ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রতি বছর ৪ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় 'বিশ্ব বাণিজ্য দিবস'। বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাণিজ্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আধুনিক বিশ্ব এখন একটি 'গ্লোবাল ভিলেজ' বা বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে, যেখানে পণ্য ও সেবার আদান-প্রদান শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি। তবে বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবল জোয়ারে যখন পুঁজিবাদ এবং অসম প্রতিযোগিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন বাণিজ্যে ‘নৈতিকতা’র বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনের আলোকবর্তিকা আমাদের এক নতুন পথের দিশা দিতে পারে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান চালচিত্র
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক বাণিজ্য এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে এই চাকচিক্যের আড়ালে রয়েছে বিশাল বৈষম্য। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, আর উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়ই সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল সরবরাহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মুনাফাকেন্দ্রিক এই ব্যবস্থায় অনেক সময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাচ্ছেন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিতহচ্ছে। এখানেই প্রয়োজন পড়ে নৈতিক বাণিজ্য বা 'Ethical Trade'-এর।
ইসলামী অর্থনীতিতে বাণিজ্যের গুরুত্ব
ইসলাম বাণিজ্যকে শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি, বরং একে একটি সম্মানজনক ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
"আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)
ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং একজন সফল ও আমানতদার ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বলেছেন, "সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গী হবে।" (তিরমিযি)। অর্থাৎ, ইসলাম বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে বিশ্বাসের সমপর্যায়ে নিয়ে গেছে।
ইসলামী নৈতিকতায় বাণিজ্যের মূল ভিত্তি
ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নৈতিকতা মেনে চলা আবশ্যক:
১. সততা ও স্বচ্ছতা: বাণিজ্যের প্রধান শর্ত হলো পণ্যের মান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সত্য বলা। পণ্যের ত্রুটি গোপন করা বা ওজনে কম দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যদি বৈশ্বিক বাণিজ্যে এই সততা বজায় থাকত, তবে ভেজাল পণ্য বা নিম্নমানের পণ্যের আধিপত্য থাকত না।
২. সুদ ও শোষণমুক্ত অর্থনীতি: বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো সুদ। কিন্তু ইসলামী নৈতিকতায় সুদ (Riba) সম্পূর্ণ হারাম। সুদ সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটায় এবং দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করে। একটি ইনসাফভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য সুদমুক্ত অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
৩. মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট রোধ: অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার আশায় পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ইসলামে একে 'ইহতিকার' বলা হয়, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বৈশ্বিক বাজারেও যখন বড় বড় কর্পোরেশনগুলো বাজার সিন্ডিকেট করে দাম নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. শ্রমিকের অধিকার রক্ষা: "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।" (ইবনে মাজাহ)। বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ হলো ম্যানুফ্যাকচারিং। সাপ্লাই চেইনের একদম নিচের স্তরে থাকা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা ইসলামী নৈতিকতার দাবি।
৫. পরিবেশগত নৈতিকতা ও বাণিজ্য:আধুনিক বাণিজ্যে পরিবেশের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। কিন্তু ইসলাম প্রকৃতিকে আমানত হিসেবে গণ্য করে। মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম অকারণে গাছ কাটতে বা পানি অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্যের নামে আমরা যদি বন উজাড় করি বা সমুদ্র দূষণ করি, তবে তা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী। টেকসই উন্নয়ন বা 'Sustainable Development' নিশ্চিত করতে হলে বাণিজ্যের প্রতিটি পদক্ষেপে পরিবেশ সচেতন হওয়া জরুরি।
ইরান যুদ্ধ,তরমুজ প্রণালী সংকট : বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট
হরমুজ প্রণালীতে সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের বাজারে যখন তেলের দাম বা সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন ইসলামী নৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত সততা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার দর্শনের দিকনির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশে যখন বৈশ্বিক কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন ইসলামী অর্থনীতির তিনটি মূল নীতি এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে:
আরও পড়ুন-
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
১. মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি (Ihtikar)-
