোনো কষ্টের স্মৃতি।

তখনকার সময়ে বিবাহের বিষয়ে পিতা-মাতা মেয়েদের ইচ্ছা খুব একটা জিজ্ঞেস করতেন না। সন্তানেরা ভাবতো, পিতামাতা যেহেতু দেখে-শুনে বিয়ে দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই ভালো হবে। পিতার সামনে নিজের মত প্রকাশ করার সাহসও অনেক সময় তারা পেত না। কিন্তু কিছুদিন পর অনেক সময় বাস্তবতা বোঝা যেত।

ঠিক এমনটাই হয়েছিল সুফিয়ার সাথে।

সুফিয়া ছিল তখনকার সময়ের এক সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই সে অনেক স্বাধীনভাবে বড় হয়েছে। বাড়িতে ইচ্ছামতো ঘোরাফেরা করত, মন ভরা আনন্দে দিন কাটতো। পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও বেশি পড়াশোনা করা হয়নি।

হঠাৎ একদিন শুনলো, তার বিয়ের জন্য কিছু লোক প্রস্তাব নিয়ে আসছে। লুকানো ভয় আর লজ্জায় সে বাইরে যেতেও পারছিল না। আনুষ্ঠানিকতা শেষে জানা গেল, ছেলে বাবু সুফিয়াকে পছন্দ করেছে এবং তাদের বিয়ে হবে। সেদিন ছিল বুধবার, আর শুক্রবার ঠিক হলো বিয়ের দিন।

ধুমধাম করে শুরু হলো বিয়ের আয়োজন। সুফিয়ার বাবা কোনো কিছুর কমতি রাখেননি। অতিথিদের আপ্যায়ন ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ছিল খুব ভালো। সব বরযাত্রী পেট ভরে খেয়েছিল।

তখন গ্রামে একটা প্রচলন ছিল—মেয়ের বাড়িতে বরযাত্রীদের ভালোভাবে খাওয়ানো না হলে পরে শ্বশুরবাড়ির লোকজন খাবার নিয়ে খোঁটা দিত। তাই সুফিয়ার বাবা সবকিছু খুব যত্ন করে আয়োজন করেছিলেন।

বিয়ে শেষ হলো। এবার বাবার বাড়ি থেকে বিদায়ের পালা। বুকভরা কষ্ট নিয়ে সুফিয়া বাবার ঘর ছেড়ে স্বামীর সাথে চলে গেল। বাবার হাত থেকে জামাই বাবুর হাতে মেয়ের হাত তুলে দিয়ে বাবা বললেন,

“আমার মেয়েকে সুখে রেখো বাবা।”

এরপর কেটে গেল কয়েক বছর।

একদিন সুফিয়া লক্ষ্য করলো, তার স্বামী বাবুর আচরণ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সে মাঝরাতে বাড়ি আসে, তারপর দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। ঘুম থেকে উঠে জোরে জোরে সুফিয়াকে ডাকতে থাকে খাবারের জন্য। খাবার খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বিকেলে উঠে বাজারে যায়, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় এবং মাদক সেবন করে।

এভাবেই চলতে থাকে দিনের পর দিন। কোনো কাজকর্ম নেই, কোনো ব্যবসাও নেই। তার খরচ চলতো বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে। যখন টাকা দরকার হতো, একটা জমি বিক্রি করে দিত এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত।

ধীরে ধীরে জমি-জমা শেষ হয়ে গেল। স্বর্ণ-রূপা, ঘরের আসবাব—সব বিক্রি হয়ে গেল। যখন আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না, তখন শুরু হলো সুফিয়ার ওপর নির্যাতন।

বাবু তাকে বলল, বাবার বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা আনতে। সুফিয়া রাজি না হওয়ায় বাবু তাকে মারধর করতো। সেই ভয়ে অনেক সময় সুফিয়া তার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতো।

শেষ পর্যন্ত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সুফিয়া বাবার বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করতে রাজি হলো। বাবু তো এতে খুব খুশি।

সুফিয়ার বাবা তখন আর বেঁচে নেই। তার সাত ভাই ও তিন বোনকে ডেকে জমি বিক্রির কথা জানানো হলো। অনেক আলোচনা শেষে ৯০-এর দশকে প্রায় এক লক্ষ টাকায় সেই জমি বিক্রি হলো।

এর কিছুদিন পর সুফিয়ার কোল জুড়ে এল প্রথম সন্তান—একটি ছেলে। সুফিয়া খুব খুশি হলো। সারাদিন আদর ও যত্নে ছেলেকে বড় করতে লাগল।

কিছুদিন পর তার একটি মেয়েও জন্ম নিল। এখন তার এক ছেলে ও এক মেয়ে—সুফিয়ার আনন্দ যেন পূর্ণ হলো।

কয়েক বছর পর আবার তার কোল জুড়ে এল আরেকটি ছেলে সন্তান। তিন সন্তানের মা হয়ে সুফিয়া আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।

কিন্তু বাবু সন্তানদের তেমন খোঁজ নিত না। প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সহযোগিতায় সুফিয়া তার তিন সন্তানকে বড় করে তোলে। গ্রামের মানুষের জন্য লেপ, কাঁথা, বালিশ সেলাই করা কিংবা ছোটখাটো কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চলতো।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। সন্তানরা বড় হয়ে যায়। বড় ছেলের বিয়ে দেয়, মেয়েরও বিয়ে হয়, ছোট ছেলেরও বিয়ে হয়।

এর মধ্যে বাবু কিছুটা ভালো হয়ে যায়। স্থানীয় বাজারের মোড়ে একটি চায়ের দোকান দেয়।

সুফিয়ার দিনগুলো তখন কিছুটা ভালোই কাটছিল। কিন্তু কে জানতো, সামনে আরও কষ্ট অপেক্ষা করছে।

একদিন হঠাৎ বাবু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে তার হাত-পা প্রায় অবশ হয়ে গেল।

ছেলেদের সংসারেও অভাব। তার উপর অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ। তখন প্রায় ৫০ বছর বয়সে সুফিয়াকে আবার কঠোর পরিশ্রম শুরু করতে হলো।

যে কাজই পেত, তাই করে স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতো। গ্রাম ও আত্মীয়দের কাছ থেকেও কিছু সাহায্য পেত। এভাবে তিন বছর কেটে গেল।

একদিন দূরে কাজে থাকা অবস্থায় সুফিয়া শুনলো—তার স্বামী বাবু আর বেঁচে নেই।

এই খবর শুনে সুফিয়ার আকাশ যেন ভেঙে পড়লো। দুনিয়াটা তার কাছে খুব কষ্টের মনে হলো। যতই খারাপ হোক, বাবু তো তার স্বামী ছিল। তাকে কি এত সহজে ভুলে থাকা যায়?

এরপর আবার জীবন চলতে লাগলো। তিন সন্তান ও তাদের পরিবার নিয়ে দিন কাটতে লাগলো।

একসময় যে সুফিয়া বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতো, মাছ ধরতো, গাছে উঠতো—আজ বয়সের কাছে হার মেনে গেছে। একা হাঁটতেও কষ্ট হয়। দাঁত পড়ে গেছে, মাথার চুল পেকে গেছে।

এখন বড় ছেলে ও ছোট ছেলের বাড়িতে ১৫ দিন করে থাকে।

কিন্তু খাবারে আর তেমন স্বাদ লাগে না। মাঝে মাঝে কিছু খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ছেলেদের কাছে বলতে গেলে তাদের মুখের ভাব দেখে আর বলতে ইচ্ছে করে না।

একদিন মাংস খেতে ইচ্ছে হয়েছিল। তখন ছেলের বউ বলল,

“বুড়ির আবার মাংস খাওয়ার শখ!”

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—বড় বউয়ের বাবা-মা বেড়াতে এলে তাদের জন্য ইলিশ মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি কত কিছুই না রান্না হয়। শুধু খাওয়ানোই নয়, টিফিন বাটিতে করে বাড়িতেও দিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন সুফিয়ার ভাতের পাতে শুধু মাংসের তেল আর এক টুকরো আলু দেওয়া হলো।

বড় ছেলের বউ বলল,

“তাড়াতাড়ি খাও, আমার অনেক কাজ।”

সুফিয়া ধীরে বলল,

“শুধু তেল আর আলু দিয়ে কি মাংস খাওয়া যায়?”

এ কথা শুনে বউ রেগে গিয়ে বলল,

“যা দিয়েছি তাই খাও।”

সুফিয়া চুপচাপ ভাত মুখে তুললো, কিন্তু তার গলা দিয়ে খাবার নামলো না।

কিছুদিন পর সুফিয়ার শরীরে জ্বর এল, সঙ্গে বমিও শুরু হলো। সে এত অসুস্থ হয়ে পড়লো যে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না। কিন্তু কেউ তার খোঁজ নেওয়ার মতো ছিল না।

বড় বউ টিভি দেখছে, ছোট বউ নিজের কাজে ব্যস্ত।

প্রতিবেশী রেশমা এসে জিজ্ঞেস করল,

“চাচীর কী হয়েছে?”

বড় বউ বলল,

“কিছু না, এমনিই।”

তখন সুফিয়ার মনে হলো, হয়তো আজরাঈল তার প্রাণ নিতে আসবে। তার আর বাঁচার কোনো ইচ্ছে নেই। তাই সে কাতর হয়ে শুধু বলছে—

“আল্লাহ… আল্লাহ…”

সুফিয়া আর কতদিন বাঁচবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)