Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব: দ্বান্দ্বিকতা ও জীবনের আখ্যান

হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই,২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
আপডেট : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই,২০২৬, ০৮:২১ পিএম
মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব: দ্বান্দ্বিকতা ও জীবনের আখ্যান

ধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব মূলত সীমাহীন স্বপ্ন এবং বাস্তবতার কঠোর সংগ্রামের এক নীরব মেলবন্ধন। এরা ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবে, সম্মান বাঁচাতে কৃচ্ছ্রসাধন করে এবং প্রতিটি আয়ের পেছনে সুনির্দিষ্ট হিসাব রাখে। এই শ্রেণির জীবন মানেই নিজের শখ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া।

'আয়ের সীমানার মাপকাঠিতে বিচার করলে বেতনভুক্ত সকল রাজকর্মচারী, সীমিত ও স্থির আয়ের সকল পেশাদারকে এ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা চলে। এদের মধ্যে যেমন নিন্মবেতনভুক্ত কেরানিকে ধরা যায়, তেমনি ধরা যায় উচ্চ পর্যায়ের রাজপুরুষকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, রিপোর্টার থেকে সম্পাদক, বাণিজ্যিক কর্মচারী, উচ্চ আয়ের কৃষক থেকে মধ্য পর্যায়ের বণিক সবাই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। মোদ্দাকথা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আপনি শিক্ষিত শ্রেণির সমর্থক বলতে পারবেন।

এই শ্রেণির সদস্যদের এক প্রধান আশা, কামনা আর প্রচেষ্টা হচ্ছে উত্তরপুরুষ কে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠাবান মানুষ হিসাবে সন্নিবেশিত করা।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির মূল্যবোধ বিচিত্র, দ্বান্দ্বিক, ও কণ্টকিত- মধ্যবিত্ত একদিকে যেমন স্পর্শকাতর ও আত্মাভিমানী- অন্যদিকে তেমন ক্রুর সুযোগসন্ধানী, প্রধানত: ভীড় ও নিরাপত্তা লোভী অথচ সময়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্হা ও শক্তির বিরুদ্ধে দারুণ বিদ্রোহ স্বোচ্চার।'
(মিজানুর রহমান শেলী, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সেপ্টেম্বর সংখ্যা, ১৯৭৭ খ্রি.) 

মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

সামাজিক মর্যাদা ও ভান: মধ্যবিত্ত নিজের অভাব গোপন রাখতে পছন্দ করে। যা পাওয়া যায় না, তার প্রতি এক ধরণের কৃত্রিম উদাসীনতা দেখিয়ে তারা নিজেদের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করে।

হিসাবি জীবন: তাদের জীবন চলে সীমিত আয়ের বৃত্তে । অতিরিক্ত খরচের ক্ষেত্রে তারা প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগে এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকে।

আত্মত্যাগের গল্প: পরিবারের জন্য নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া তাদের জীবনের এক অলিখিত নিয়ম। মা-বাবার চিকিৎসা, পিতার ঋন, ভাই-বোনের পড়াশোনা, কখনো কখনো ভাই বোনের বিয়ে-শাদি ও তাদের স্বাবলম্বী করতে ইত্যাদিতে তারা নিজের প্রয়োজনকে দ্বিতীয় স্থানে রাখে।

সৃজনশীলতা ও সহানুভূতি: অর্থনৈতিক টানাটানি ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার কারণে এরা অন্যের দুঃখ গভীরভাবে বুঝতে পারে। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে এবং সুকুমার বৃত্তির চর্চায় এগিয়ে থাকে।

দ্বিচারিতা: নিজের সামর্থ্য ও উচ্চাশার মধ্যে ফারাক থাকায় এদের মধ্যে এক ধরণের মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে। তারা চাকরি পাওয়ার পর শুরু হয় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আরেক সংগ্রাম।

লেখকের আরও লেখা-

বাংলাদেশ ও মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন: যে কথা বলার আছে বাংলাদেশ ও মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন: যে কথা বলার আছে

সাহিত্যে মধ্যবিত্ত

ইংরেজি সাহিত্যে ডেনিয়েল ডিফোর মতো লেখকদের হাত ধরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিচয় ঘটেছে। বাংলা সাহিত্যে কাল্পনিক চরিত্রের চেয়ে মধ্যবিত্তের বাস্তবিক চরিত্র অনেক ক্ষেত্রে বেশি ফুটে উঠেছে। নৈতিকতা, শিক্ষা ও সামাজিক সম্মান রক্ষার গল্পে বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশাল জায়গা দখল করে আছে। বাংলা সাহিত্যের অনেক সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক তাদের লেখনীতে মধ্যবিত্তের সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন ও টিকে থাকার লড়াই তুলে এনেছেন।

দার্শনিক দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত

সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী চিন্তাশীল গোষ্ঠী হিসাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিহ্নিত করা হয়। এক্ষেত্রে দার্শনিকগণ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন।  

এরিস্টটল মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে 'স্বর্ণালি মধ্যম' ( Golden Mean) বলেছেন। কারণ এ শ্রেণির বিবেচনা বোধ ও যুক্তি সমাজের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কল্যাণকর। মূলত এ শ্রেণি সমাজকে স্থিতিশীল রাখে, বিপ্লব ঠেকিয়ে রাখে। কার্ল মার্ক্স এ শ্রেণিকে পেটি বুর্জোয়া হিসেবে দেখিয়েছেন। আ্যডাম স্মিথ এ শ্রেণীর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেদের এগিয়ে যাওয়া তথা উন্নত করার প্রবল ইচ্ছাকে দেখিয়েছেন,সাথে প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা যুক্ত হয় যা সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নিশ্চয়তা প্রদান করে।
আধুনিক যুগে এ শ্রেণি সবচেয়ে মানুষিক চাপে ভোগে। এটিকে 'পছন্দের প্যারাডক্স' বলা যায়। হাতে সীমিত সম্পদ থাকার কারণে সঠিক পথ বেছে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন।

মোদ্দাকথা 

মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারলে ও সামাজিক অবস্থান বুঝতে পারলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, মধ্যবিত্ত—একটি শ্রেণি নয়, একটি জীবনচক্র। এরা সমাজের সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখে, সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নেয়, কিন্তু সবচেয়ে কম সুবিধা পায়। তাদের জীবনের শুরু হয় সীমিত স্বপ্ন আর সীমাহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, আর শেষ হয় ত্যাগ, লড়াই আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। শিশুকালে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা দেখে বাবা-মায়ের প্রতিদিনের পরিশ্রম। নতুন জামা না পাওয়া, দামি খেলনা থেকে বঞ্চিত থাকা, স্কুলে ফরম ফিলআপের সময় চিন্তিত মুখ—সবকিছুতেই কষ্টের ছাপ।

লেখক: কৃষিবিদ ও বিশ্লেষক। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)