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার খবরে দেশের অনেক অসাধু ব্যবসায়ী তেলের আগের স্টক আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। ইসলামে একে 'ইহতিকার' বলা হয়, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য (বা নিত্যপণ্য) মজুত করে রাখবে, আল্লাহ তাকে দারিদ্র্য অথবা দুরারোগ্য ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত করবেন।" (ইবনে মাজাহ)।
২. ইনসাফ ও পরিমিত মুনাফা-
সংকটকালে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, তখন ব্যবসায়ীদের ওপর 'ইনসাফ' বা ন্যায়বিচার বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। ইসলামী নৈতিকতা বলে, বিপদের সময় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়ে মানুষের অসহায়ত্ব থেকে মুনাফা লুটা বড় ধরনের জুলুম। বিক্রেতাদের উচিত সীমিত লাভে পণ্য সরবরাহ সচল রাখা।
৩. গুজব ও তথ্য বিপর্যয় রোধ
তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে—এমন হুজুগ বা গুজবে সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনা শুরু করে (Panic Buying)। ইসলামে কোনো সংবাদ যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। ধৈর্য ও সংযম এখানে বড় নৈতিক গুণ।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে কৃত্রিম সংকট ও ইসলামী নৈতিকতা
কৃত্রিম সংকট তৈরি ও পণ্য মজুতদারি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গর্হিত এবং জঘন্য অপরাধ। ইসলামে অবাধ বাণিজ্যের অনুমতি থাকলেও এমন কোনো কাজকে সমর্থন করা হয়নি যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
১. পবিত্র কুরআনের আলোকে বিধান
পবিত্র কুরআনে সরাসরি 'মজুতদারি' শব্দটির চেয়েও ব্যাপক অর্থে জুলুম এবং অবৈধভাবে সম্পদ গ্রাস করার নিন্দা জানানো হয়েছে।
অবৈধভাবে সম্পদ ভোগ করা নিষিদ্ধ: আল্লাহ তাআলা বলেন-
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে (সম্পদ অর্জিত হলে) তা ভিন্ন।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
মজুতদাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়, যা এই আয়াতের পরিপন্থী।
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে (সম্পদ অর্জিত হলে) তা ভিন্ন।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
সম্পদ কুক্ষিগত করার পরিণাম-
"যারা সোনা-রুপা (সম্পদ) জমা করে এবং আল্লাহর পথে তা খরচ করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।" (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)
"যারা সোনা-রুপা (সম্পদ) জমা করে এবং আল্লাহর পথে তা খরচ করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।" (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)
২. হাদিস শরিফের আলোকে বিধান
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
মজুতদারকে 'পাপিষ্ঠ' হিসেবে ঘোষণা-
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে:রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে পাপিষ্ঠ (অপরাধী)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬০৫)
আল্লাহর অভিশাপ ও দারিদ্র্যের শিকার
ইবনে মাজাহ শরিফে বর্ণিত হয়েছে-
নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি পণ্য আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করে সে রিযিকপ্রাপ্ত হয়, আর যে মজুতদারি করে সে অভিশপ্ত।" (ইবনে মাজাহ: ২২৩৯)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে:
"যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দারিদ্র্য ও কুষ্ঠব্যাধিতে আক্রান্ত করেন।" (ইবনে মাজাহ: ২২৩০)
৪০ দিনের সময়সীমা ও দায়মুক্তি:
অনেক সময় ব্যবসায়ীরা মনে করেন কিছুদিন আটকে রাখলে সমস্যা নেই। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রাখল, সে আল্লাহর দিক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করল এবং আল্লাহও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।" (মুসনাদে আহমাদ: ৪৮৮০)
৪. মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের শিক্ষা
ইসলামের মূলনীতি হলো— "লা দ্বারারা ওয়া লা দিরার" (কারো ক্ষতি করা যাবে না, নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না)। তেলের বাজারের অস্থিরতাকে পুঁজি করে যারা মানুষের কষ্ট বাড়ায়, তারা মূলত সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
৫. মজুতদারির ফলে সৃষ্ট সামাজিক অবক্ষয়
মজুতদারি কেবল পণ্যের দাম বাড়ায় না, বরং এটি সমাজে চুরিবাজি, ছিনতাই এবং অস্থিরতা তৈরি করে। ইসলামি অর্থনীতি অনুযায়ী, সম্পদের প্রবাহ রুদ্ধ করা (Hoarding) সম্পদের বরকত কমিয়ে দেয় এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে।
বিশ্ব বাণিজ্য দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই নির্ভরতা যেন শোষণের হাতিয়ার না হয়। ইসলামী নৈতিকতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বাণিজ্য কেবল নিজের পকেট ভরার নাম নয়, বরং এটি মানবসেবা ও সমাজ কল্যাণের একটি পথ।
একটি ইনসাফভিত্তিক বৈশ্বিক সমাজ বিনির্মাণে বাণিজ্যের সাথে নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটানো এখন সময়ের দাবি। যদি সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং সমবণ্টনের নীতিতে বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালিত হয়, তবেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়া সম্ভব। ৪ মে বিশ্ব বাণিজ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—ব্যবসায়িক মুনাফার চেয়ে মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া। হরমুজ প্রণালীর সংকটের অজুহাতে বাংলাদেশে যারা তেলের বাজার অস্থির করছে, তারা কেবল আইন ভাঙছে না, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও অবমাননা করছে। সততা ও স্বচ্ছতাই পারে এই বৈশ্বিক সংকট থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে।
লেখক: গবেষক, গ্রন্থপ্রণেতা ও ব্যাংকার