সৈয়দ এমদাদুল হক
‘কবি’ জীবনানন্দ দাশের (১৮৯-১৯৫৪) যে অভিজ্ঞান দীর্ঘদিন মানুষের অনেকটা অজ্ঞান ছিল কিংবা বলা যায় এখনো আছে অনেকের কাছে− সেটি গল্পকার, ঔপন্যাসিক জীবনানন্দ দাশ। ‘সময়’ থেকে পালিয়ে নিজের ধোঁয়াসা জগতে বিচরণ করতেন জীবনানন্দ− এমনটি যারা ধারণা করতেন, তাঁর উপন্যাসগুলি পড়লে সে ধারণা অনেকটাই বদলে যাবে। ক্লেদান্ত-বিক্ষুব্ধ সমাজ, সংকটাপন্ন সময়, নৈরাশ্য, শূণ্যতায়পূর্ণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তাঁকে আলোড়িত, তাড়িত-ভাবিত করেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দুই মহাসমর, উপমহাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা প্রভৃতির ফলে সৃষ্ট মনোজাগতিক হতাশা, ক্লেদ, নিস্পৃহতা, অস্তিত্বহীনতা ঔপন্যাসিক জীবনানন্দকে দিয়েছিল নতুন জগতের সন্ধান। তাঁর সুতীর্থ (১৯৪৮), মাল্যবান (১৯৪৮), কিংবা জলপাই হাটি (১৯৪৮)-কে বলা যায় এই নব উপলব্ধ ভুবনের শিল্পসত্তা।
আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যের বহু লক্ষণের মধ্যে একটি লক্ষণ দেখতে পাই যে, একই শিল্পীর কর্মে একাধিক শিল্প মাধ্যমের সমাবেশ হয়ে থাকতে পারে। যিনি কবি তিনি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকারও। উপরন্তু আরো দেখা যায় যে, যিনি বাক্শিল্পী তিনি আবার সংগীতশিল্পী বা চিত্রশিল্পী। বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমে পরঙ্গমতার শ্রেষ্ট দৃষ্টান্ত অবশ্য রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু পারঙ্গমতা না হলেও অন্তত সাযুজ্য এবং সামর্থ্য অনেক শিল্পীতেই লক্ষ্যসাধ্য। জীবনানন্দের সমকালীন অথবা উত্তরকালীন অনেক বাঙালি লেখকই একইকালে কথাসাহিত্যিক ও কবি। বহুধা বিভক্ত আধুনিক চিত্তের জটিলতা এতই অচ্ছেদ্য এতই দুর্জ্ঞেয় যে মাত্র একটি শিল্প মাধ্যম।
জীবনানন্দ দাশ উপন্যাস লিখেছেন আটটি। জলপাইহাটি, মাল্যবান, কারুবাসনা (১৯৩৩), জীবনপ্রণালী (১৯৩৩), বাসমতীর উপাখ্যান (১৯৪৮), প্রেতিনীর রূপকথা (১৯৩৩), মৃণাল (১৯৩৩) ও বিরাজ (১৯৩০)। এছাড়া লিখেছেন লিখেছেন সুতীর্থ নামে আরেকটি উপন্যাস। তাঁর উপন্যাসগুলিতে রয়েছে স্বতন্ত্র আবহাওয়া। জয়তীর কথা ধার নিয়ে বলা যায়, “চিন্তা বদলে যাচ্ছে। আর তাই বদলে যাচ্ছে ভাষা। চিন্তা বদলে যাচ্ছে, যেহেতু বদলে যাচ্ছে সমাজ, জীবন যাপন।” রূপসী বাংলার ধ্যানে যে নির্জনতার কবি একদিন তন্ময় ছিলেন, তিনিই কলকাতার নাগরিক জীবনের সংসর্গে এসে সেই পরিবর্তনমান জীবনযাপনের তীব্র অভিজ্ঞতার অভিঘাতে আকুল হয়েছিলেন। সেই অভিঘাতের ফলে লেখা হয়েছে তাঁর তৃতীয় পর্যায়ের কবিতা− দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫), মন্বন্তর (১৯৪৩) ও দাঙ্গার (১৯৬৪) পটভূমিতে লেখা কবিতা। ‘সংক্ষুব্ধ বিবমিষা’-র দ্বারা প্রাণিত সেই সব কবিতায় আছে বীভৎস ক্লেদতাময় ছবি, বিশ্ব সংসারের প্রতি বিরূপ বিতৃষ্ণ। মসে হয়েছিল সভ্যতা সংসার; প্রমত্ত কালো গণিকার উল্লোল সঙ্গীতে মুখর। সেই বীভৎস্যতাবোধ থেকেই রচিত হয়েছে তাঁর সুতীর্থ আর মাল্যবান উপন্যাস দু’টি, এমনকি জলপাইহাটিও।
জলপাইহাটি এবং বাসমতীর উপাখ্যান উপন্যাসে আমরা অনুধাবন করি সময় প্রতিবেশ, বাস্তবের প্রভাব। আখ্যানের সময় পরিবেশের দিক থেকে এই উপন্যাস দু’টির সম্পর্ক নিবিড়। দেশ বিভাগ হচ্ছে; অখণ্ড বাংলাদেশের দুই স্বতন্ত্র স্বাধীন, সার্বভৌম, রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইংরেজ শাসনাবসানের বাস্তবতাকে অপ্রকাশিত এক নতুন মাত্রা দিচ্ছে; ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে; গ্রামের পরিবেশ তাঁর সম্ভাব্য রাষ্ট্রভূক্তির পরিবেশে পরিবর্তিত হচ্ছে, কয়েকটি পরিবারে অভ্যন্তরীণ সংগঠন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে− জলপাইহাটি ও বাসমতীর উপাখ্যান দু’টি উপন্যাসেই জীবনানন্দ তাঁর আখ্যান গড়ে তুলেছেন এই ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তি করে। তবওু মিল পুরোটাই নয় ভিন্নতাও আছে। বাসমতীর উপাখ্যান জীবনানন্দের বৃহত্তম উপন্যাস। এক মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত সমাজের আলেখ্য। উপন্যাসের শুরুতে যুবক সিদ্ধার্থের গ্রামের বাড়ির বর্ণনা, সেই সঙ্গে তার বাসকারীর বিবরণ, বুড়ো বিধাব পিসিমা সরোজিনী ঠাকরুণ, বাসমতীর মেয়ে ইস্কুলের প্রাক্তন রেক্টর, ছাতুকাকা, প্রবীণ সাদামাঠা বেকার মানুষ আর টিপি মজুমদার, পঞ্চাশ বছর বয়সী এই প্রবীণ মহিলা, স্কুলের শিক্ষিকা। এদের কারুরই নেই বিত্তসামর্থ্য। মফস্বল শহর. বাসমতীতে স্কুল আছে, কলেজ আছে, ব্রাহ্ম সমাজ আছে, রামকৃষ্ণও আছে। মফস্বল শহরের শান্ত স্তিমিত মন্থরগতি জীবনের আলেখ্য এই চার চরিত্রকে অবলম্বন করে লেখক চিত্রিত করেছেন। বোঝাযায়, এর কাহিনীবয়নে দ্রুততা থাকলেও কোনো ত্বরা নেই। কাহিনী অগ্রসর হয় ধীর গতিতে।
অভাব-অনটন, মহাযুদ্ধের ডামাডোলে সৃষ্ট সংকট উপন্যাসের পরতে পরতে চিহ্ন ছবি এঁকেছে। সিদ্ধার্থ সেই অনটনের মধ্যে বাস করা এক অসহায় যুবক। তার মনে চায় অনেক কিছু করতে, কিন্তু সে পারে না অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক দারিদ্র্যের কারণে। এর মধ্যেই আবার জাগ্রত হয় তার কবি-স্বভাবের। চৈত্র-বৈশাখ মাসের মাটির ফাটল দেখে তার মনে হয় “উঠোনের ফাটল অনেকটা মিহি-পৃথিবীর করকোষ্ঠী রেখার মতো যেন। কী যেন সব ভবিতব্যতা রুকিয়ে রয়েছে ঐ রেখাগুলোর ভেতরকাদের ভবিতব্য? মানুষের? পৃথিবীরই যেন।” (বাসমতীর উপাখ্যান)
উপন্যাসের অধিকাংশ চরিত্র নিসর্গ আক্রান্ত। গ্রামীণ নিসর্গের কাছে শহর কলকাতার মহিমা সেখানে ঠুনকো। মফস্বল শহরের সমাজের নানা ঘটনা− দৃশ্য চরিত্রের বিবরণ এখানে প্রাধান্য পায়নি। কলেজের নানা ঘটনা− পারস্পরিক ঈষাবিদ্বেষ, অধ্যক্ষের নানা কাজ, অধ্যাপকদের নানা মতামত− এগুলি উপন্যাসের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। কলেজের ভিতরকার রাজনীতির নানা ঘটনা উপন্যাস লেখকের স্বোপার্জিত অভিজ্ঞতা।
