Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ৩ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : রবিবার, ৩ মে,২০২৬, ১১:২৯ এ এম
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

প্রতি বছর ৩ মে সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিবস’। ২০২৬ সালে এই দিনটি এক বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এ বছর ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সমাজ তাদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বেছে নিয়েছে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকাকে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য— “Shaping a Future at Peace: Promoting Press Freedom for Human Rights, Development, and Security”—বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি একটি জরুরি আহ্বান। যখন বিশ্বজুড়ে অসহিষ্ণুতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বিভ্রান্তিকর তথ্য (Deepfakes) এবং সংঘাত বাড়ছে, তখন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

লুসাকা সম্মেলন: এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের ৪ ও ৫ মে জাম্বিয়ার লুসাকাতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল কনফারেন্সটি আফ্রিকার সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক মাইলফলক। ১৯৮০-এর দশকে উইন্ডহুক ঘোষণার মাধ্যমে যে স্বাধীন সাংবাদিকতার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, লুসাকা সম্মেলন যেন তারই এক আধুনিক রূপান্তর। এই সম্মেলনে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকরা একতাবদ্ধ হয়েছেন এটি নিশ্চিত করতে যে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও শান্তি সম্ভব নয়। লুসাকা থেকে আসা বার্তাটি পরিষ্কার: সাংবাদিকতা যখন শৃঙ্খলিত হয়, তখন সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং সংঘাতের বীজ বপন করা সহজ হয়ে যায়।


দিবসটির  তাৎপর্য


১.সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিমালা উদযাপন করা।

২.বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অবস্থা মূল্যায়ন করা।

৩.সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ রোধ এবং যারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানানো।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF): প্রতি বছর এরা 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স' প্রকাশ করে। আপনার লেখায় বর্তমান বছরের র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বা বৈশ্বিক প্রবণতা (যেমন: ভুয়া খবরের বিস্তার বা সাংবাদিকদের ওপর আইনি চাপ) তুলে ধরতে পারেন।


ইউনেস্কোর থিম

প্রতি বছর ৩ মের একটি নির্দিষ্ট থিম থাকে।
২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিবসের (৩ মে) জন্য ইউনেস্কো কর্তৃক নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য বা থিম ছিল:
“Information as a Public Good" (জনস্বার্থে তথ্য)
২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিবসের (৩ মে) জন্য ইউনেস্কো কর্তৃক নির্ধারিত থিম বা প্রতিপাদ্য হলো:
“Shaping a Future at Peace” (শান্তিময় ভবিষ্যৎ গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা)

এই মূল প্রতিপাদ্যের সাথে আরও যুক্ত করা হয়েছে: “Promoting Press Freedom for Human Rights, Development, and Security” (মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রচার)।


২০২৬ সালের সম্মেলনের মূল কিছু তথ্য

স্বাগতিক দেশ: ২০২৬ সালের মূল গ্লোবাল কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হবে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকা-তে (৪-৫ মে, ২০২৬)।
মূল লক্ষ্য: এই বছরের প্রতিপাদ্যটি মূলত শান্তি রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা : বৈশ্বিক সূচকে আমাদের অবস্থান

১. বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান (২০২৫-২৬ প্রেক্ষাপট)

র‍্যাঙ্কিং: ২০২৫ সালের 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স' (RSF) অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৯তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৬৫তম। যদিও ১৬ ধাপ উন্নতি হয়েছে, তবুও সামগ্রিক অবস্থা এখনো 'সংকটজনক' হিসেবে বিবেচিত।
ভয় ও আত্ম-সেন্সরশিপ: উন্নতি সত্ত্বেও অধিকাংশ সাংবাদিক পেশাগত কাজে 'ভয়' ও 'আত্ম-সেন্সরশিপ' (Self-censorship) থেকে বের হতে পারেননি।

২. আইনি কাঠামো ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ

সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) থেকে অর্ডিন্যান্স (CSO): ২০২৪-২৫ সালে বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে 'সাইবার নিরাপত্তা অর্ডিন্যান্স ২০২৫' এবং 'পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫' কার্যকর রয়েছে।


