ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
১৯২১ সালের ১ জুলাই পূর্ব বাংলার অবহেলিত জনপদে যে জ্ঞানালোকের মশাল প্রজ্বলিত হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষ পেরিয়েও কোটি বাঙালির হৃদয়ে দেদীপ্যমান। বাঙালির ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারের লড়াই, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল বাঁক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১ জুলাইয়ের এই শুভ ক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে তাকাই, তখন কেবলই ভেসে ওঠে ত্যাগের আর অর্জনের ইতিহাস। কিন্তু সময় সদা পরিবর্তনশীল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই ক্ষিপ্র গতিশীল যুগে দাঁড়িয়ে আজ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আজকের নতুন প্রজন্মের চোখে আমাদের এই প্রিয় বিদ্যাপীঠের রূপটি কেমন হওয়া উচিত? ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানিয়েও একবিংশ শতাব্দীর তরুণরা এখন ঢাবিকে দেখতে চায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো এক আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে।
ইতিহাসের বাতিঘর ও রূপান্তরের গল্প
অনগ্রসর পূর্ব বাংলার মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। কার্জন হলের লাল ইটের দেয়াল থেকে শুরু করে কলাভবন, মধুর ক্যান্টিন কিংবা টিএসসি—প্রতিটি কোণ যেন একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এটি হয়ে উঠেছিল এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকার বুকে জন্ম নেওয়া এই বিদ্যাপীঠ কেবল ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেনি, তৈরি করেছে অকুতোভয় নেতৃত্ব, যারা বিশ্ব মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম দিয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এই প্রাঙ্গণেই গড়ে উঠেছেন।
বর্তমানের চ্যালেঞ্জ ও আমাদের অবস্থান
ঐতিহাসিক গৌরব আমাদের অহংকার, তবে বর্তমান যুগের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বমানের গবেষণাগার, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।
"একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্থকতা কেবল তার গৌরবময় অতীতে নয়, বরং বর্তমানের মানসম্মত গবেষণা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্য মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।"
আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি গুণগত শিক্ষার প্রসারে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সেশনজট নিরসন, আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি।
নতুন প্রজন্ম যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চায়
আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেবল অতীতের গৌরবগাথা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ নয়; বরং এটি হওয়া উচিত এমন এক আধুনিক বিদ্যাপীঠ, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তুলবে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং বদলে যাওয়া কর্মসংস্থানের বাজারের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তরুণদের প্রত্যাশায় বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তরুণদের প্রধান প্রত্যাশাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো -
১. বিশ্বমানের আধুনিক শিক্ষাক্রম ও বৈশ্বিক র্যাংকিং
নতুন প্রজন্ম চায় না ঢাবির পড়াশোনা শুধু মুখস্থবিদ্যা কিংবা সনাতন গাইড বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। তাদের প্রত্যাশা হলো -
সিলেবাসের আধুনিকায়ন : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, ব্লকচেইন কিংবা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমসাময়িক বিষয়গুলোকে প্রতিটি বিভাগে প্রাসঙ্গিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
র্যাংকিংয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান : বিশ্বমানের গবেষণা, সাইটেশন (অন্যান্য গবেষণায় ঢাবির গবেষণার ব্যবহার) এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা।
আরও পড়ুন-
যশোরে টিএসসির স্বাদ নিতে ঢাবিয়ানদের মিলনমেলা
২. গবেষণা ও উদ্ভাবন-বান্ধব পরিবেশ
তরুণরা ঢাবিকে দেখতে চায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মূল কেন্দ্র হিসেবে।
বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা : গবেষণায় রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ানো। ল্যাবরেটরিগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সমৃদ্ধ করা।
স্টার্টআপ কালচার : শিক্ষার্থীদের নতুন কোনো আইডিয়া বা উদ্ভাবন থাকলে সেটিকে ব্যবসায়িক রূপ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ইনকিউবেশন সেন্টার' বা 'স্টার্টআপ ফান্ড' চালু করা।
৩. 'ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া' মেলবন্ধন
পড়াশোনা শেষ করে বেকার বসে থাকার দিন এখন আর তরুণরা দেখতে চায় না। তাদের বড় দাবি—শিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের সরাসরি সংযোগ।
ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা : প্রতিটি বিভাগে থিওরিটিক্যাল পড়াশোনার পাশাপাশি কর্পোরেট সেক্টর, ল্যাব বা এনজিওতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা (ইন্টার্নশিপ) অর্জনের সুযোগ থাকা।
ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং : নিয়মিত জব ফেয়ার বা চাকরি মেলার আয়োজন এবং পেশাদারদের মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা।
৪. আবাসন ও নাগরিক সুবিধার আধুনিকায়ন
ক্যাম্পাসের জীবন যেন কষ্টকর না হয়ে আনন্দময় ও পড়াশোনার অনুকূল হয়, সেটি নতুন প্রজন্মের একটি অন্যতম প্রধান দাবি।
গণরুম সংস্কৃতির অবসান : প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম বর্ষ থেকেই বৈধ, সিট-নিশ্চিত এবং মানবিক আবাসন ব্যবস্থা করা।
ডিজিটাল লাইব্রেরি ও হাই-স্পিড ইন্টারনেট : পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ওয়াই-ফাই সুবিধা এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা, যেন বিশ্বের যেকোনো জার্নাল শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পড়তে পারে।
৫. মুক্তবুদ্ধি ও দলীয় রাজনীতিমুক্ত অ্যাকাডেমিক পরিবেশ
মুক্তবুদ্ধির চর্চা : ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও পরমতসহষ্ণুতার সংস্কৃতি বজায় রাখা, যা মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটায়। নতুন প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ নয়, তবে তারা লেজুড়বৃত্তিক ও সহিংস রাজনীতির ঘোর বিরোধী।
নিয়মিত ডাকসু (DUCSU) নির্বাচন : নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারার নেতৃত্ব তৈরি করা।
নিরাপদ ক্যাম্পাস : সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক নিপীড়ন (যেমন র্যাগিং) মুক্ত এবং সেশনজটহীন একটি নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাবর্ষ নিশ্চিত করা।
উপসংহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে কেবল অতীতের গৌরবগাথা গেয়ে বর্তমানের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। নতুন প্রজন্মের তরুণরা চায় এমন এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—যার শিকড় থাকবে এ দেশের ইতিহাসের গভীরে, কিন্তু ডালপালা বিস্তৃত থাকবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও গবেষণার উন্মুক্ত আকাশে। সেশনজটমুক্ত শিক্ষাবর্ষ, মানবিক আবাসন, গবেষণামুখী পরিবেশ এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক—অতীতের গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রেখে এই বিদ্যাপীঠকে আমরা গড়ে তুলবো আগামী দিনের বিশ্বনাগরিক তৈরির শ্রেষ্ঠ চারণভূমি হিসেবে। শতবর্ষের আলোয় অনন্যা হয়ে, তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এগিয়ে যাক আমাদের প্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা। ঢাবি’র সাবেকশিক্ষার্থী