মাল্যবান জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এ উপন্যাসকে অন্যতম সফল উপন্যাসও বলা যায়। দাম্পত্য জীবনের নানাবিধ মনস্তাত্বিক জাটিলতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বিশ্ব জগতসংসারের নানা ক্লেদ, ঘৃণা, জীবন সম্পর্কে নিস্পৃহতা। মাল্যবান-উৎপলার দাম্পত্য জীবনের জুগুপসাময় বর্ণনার মধ্যেই যেন প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ব সংসার সম্বন্ধে জীবনানন্দের বিরূপ বিতৃষ্ণা।
জলপাইহাটি উপন্যাসের ঘটনাস্থল জলপাইহাটি গ্রাম ও কলকাতা শহর। দেশবিভাগের সমকালের রাষ্ট্র বিপ্লব ও কালোত্তর পটভূমি− এ উপন্যাসেও আছে। লেখকের বৃহত্তর উপন্যাস জলপাইহাটি। এই উপন্যাসে দুই প্রজন্মের কাহিনী ছড়িয়ে আছে। সমকালের কলকাতা শহরের ছাপ পড়েছে নানা চরিত্রের আলাপচারিতায়। যেমন: কলকাতায় ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার কথা উল্লেখ পাই দু’ বছর পরে সুলেখা, জুলেখা, হারীতের কথায়। নায়ক নিশীতের কলকাতা গমন, সেখানে চাকরির জন্য সংগ্রাম এবং চাকরি প্রাপ্তি জীবনানন্দ দাশের নিজের জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অধ্যাপক নিশীথ সেনের ছাত্রী সুলেখা। রাজনীতি করা মেয়ে। হারীত তাকে শুধায় কোন পথে যাবে− কংগ্রেস না কমিউনিষ্ট? হারীত সুলেখার আলাপচারিতায় রাজনীতিকে ছাপিয়ে ওঠে জীবনের গভীর অনুভব। যেমন: সুলেখা− “সময় আমাদের যতটা জানতে, বুঝতে দেয়, তার চেয়ে বেশি উপলব্ধি করে পাবার মত কিছু হবে না। জিরিয়ে নাও, তাকিয়ে দেখ, প্রকৃতিকে আস্বাদ করো, যেমন− কাশফুল, সবুজ মাঠ, সাদা বাতাস, রোদ, বোলতা, মৌমাছিগুলোকে, মানুষকেও যেমন ইতিহাসের তোড়ে মানুষ তলিয়ে যাচ্ছে ... ... ... তাকিয়ে দেখো।” হারীত সুলেখাকে বোঝাতে চায় এখন আমরা নেহাৎ স্বদেশবাসী হয়ে থাকতে পারি না, পৃথিবীর সাধারণ মানুষ সবাইকে হতে হবে।
বাসমতীর উপাখ্যান আর জলপাইহাটি উপন্যাসে লেখকের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা উপাদানরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। দিল্লির রামযশ কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, বড়িশা কলেজ, কলকাতা সিটি কলেজ, গাওড়া গার্লস কলেজ লেখকের কর্মক্ষেত্র ছিল। কোথাও খুব বেশি দিন স্থায়ী হননি। আসলে নগর-মহানগর বা মফস্বলের কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক− এই পরিচয়টুকু জীবনানন্দ দাশ নামক কবি ও গদ্য লেখকের পক্ষে খুব জরুরী নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরী তাঁর অনুভূতিলোক, তাঁর প্রকৃতি সংলগ্নতা, তাঁর কাব্য ভাবনা।
মাল্যবান জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এ উপন্যাসকে অন্যতম সফল উপন্যাসও বলা যায়। দাম্পত্য জীবনের নানাবিধ মনস্তাত্বিক জাটিলতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বিশ্ব জগতসংসারের নানা ক্লেদ, ঘৃণা, জীবন সম্পর্কে নিস্পৃহতা। মাল্যবান-উৎপলার দাম্পত্য জীবনের জুগুপসাময় বর্ণনার মধ্যেই যেন প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ব সংসার সম্বন্ধে জীবনানন্দের বিরূপ বিতৃষ্ণা।
মাল্যবান উপন্যাসের প্রেক্ষাপট কলকাতা শহর। প্রধান বিষয় মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালির দাম্পত্য জীবন বা দাম্পত্য সংকট। মাল্যবান আর উৎপলার দাম্পত্য জীবনের যে সব মৌলিক রেখা, সংঘর্ষের আভাস, রুচির ভিন্নতা, মানসিকতার দূরত্ব তার বর্ণনা ও বিশ্লেষণে কোনও অস্পষ্টতা নেই। এক মেয়ে আর স্ত্রী উৎপলাকে নিয়ে মাল্যবানের ছোট সংসার। অফিসের কেরাণি হিসেবে সে খুব বেশি আয় করে না। সংসার চলে যায়, এরই মাঝে অতিথি আসার সম্ভাবনায় বাড়তে থাকে সংসার জীবনের জটিলতা। গায়িকা এবং সংগীতের সমঝতার উৎপলার কাছে নিত্য নিয়মিত আসে নানা বন্ধু-বান্ধব, যাদের সঙ্গে মাল্যবানের ঘনিষ্ঠতা কখনো ছিল না, গড়েও ওঠেনি। অতিথিকে ঘরে যথাযোগ্য স্থান দিতে মাল্যবানকে নিজ বাসা ছেড়ে উঠতে হয় মেসে। দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক সম্পর্ক মাল্যবানের ছিল না। উৎপলার সঙ্গে পাশাপাশি থাকা তো দূরে থাক, একঘরে জায়গাও হতো না মাল্যবানের। শত কিছুর মাঝেও স্ত্রীর নিত্যনৈমিত্তিক আবদার তাকে মেটাতে হতো। কিংবা বলা যায় মেটাতে বাধ্য হতো। উপন্যাস লেখক বাস্তবনিষ্ঠ, ব্যক্তি চরিত্র চিত্রণে নিপুণ, বিশ্লেষণে দক্ষ, তা পাঠক বারেবারেই দেখতে পাবেন। শান্তিহীন স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথোন রচনায় লেখকের দক্ষতা সংশায়াতীত। দাম্পত্য জীবন যে কতটা সংবেদনশীলতা− বিযুক্ত, মমতাহীন হতে পারে তা লেখকের উপস্থাপনাগুণে এখানে প্রতিভাত।
উপন্যাসটির ভাষা এবং বর্ণনাবঙ্গি বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। কবি জীননানন্দের সঙ্গে ঔপন্যাসিক জীবনানন্দ দাশের বৈপরীত্য এখানে অনেক বেশি। উৎপলা বিরক্তি, ঝগড়ার সুরে আঞ্চলিক, অসংযত ভাষায় বারবার মাল্যবানকে অপমান করেছে। “খুব যে আস্তিন টেনে ভাতের থালা কিলিয়ে পাকাচ্ছিলে− দেখছিলেই তো ভাত-ডাল-তরকারি মাছের বাটি তখনো তৈরি হয়নি। ঘাড়ের রোঁ সাদাটে মেরে গেল, এখনও ন্যালা কুকুরের মত যে খুব গুঁই-গাই− খুব যে গুঁই-গাই।”
উপন্যাসের সমাপ্তিতে আমরা জীবনানন্দের একান্ত নিজস্ব জগতের সন্ধান পাই। শেষটি বেশ কাব্যিক। মাল্যবান স্বপ্ন দেখে, উৎপলা তার কাছে এসেছে। তার পাশে শুয়ে আছে; কিন্তু পরমুহূতেই তার চটকা ভেঙ্গে যায়, তার মনে হয় এই অনিঃশেষ শীতের রাত শেষ হয়ে গেল। মাল্যবানের দাম্পত্য সুখ কামনা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। উপন্যাসের শেষে এই বাস্তব ঘটনাকে লেখক তুলে নিয়ে গেছেন কবিতার স্তরে। একটি তীব্র চিত্ত ভেঙ্গে যাওয়া দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘোষিত হয় কাব্যময়তায়।
মাল্যবান কোনো প্রতিবাদ না করে বারবার স্ত্রীর নির্মম বাক্যবাণ সহ্য করেছে। কিন্তু তৎপরবর্র্তী তার মানসিক অবস্থার যে বর্ণনা পাই তাতে রয়েছে একরাশ কষ্ট, অপ্রাপ্তির আবেগ, নিজের অপদার্থতা, অকর্মন্যতার ছাপ।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, নর-নারীর সম্পর্ক, বিবাহ সম্পর্কের বাইরের সম্পর্ক নিয়ে দু’জনের তিক্ত বাক্যালাপ, তা পাঠককে স্তম্ভিত করে, লেখকের সামাজিক পর্যবেক্ষণ ও নিপুন উপস্থাপন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
উপন্যাসের সমাপ্তিতে আমরা জীবনানন্দের একান্ত নিজস্ব জগতের সন্ধান পাই। শেষটি বেশ কাব্যিক। মাল্যবান স্বপ্ন দেখে, উৎপলা তার কাছে এসেছে। তার পাশে শুয়ে আছে; কিন্তু পরমুহূতেই তার চটকা ভেঙ্গে যায়, তার মনে হয় এই অনিঃশেষ শীতের রাত শেষ হয়ে গেল। মাল্যবানের দাম্পত্য সুখ কামনা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। উপন্যাসের শেষে এই বাস্তব ঘটনাকে লেখক তুলে নিয়ে গেছেন কবিতার স্তরে। একটি তীব্র চিত্ত ভেঙ্গে যাওয়া দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘোষিত হয় কাব্যময়তায়।
আসলে মাল্যবান খাবার টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তা সে টেরও পায়নি। ঘুম ভাঙতে মাল্যবান দেখলো− সে একা, টেবিল ছেড়ে চলে গেছে স্ত্রী-কন্যা। মাল্যবানের জীবন থেকে চলে গেল সব স্বপ্ন, আনন্দ।
এই উপন্যাসের সংহত জীবনচক্র, সাংসারিক সংঘাতময় জীবনালেখ্য আঙ্কিত। চরিত্র চিত্রণে, সংলাপে, চরিত্রের মসস্তাত্বিক স্তরগুলির উন্মোচনে এই উপন্যাসকে শিল্পশক্তি আঙ্গিকে স্বতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছে, উপন্যাস পাঠককে তা সানন্দ বিস্ময়ে গ্রহণ করতে হয়। শব্দ প্রয়োগে, বাগি¦ধিতে, উপমা ও প্রতীকের ব্যবহারে, চেতন-অবচেতনের রূপায়নে মাল্যবান উপন্যাস সার্থক শিল্প।
মাল্যবান উপন্যাসের সমকালে বা সামান্য আগে-পরে রচিত উপন্যাস সুতীর্থ। কলকাতার নাগরিক জীবনের পরিবর্তনমান জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত উপন্যাস সুতীর্থ। এই উপন্যাসেও সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির চিত্র স্পষ্ট। সুতীর্থ লেখক, যদিও ইদানিং লেখেনা। যেভাবে এতদিন ‘যা লিখেছে সে তা আত্মরাতি, কুঁড়ে গরুর গল্প। উপন্যাটির পটভূমি জানা যায় সুতীর্থ’র প্রাক্তন সহপাঠী, বর্তমানে বৌরকার মধুমঙ্গলের মুখে,− “মন্বন্তর দাঙ্গাহাঙ্গামা দুটো যুদ্ধ কালো বাজার মিলিটারিরা সেঁটে চিবিয়ে খেয়ে গেছে সব; হাড়গোড় ছিবড়ে শুঁকতে আরশোলারা ঠ্যাং নাড়ছে, তাদের ঠ্যাং ফড়ফড় করছে। চান সেই ঠ্যাং? দিতে তবে পারি। সে ঠ্যাংতো আপনার নিজেরি। কার রক্তমাংস চাইছেন আপনি? কে দেবে আপনাকে? (সুতীর্থ)
মূল্যেবোধের ভয়ংকার বিপর্যয় ঘটে গেছে, যুদ্ধ-মন্বন্তর-দাঙ্গায় বিধ্বস্ত বাংলাদেশ, জীবনানন্দের পৃথিবীতে; তাই তিনি ভয়ংকর বিবমিষায় পীড়িত হয়েছিলেন। সুতীর্থভাবে ‘কেমন একটা অন্ধকার যুগে আছি আমরা।’ মূর্খ ও বেকুবদের সঙ্গে দিনরাত গা ঘেঁসাঘেঁসি করে জীবন যাপন করতে হয়। গলদঘর্ম ভিড়ে হন্তদন্ত সুতীর্থে’র বাস যাত্রার যে বর্ণনা পাই তার মধ্যেই মনুষ্যবিরোধী বিতৃজ্ঞাকে আমরা সাকার হয়ে উঠতে দেখি। কোনো সহযাত্রীর মুখে সদ্য বসন্তের দাগ, খোসা উড়ছে, কোনো লোকের মুখে দুগন্ধ, ‘ডানদিকের মানুষটার’ গরমির রোগ, কারো কারো পুরু ঠোঁট জুগুস্পা জাগায়।