ইতিবাচক দিক:  নতুন আইনে আগের চেয়ে স্বচ্ছতা বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে এবং হয়রানিমূলক ধারাগুলো কমানোর চেষ্টা চলছে। ব্যক্তিগত তথ্যকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
নেতিবাচক দিক: সমালোচকদের মতে, এখনো অনলাইনে আধিপত্য বিস্তার বা কন্টেন্ট ব্লক করার মতো আইনি সুযোগ রয়ে গেছে, যা ডিজিটাল সেন্সরশিপের ঝুঁকি বাড়িয়ে রাখে।


৩. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আইনি হয়রানি (২০২৫-২৬ আপডেট)


মামলার আধিক্য:  ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, ষড়যন্ত্র বা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গণহারে মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩০০ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল:  তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৬৭ জনেরও বেশি সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বাতিল করা হয়েছে, যা সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তলব: বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) অনেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য তলব করেছে, যা আর্থিক এবং মানসিক চাপের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
৪. মব ভায়োলেন্স ও শারীরিক হামলা
অফিস ভাঙচুর: ২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৬-এর শুরুতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যার ফলে সাময়িকভাবে তাদের প্রকাশনা বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

মব জাস্টিস: সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রলিং এবং শারীরিক হামলার ভয়ে অনেক সাংবাদিক সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকছেন। একটি জরিপ বলছে, প্রায় ৮৯% সাংবাদিক মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় শারীরিক হামলার ভয় পান।


৫.মানবাধিকার ও উন্নয়নের রক্ষাকবচ

মানবাধিকার রক্ষা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তখনই বিশ্ববাসীর নজরে আসে, যখন গণমাধ্যম সেখানে পৌঁছাতে পারে। ২০২৬ সালের থিমে ‘উন্নয়ন’ শব্দটিকে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ, জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন কখনোই টেকসই হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের নজরদারি অপরিহার্য। সাংবাদিকরা যখন নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন, তখনই সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাধ্য হয়।


৬.ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা


লুসাকা সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল প্রযুক্তির প্রভাব। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন সংবাদ সংগ্রহের কাজ সহজ করেছে, তেমনি এটি সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকিও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া খবর ছড়িয়ে কোনো গোষ্ঠীকে উত্তেজিত করা বা কোনো ব্যক্তির চরিত্র হনন করা এখন কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। স্বাধীন সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনগুলোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যাতে সেগুলো সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ না করে বরং তাদের সুরক্ষা দেয়। সম্মেলনে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা: একটি বৈশ্বিক সংকট

বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা অপূর্ণ থেকে যাবে যদি আমরা সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তার কথা না বলি। প্রতি বছর যুদ্ধক্ষেত্রে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় এবং এমনকি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে শত শত সাংবাদিক প্রাণ হারাচ্ছেন। লুসাকা সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ (Culture of Impunity) বন্ধ করা হয়। একজন সাংবাদিককে হত্যা করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা নয়, বরং সত্যকে হত্যা করা।

অবাধ স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা

১. অবাধ স্বাধীনতার স্বপক্ষে যুক্তি (গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি)
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: অবাধ স্বাধীনতা থাকলে সংবাদমাধ্যম সরকারের ভুল ত্রুটি এবং দুর্নীতি (যেমন: ব্যাংক খাতের লুটপাট বা প্রশাসনের অনিয়ম) সাহসের সাথে তুলে ধরতে পারে। এটি রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে চলতে সাহায্য করে।
২.জনগণের তথ্যের অধিকার: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অবাধ স্বাধীনতা না থাকলে জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং গুজব ডালপালা মেলে।
৩.চতুর্থ স্তম্ভের ভূমিকা: আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ—এই তিনটির কাজের তদারকি করার জন্য সংবাদমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা প্রয়োজন। এটি না থাকলে একনায়কতন্ত্রের জন্ম হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অবাধ স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা বিষয়ে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন :
গুজব ও অপপ্রচার:
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে 'অবাধ স্বাধীনতা'র সুযোগ নিয়ে অনেক সময় মূলধারার সংবাদমাধ্যমও যাচাই না করে তথ্য দিয়ে দেয়। বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতি বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের প্রভাব অতীতে ভয়াবহ হয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব:

রাষ্ট্রের অতি সংবেদনশীল নিরাপত্তা ইস্যু বা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে অবাধ প্রকাশ অনেক সময় রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও ব্ল্যাকমেইল: অনেক সময় ছোট বা অনিবন্ধিত পোর্টালগুলো স্বাধীনতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ বা আর্থিক লাভের জন্য মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী।

মালিকপক্ষের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ:

বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় মিডিয়া হাউসের মালিক ব্যবসায়ীরা। ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা 'অবাধ' না হয়ে 'মালিকের স্বার্থের অনুগামী' হয়ে পড়ে।


মব জাস্টিস ও অসহিষ্ণুতা:

বর্তমানে কোনো সংবাদের বিরুদ্ধে ভিন্নমত থাকলে সরাসরি সংবাদপত্রের অফিসে হামলা বা সাংবাদিকদের আইনি হয়রানির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি অবাধ স্বাধীনতার পথে বড় অন্তরায়।
পেশাদারিত্বের অভাব: পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামোর অভাবে অনেক সাংবাদিক সঠিক বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারেন না, যা স্বাধীনতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

২৪ এর গণঅভ্যুত্থান : বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো-


১. গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সাংবাদিকতা (২০২৪-এর ৫ আগস্টের আগে)


অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ছিল তীব্র চাপ এবং একতরফা নিয়ন্ত্রণের অধীনে।
ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear): ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) এবং পরবর্তীকালে সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA)-এর কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র 'আত্ম-সেন্সরশিপ' কাজ করত। সরকারের সমালোচনা করলে জেল বা হয়রানির ভয় ছিল নিত্যসঙ্গী।

গোয়েন্দা নজরদারি ও 'আয়নাঘর' ভীতি: মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকে প্রায়ই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নির্দেশ মেনে সংবাদ প্রচার করতে হতো। কী ছাপা হবে আর কী হবে না, তা অনেক সময় ওপর মহল থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হতো।
কর্পোরেট ও দলীয় মালিকানা: অধিকাংশ টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র ছিল সরাসরি দলীয় এলিট ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে সাংবাদিকতা 'জনগণের কণ্ঠস্বর' হওয়ার চেয়ে 'ক্ষমতার পাহারাদার' হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
ভোটাধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে নীরবতা: সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে অথবা নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।

২. অদ্ভুত্থান পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা 

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যমে এক ধরনের বড় 'বিস্ফোরণ' বা মুক্তির আভাস পাওয়া গেলেও তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ।

প্রাথমিক মুক্তির স্বাদ: দীর্ঘদিনের সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে যায়। এখন টকশো বা প্রতিবেদনে সরকারের সরাসরি সমালোচনা বা আগের আমলের দুর্নীতির চিত্র অবারিতভাবে উঠে আসছে। তথ্যের প্রবাহ অনেক বেড়েছে।
আইনি সংস্কারের উদ্যোগ: সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলের ঘোষণা এবং নতুন মিডিয়া সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। এটি সাংবাদিকদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী আশার আলো।
নতুন আতঙ্ক: 'মব জাস্টিস' ও গণমামলা: এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট। আগের সরকারের সময় সুবিধাভোগী তকমা দিয়ে শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে হত্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

‍ " সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে লাগামহীন মিথ্যাচার বা ব্যক্তিস্বার্থের চর্চা নয়; বরং তা হলো সত্য প্রকাশের অকুতোভয় সাহস। ইসলাম সাংবাদিকতাকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং 'আমানত' এবং সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার মহান দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো সংবাদ এলে তা যাচাই না করে প্রচার করা যেমন গোনাহের কাজ, তেমনি সত্য গোপন করাও বড় অপরাধ।"


অফিস ভাঙচুর ও ঘেরাও

নির্দিষ্ট কিছু সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে 'আদর্শিক' বা 'রাজনৈতিক' তকমা লাগিয়ে তাদের অফিস ঘেরাও বা হামলার ঘটনা ঘটছে। এটি রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের বদলে 'জনতার সেন্সরশিপ' বা মব জাস্টিসের ভয় তৈরি করছে।
ইনসাফ ভিত্তিক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা মূলক সংবাদ মাধ্যম: কুরআন হাদিসের আলোকে নির্দেশনা
সংবাদ এবং তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত স্বচ্ছ ও কঠোর নীতিমালা প্রদান করেছে। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের মূল কাজ যেহেতু সত্য প্রচার এবং অসত্যের নির্মূল, তাই এই প্রসঙ্গে কোরআন ও হাদিসের বেশ কিছু

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো


১. সংবাদের সত্যতা যাচাই (Fact-checking)


ইসলামে যে কোনো সংবাদ প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিনা বিচারে কোনো সংবাদ প্রচার করাকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
কোরআনের নির্দেশনা: "হে মুমিনগণ ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন না করো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ০৬)

হাদিসের নির্দেশনা : রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বর্ণনা করে।" (সহিহ মুসলিম)


২. বাক-স্বাধীনতা ও সত্য বলার সাহস


অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সত্যের প্রতি অটল থেকে সত্য কথা বলা ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। সংবাদপত্রের কাজ যদি হয় জনকল্যাণ এবং অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরা, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
হাদিসের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সবচেয়ে বড় জিহাদ।" (আবু দাউদ ও তিরমিজি)


৩. গুজব ছড়ানোর ভয়াবহতা

ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিথ্যা গুজব প্রচার করা সমাজের শান্তি নষ্ট করে। ইসলাম একে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।
কোরআনের নির্দেশনা: "যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৬)

৪. আমানতদারিতা ও পেশাদারিত্ব
অন্যায় ভাবে যেকোনো সত্য তথ্য গোপন না করা এবং ইনসাফের সাথে বস্তুনিষ্ঠভাবে তা উপস্থাপন করা একজন সংবাদকর্মীর জন্য 'আমানত'।

কোরআনের নির্দেশনা: "আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪২)

৫. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা

সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কারো ব্যক্তিগত বিষয় (যা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয়) জনসমক্ষে এনে তাকে হেয় করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
কোরআনের নির্দেশনা:"হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গিবত) করো না..." (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)


৬. গঠনমূলক সমালোচনা ও সংশোধন

এই লেখকের আরও লেখা-

মহান মে দিবস : শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকারে ইসলামের শাশ্বত বিধান মহান মে দিবস : শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকারে ইসলামের শাশ্বত বিধান

নীরব মেধা পাচার : গভীর সংকটে আগামীর বাংলাদেশ নীরব মেধা পাচার : গভীর সংকটে আগামীর বাংলাদেশ

'এপ্রিল ফুল’ বা ‘নিখিল বোকা' দিবস মিথ না কি বাস্তব? 'এপ্রিল ফুল’ বা ‘নিখিল বোকা' দিবস মিথ না কি বাস্তব?

সংবাদপত্রের একটি বড় কাজ হলো ভুল সংশোধন করা। সংশোধনের জন্য গঠন মূলক সমালোচনা করা। ইসলামে একে 'আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার' বা 'সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ' বলা হয়েছে।
কোরআনের নির্দেশনা: "তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দেবে..." (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১১০)

মোট কথা- ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে লাগামহীন, বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বাধীনতা নয় বরং দায়িত্বশীলতার সাথে দেশ ও জাতির কল্যাণে জাতি,ধর্ম, বর্ণ,গোত্র নির্বিশেষে সকলের প্রতি বৈষম্য হীন স্বাধীন সাংবাদিকতাই হল প্রকৃত স্বাধীনতা। স্বাধীনতা তখনই সার্থক, যখন তা সত্যবাদিতা, জনকল্যাণ, এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে পরিচালিত হয়। 

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে লাগামহীন মিথ্যাচার বা ব্যক্তিস্বার্থের চর্চা নয়; বরং তা হলো সত্য প্রকাশের অকুতোভয় সাহস। ইসলাম সাংবাদিকতাকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং 'আমানত' এবং সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার মহান দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো সংবাদ এলে তা যাচাই না করে প্রচার করা যেমন গোনাহের কাজ, তেমনি সত্য গোপন করাও বড় অপরাধ। তাই নৈতিক দায়বদ্ধতার এই ইসলামী দৃষ্টিকোণ যদি সাংবাদিকতার মূলনীতিতে প্রতিফলিত হয়, তবে সংবাদপত্র কেবল তথ্যের বাহক থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার যা একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে একান্ত সহায়। একটি শান্তিময় ও সত্যনিষ্ঠ সমাজ গঠনে কলম সৈনিকদের এই ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারই হোক আগামী দিনের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার।

লেখক: গবেষক, গ্রন্থপ্রণেতা ও ব্যাংকার
 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)