Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বাংলাদেশ ও মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন: যে কথা বলার আছে

হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন
প্রকাশ : সোমবার, ২২ জুন,২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২২ জুন,২০২৬, ১০:৩২ পিএম
বাংলাদেশ ও মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন: যে কথা বলার আছে

কটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তশ্রেণি হলো তার মূল মেরুদণ্ড ও প্রধান চালিকাশক্তি। সামাজিক রূপান্তর, রাজনৈতিক সংস্কার, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম কারিগর এই মধ্যবিত্তশ্রেণি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তথা সভ্যতার মূল ধারক ও বাহক হিসেবে এই শ্রেণিটি কাজ করে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন আমাদের সামনে চলে আসে:

১. রাজনীতি কি আসলেই আজ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? ২. অতীতে আমরা রাষ্ট্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে প্রতিবাদমুখর ও গণমুখী ভূমিকা দেখেছি, তা কি আজ বিলুপ্তির পথে? ৩. রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে ও আন্দোলনে মধ্যবিত্ত কোথায় থাকে, আর কী করে?

আসুন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে মধ্যবিত্তের প্রকৃত অবস্থা এবং তাদের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি।

  •  রাষ্ট্র ও সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও অস্তিত্বের সংগ্রাম

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং উদীয়মান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়েই এই শ্রেণিটি গঠিত।

  •  বাজার সচল রাখা: মধ্যবিত্তের নিয়মিত উপার্জন এবং সুপরিকল্পিত ব্যয়প্রবণতা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা রাখে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং ভোগপ্রবণতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে দেশের বহু উৎপাদনশীল ও সেবামূলক খাত।
  •  টিকে থাকার অবিরত সংগ্রাম: বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের মধ্যবিত্তকে ক্রমাগত কেবল টিকে থাকার সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে। আমিসহ দেশের সাধারণ নাগরিকগণ যদি তাদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও উপার্জন নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে রাষ্ট্র কখনোই তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না।

বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবক্ষয় রোধ

একটি সমাজ কতটা প্রগতিশীল, মানবিক ও আধুনিক হবে, তা নির্ভর করে তার মধ্যবিত্তের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও নৈতিক দৃঢ়তার ওপর।

  • মূল্যবোধের রক্ষাকবচ: মধ্যবিত্তের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন মানবিকতাবোধ সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় প্রতিহত করতে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
  • সমাজ বিনির্মাণ ও সংস্কৃতি: সমাজের প্রতিটি ছোট-বড় সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করা, আমাদের দৈনন্দিন আচার-ব্যবহার, লোকজ ও প্রগতিশীল কৃষ্টি-কালচার, সৃষ্টিশীলতা এবং চারিত্রিক উদারতা বজায় রাখতে এই শ্রেণিটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তারা কেবল অপরাধ প্রবৃত্তিকে নিবৃত্ত করতেই ভূমিকা রাখে না, বরং নাগরিক অধিকারের জন্য লড়াই করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকে।

 ঐতিহাসিক অবদান ও শাসক শ্রেণির প্রতারণার ইতিহাস

বাংলাদেশের জন্ম এবং সংকটের প্রতিটি বাঁকে মধ্যবিত্তের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

  •  মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরাই স্বাধীনতার মূল চেতনা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এক সাগর রক্ত পেরিয়ে অর্জিত হয়েছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
  • প্রতারিত হওয়ার বেদনা ও ক্ষোভ: অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর শাসক শ্রেণির দ্বারা বারবার প্রতারিত হতে হয়েছে এই বিকাশমান বাঙালি মধ্যবিত্তকে। যার ফলে এই শ্রেণির একটি বড় অংশ দ্রুত বিকশিত হতে পারেনি। তাদের মনে জমেছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা।
  • শ্রেণিগত বৈষম্যের বিস্তার: এক শ্রেণির সাথে আরেক শ্রেণির জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ফারাক এবং স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য গুণগত পরিবর্তন না হওয়ার কারণ আমাদের সবারই জানা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে 'বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার' মতো সাহসী লোক আজ বড়ই দুর্লভ।
  •  চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব: অতি সম্প্রতি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান—যাকে আমরা 'চব্বিশের বর্ষা বিপ্লব' বলে অভিহিত করি—সেখানেও এই মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকরা রাজপথে এসে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্রে নতুন করে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইয়ে দিতে এই শ্রেণির আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয়।

 বর্তমান সংকট: শ্রেণি-সংযোগের অভাব ও উচ্চবিত্তের মনরঞ্জন

ঐতিহাসিকভাবে গৌরবময় ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান (২০২৬) সময়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তশ্রেণি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। এই শ্রেণির ভেতরে একটি বড় অংশ বর্তমানে ঐতিহ্যগত ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকলেও, আরেকটি অংশ দৃশ্যত ভিন্ন আচরণ করছে।

  • উচ্চবিত্তের তোষামোদ বনাম নিম্নবিত্তের সাথে দূরত্ব: গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ কেবল উচ্চবিত্তের মনরঞ্জন বা তাদের তোষামোদে ব্যস্ত থেকেছে। ফলস্বরূপ, সমাজের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি—নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের যে গভীর ও কার্যকরী সংযোগ থাকার কথা ছিল, তা তারা স্থাপন করতে পারেনি।
  • জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়: লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মধ্যবিত্ত আজ তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। জীবনধারণের দৈনন্দিন সংগ্রাম তাদের এত বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

উপসংহার - রাষ্ট্রের টেকসই সংস্কার ও প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে মধ্যবিত্তের ভূমিকাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। মধ্যবিত্তকে আজ শাসক শ্রেণির 'সম্মতি উৎপাদন' (Manufacturing Consent)-এর নিষ্ক্রিয় হাতিয়ার হওয়া বন্ধ করতে হবে।

যেদিন মধ্যবিত্ত কেবল শাসকের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম না হয়ে নিজেই রাষ্ট্রের প্রকৃত নীতি-নির্ধারক হয়ে উঠবে, সেদিনই একটি বৈষম্যহীন, ঐক্যবদ্ধ ও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গঠিত হবে। মানুষ তার মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। কারণ, সেদিন মানুষ দেখবে—যিনি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত উদ্যোক্তা, তিনিই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক; যিনি পরিবহন খাতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত, তিনিই পরিবহন নীতি নির্ধারণ করছেন বা পরিবহন মন্ত্রী হচ্ছেন; যিনি কৃষির প্রকৃত সংকট ও মাটির গন্ধ বোঝেন, তিনিই হচ্ছেন কৃষি মন্ত্রী।

দিনশেষে ক্ষমতার মূল ধারায় ও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে মধ্যবিত্তের সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্বের আগমন ঘটুক। জয় হোক মধ্যবিত্ত শ্রেণির, এগিয়ে যাক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

 

লেখক: কৃষিবিদ ও ব্যাংকার

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)