আধুনিক সভ্যতার প্রতি জীবনানন্দের বিবমিষা প্রকাশ পায়− দাম্পত্য সম্পর্কের যৌন বিরূপতার মধ্য দিয়ে। ‘কারুবাসনা’র নায়কের সঙ্গে কল্যাণী’র তিন বছর বিয়ে হয়েছে, কিন্তু প্রেমিকের পুলোকবোধ সে একদিনও অনুভব করেনি। সুতীর্থ উপন্যাসের বিরুপা-জয়তীর দাম্পত্য জীবনের মধ্যে সেই বিরূপতা সংহতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জয়তীকে বিয়ে করেছিল অশিক্ষিত রুচিহীন হঠাৎ বড়লোক বিরূপার টাকার জোরে−“তোমারকে স্ত্রী হিসেবে পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল টাকার জোরে, আমার জোরে নয়। জয়তীও তাকে বিয়ে করেছিল লক্ষ লক্ষ টাতকার লোভে, আন্তরিক ঘৃণাকে অবদমিত করে।”
জীবনানন্দের নায়কেরা, বিশেষ করে যাদের নামে উপন্যাসের নামকরণ, তারা মুদ্রাকেন্দ্রিক বুর্জোয়া সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে তারা আত্মমগ্ন বিচ্ছিন্ন, একাকিত্ববোধে আছন্ন। পশ্চিমী সাহিত্যে দস্তয়েভস্কি থেকে এই ধরনের অনিকেত মানুষের মিছিল শুরু হয়েছিল। আধুনিক উপন্যাসের একটা লক্ষণই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই জাতীয় নায়ক চরিত্র। কারুবাসনা’র নায়কের আকাক্সক্ষা ও উদ্যমের অকুতোভয় স্বাভাবিকতা ও অমিততেজ সাংসারিকতা নেই। সুতীর্থ উপন্যাসের সুতীর্থকে বলা যায় শূণ্যতা আধা শূণ্যতায় মগ্ন অ্যান্টি-হিরো। আর মাল্যবান উপন্যাসের মাল্যবান বাস্তবতায় দিশেহারা, মগ্ন চৈতন্যের এক মৃতবৎ মানুষ।
জীবনান্দ দাশের উপন্যাস সংহত জীবনচক্র, সাংসারিক সংঘাতময় জীবনালেখ্য অঙ্কিত। চরিত্র চিত্রণে, সংলাপে, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলির উন্মোচনে যে শিল্পরীতি আঙ্গিক-স্বতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছে, উপন্যাস পাঠককে তা সানন্দ বিষ্ময়ে গ্রহণ করতে হয় শব্দ প্রয়োগে, বাগি¦ধিতে, উপমা ও প্রতীকের ব্যবহারে, চেতন-অবচেতনের রূপায়নে উপন্যাসগুলি ঋদ্ধ।
১. অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : জীবনানন্দ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৭
২. আসমা চৌধুরী : কবিতার বরিশাল, আগুনমুখা, বরিশাল, দ্বিতীয় প্রকাশ ২০১৩
৩. বেগম আকতার কামাল : কবির উপন্যাস, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০৭
৪. বেগম আকতার কামাল : জীবনানন্দ কথার গর্বে কবিতা, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৮
৫. Khan Sarwar Murshid : Contemporary Bengali Writing [Pre-Bangladesh Period], University Press Limited,
Dhaka, Second Revised Edition 1996
৬. M. H. ABRAMS : A GLOSSARY OF LITERARY TERMS, Holt, Rinehart and Winston, INC, Florida, U.
S. A, 5th Edition 1988
৭. JONE PECK AND
MARTIN COYLE : LITERARY TERMS AND CRITICISM, The Macmillan Press Ltd. London, Reprinted 1995
৮. JONE PECK : HOW TO STUDY A NOVEL, Macmillan Press Ltd. London, Second Edition 1995
৯. “জীবনানন্দ দাশের মাল্যবান” : আবুল খায়ের মো. আশরাফউদ্দিন, সাহিত্য পত্রিকা, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (সম্পাদিত), ছত্রিশ বর্ষ : তৃতীয় সংখ্যা॥ আষাঢ়
১৪০০, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
সৈয়দ এমদাদুল হক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ ,সিঙ্গিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজ