ড. মো, মেসবাহ উদ্দীন
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল দুটি প্রতিবেশী ভূখণ্ডের সম্পর্ক নয়, বরং এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অভিন্ন নদীর স্রোতে গাঁথা এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার পরিবর্তন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আরোহণ এই অঞ্চলে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের সীমানা, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদল কেবল একটি রাজ্যের শাসন পরিবর্তন নয়, বরং দিল্লির 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের তত্ত্বে ঢাকার জন্য এটি যেমন প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগের ক্ষেত্র।
ঐতিহাসিকভাবে, পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় দিল্লির সাথে ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে কলকাতার অনড় অবস্থান দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে ছিল। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় স্থানেই বিজেপির একক আধিপত্য এই জট খোলার একটি অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে বিজেপির আদর্শিক রাজনীতি, এনআরসি (NRC) এবং অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জনমত ও সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন চাপের সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে দুই বাংলার চিরাচরিত রাজনৈতিক আখ্যানের বিপরীতে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্বে কী ধরণের ঢেউ তুলছে—তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ভারতের পূর্বমুখী নীতি (Act East Policy) এবং বাংলাদেশের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির মধ্যকার এই নতুন দ্বৈরথ বা সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের দক্ষিণ এশীয় স্থিতিশীলতা।
১. রাজনৈতিক পালাবদলের ঢেউ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কেবল কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংস্-এর ক্ষমতার সমীকরণ বদলায়নি, বরং এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে পদ্মাপাড়ের রাজনীতিতেও। দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই জয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে বাধ্য। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর দুই বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।
২. অস্থিরতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা
২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকে রাজ্যজুড়ে এক ধরণের অস্থিরতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের এই সন্ধিক্ষণে বিভিন্ন জেলা থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বহু জায়গায় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং উচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। এই ধরণের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কেবল পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ আইনশিল্ললার অবনতি ঘটাচ্ছে না, বরং এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও এসে লাগছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ঘরবাড়ি দখলের খবরগুলো বাংলাদেশে এক ধরণের তীব্র উৎকঠার সৃষ্টি করেছে। এই নৈরাজ্য যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
৩. বাংলাদেশের সরকারি প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গের এই পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অত্যন্ত সতর্ক এবং ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের পর থেকেই তিনি 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতিতে অবিচল। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিস্তা চুক্তির জট খোলার জন্য বাংলাদেশ আলোচনার টেবিলে প্রস্তুত থাকলেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। ড. খলিলুর রহমান বারবার একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন—তা হলো বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। তিনি তিস্তা ইস্যুটিকেও একটি "অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তা"র বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে সম্মান জানিয়েছেন।
৪. তিস্তা চুক্তি ও 'ডাবল ইঞ্জিন' তত্ত্ব
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির জয় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি ঝুলে আছে মূলত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনড় অবস্থানের কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও এই চুক্তি সই করতে পারেনি। এখন ভারতের কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গ—উভয় স্থানেই বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের তত্ত্বে তিস্তা চুক্তির জট খোলার একটি প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কলকাতার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, বিজেপি এখন আর রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে রেষারেষির অজুহাত দিতে পারবে না। দিল্লির সদিচ্ছা থাকলে এখন এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান সম্ভব. ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশিস বিশ্বাস মনে করেন, বিজেপির এই বিজয় দিল্লির জন্য এক ধরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে যেন তারা প্রতিবেশীর সাথে ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করে।
৫. বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই জয়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই পরিবর্তনকে 'গণতান্ত্রিক বিবর্তন' হিসেবে দেখলেও সীমান্ত নীতি নিয়ে তাদের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে যদি সীমান্ত দিয়ে পুশ-ব্যাকের চেষ্টা করা হয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের এই জয়কে 'হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আস্ফালন' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নৈরাজ্য প্রমাণ করে যে উগ্র জাতীয়তাবাদ কখনও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তারা বাংলাদেশের সরকারকে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
৬. আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক সংকট
বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গৌতম দাসের মতে, পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তনকে কেবল হিন্দু-মুসলিম সমীকরণে দেখা ভুল হবে। তিনি মনে করেন, "বিজেপির এই জয় আসলে দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল, যা বাংলাদেশের পানি রাজনীতি ও ট্রানজিট নীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।" অন্যদিকে, তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার এই পরিস্থিতিকে আরও গভীর সাংস্কৃতিক সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, "পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পতন এবং বিজেপির উত্থান আসলে দুই বাংলার চিরাচরিত বাঙালি সংস্কৃতির পরাজয় এবং উত্তর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিজয়। এর ফলে বাংলাদেশেও ইসলামি জাতীয়তাবাদ এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের মধ্যে একটি নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।"
৭. অনুপ্রবেশ ইস্যু ও এনআরসি-সিএএ
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে 'অনুপ্রবেশ' ইস্যু ও সীমান্ত রাজনীতি। বিজেপির প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) বাস্তবায়ন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর যদি কড়াকড়িভাবে এই এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু হয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে 'পুশ-ইন' বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদলের পর যদি সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। ঢাকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাসুদা ভাত্তি মনে করেন, বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে হিন্দুত্ববাদী ইশতেহার রক্ষা করা এবং বাংলাদেশের সাথে মৈত্রী বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
৮. সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও সাম্প্রদায়িক ঝুঁকি
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির উত্থান বাংলাদেশে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও ফেলছে। পশ্চিমবঙ্গের 'ধর্মনিরপেক্ষ' বা 'আঞ্চলিক' রাজনীতির পরাজয় এবং 'হিন্দুত্ববাদী' রাজনীতির জয়কে এদেশের ধর্মীয় ও দক্ষিণপন্থী দলগুলো নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে যে ধরণের রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা জাতিগত দাঙ্গার দিক থেকে ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের জন্যই একটি অশনি সংকেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খানের ভাষায়, "পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে; ওদিকের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এদেশে প্রতিফলিত হলে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করবে।"
৯. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমীকরণ
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক থেকেও এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। নতুন বিজেপি সরকার যদি সীমান্ত বাণিজ্য এবং কানেক্টিভিটির দিকে বেশি নজর দেয়, তবে বাংলাদেশের জন্য তা ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে যদি এলসি (LC) জটিলতা বা শুল্ক বাধার মতো সমস্যা তৈরি হয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বাজারে। দুই বাংলার সাংবাদিকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, সম্পর্কের সমীকরণ এখন আর কেবল 'মৈত্রী'তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা হবে অনেকটা 'লেনদেন' বা রিয়েলপলিটিক ভিত্তিক। কলকাতার সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রের মতে, বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সম্পর্কের গতি প্রকৃতি এখন অনেক বেশি বৈষয়িক হয়ে উঠবে।
১০. নীতিনির্ধারকদের চ্যালেঞ্জ
পরিশেষে, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির উত্থানকে বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী রাজ্যের নির্বাচন হিসেবে দেখতে পারে না। এটি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নতুন এই শক্তির সাথে কূটনৈতিক সমন্বয় করতে হবে। একদিকে যেমন তিস্তার মতো ঝুলে থাকা পাওনা আদায়ের সুযোগ নিতে হবে, অন্যদিকে অনুপ্রবেশ বা এনআরসি-র মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে যেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে। প্রতিবেশী দেশে যে ধরণের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নৈরাজ্যই চলুক না কেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দেশীয় বাণিজ্যে যেন তার নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে—সেজন্য বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের যথেষ্ট দৃঢ়তা এবং বুদ্ধিদীপ্ততার সাথে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
১১. আসাম ও ত্রিপুরার প্রেক্ষাপট: 'বিজেপি বলয়' ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয়ের ফলে বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর সীমান্তের বিশাল অংশ এখন বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলো। আসাম এবং ত্রিপুরায় ইতিপূর্বেই বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় এবং এখন পশ্চিমবঙ্গেও তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের সীমানার তিন দিকই কার্যত একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক রাজনৈতিক বলয়ের অধীনে চলে এসেছে। এই 'বিজেপি বলয়' বাংলাদেশের জন্য এক ধরণের অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
আসামের রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে এনআরসি (National Register of Citizens) একটি প্রধান ইস্যু। আসামের বিজেপি নেতৃত্ব বারবার 'উইপোকা' বা 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' তকমা ব্যবহার করে যে ধরণের রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য চরম অস্বস্তিকর। পশ্চিমবঙ্গের জয়ের পর আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে একটি সমন্বিত 'পুশ-ব্যাক' বা অনুপ্রবেশ বিরোধী অভিযান শুরু করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কঠোর অবস্থান যদি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের সাথে একীভূত হয়, তবে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে জনস্রোত ঠেলে দেওয়ার একটি কৌশলগত চাপ তৈরি হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ত্রিপুরা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এবং ট্রানজিট পয়েন্ট। যদিও ত্রিপুরার বিজেপি সরকারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই রসায়ন বদলে যেতে পারে। ত্রিপুরাকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় ভারতকে সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু বিজেপি যদি তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে সীমান্তের এপারে-ওপারে মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করে, তবে সেই সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। এছাড়া, ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারগুলো যদি 'শর্তযুক্ত বন্ধুত্ব' আরোপ করে, তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ক. সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন জটিলতা
আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশের পাশাপাশি স্থানীয় রাজ্য সরকারগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন পাবে। এতে সীমান্তে কঠোরতা বৃদ্ধির নামে সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতা বা 'পুশ-ইন' (জোর করে বাংলাদেশে মানুষ ঢুকিয়ে দেওয়া) এর মতো ঘটনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে আসামের বিতর্কিত 'ডি-ভোটার' তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের যদি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যে এক ভয়াবহ কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে।
খ. সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মেরুকরণ
আসাম ও ত্রিপুরার বিজেপি শাসিত অঞ্চলে গত কয়েক বছরে যে ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটেছে, পশ্চিমবঙ্গের জয়ের পর তা একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন করল। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এক ধরণের ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও সিলেটে এই রাজনৈতিক ডামাডোল সরাসরি প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, তিন রাজ্যের এই 'বিজেপি ত্রয়ী' বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। ঢাকাকে এখন কেবল দিল্লির সাথে নয়, বরং এই তিনটি শক্তিশালী রাজ্য সরকারের নিজস্ব আঞ্চলিক ও আদর্শিক আকাঙ্ক্ষার সাথেও দরকষাকষি করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে আগামীর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
১২. উপসংহার: সতর্ক কূটনীতি ও আগামীর পথ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একাধারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার এবং বহুমুখী চ্যালেঞ্জের চ্যালেঞ্জার। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রেক্ষাপটে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বাস্তবায়ন যেমন এখন সময়ের দাবি, তেমনি এনআরসি-সিএএ বা অনুপ্রবেশের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ঢাকার জন্য সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে সম্মান জানানো গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার হলেও, তার প্রভাব যখন নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক সংহতিতে আঘাত হানে, তখন তা দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মূল পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে নতুন এই রাজনৈতিক বলয়ের সাথে ভারসাম্যমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। একটি স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়া গড়তে হলে দিল্লি এবং ঢাকাকে ধর্মীয় বা আঞ্চলিক আবেগ ছাড়িয়ে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অভিন্ন নিরাপত্তার দিকেই বেশি মনোযোগী হতে হবে।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা