ধ্রুব নিউজড. এস এম তাজউদ্দিন
২০০৬ সালের কথা রেলযোগে খুলনা থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম। প্রচণ্ড ভিড় নড়াচড়া করার সুযোগটাও নেই। তারমধ্যে আবার দুজনের বসার জন্য শীট বরাদ্ধ মাত্র একটি । কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ কে হাত ধরে বসার জন্য অনুরোধ করলেন তাকিয়ে দেখি ষাটোর্ধ্ব নিরেট এক ভদ্রলোক, যিনি ছিলেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে শীট ভাগাভাগি করে খুলনা থেকে কোনোরকম ঢাকা পৌছালাম। পরিচয় হলো, অনেক কথা হলো, শিখলাম অনেক কিছু। তারপর আর দেখা বা কথা হয়নি।
২০১৫ সাল ঈদের একটা অনুষ্ঠানে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে একটি প্রতিবেদন দেখছিলাম। প্রতিবেদনে যার সাক্ষাৎকার দেখলাম তিনি আর কেউ নন, সে আমারদের পরিচিত স্যার। সারের সাক্ষাৎকারের সময় বুকের ভিতর হু হু করে উঠলো, স্যারের মতো মানুষেরও ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রম? এটা কি সামাজিক না কি নৈতিক অবক্ষয়? যাইহোক ঈদের দিনে অন্যান্যদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি স্যারের সাথে দুঃখ ভাগাভাগি করে নিলাম। কিছুদিন পরে স্যারকে ফোন দিয়ে বাসায় আসার কথা বলি স্যার কিছু কথা বললেন যার সারমর্ম ছিল এরকম, যে আমার বাসায়ও এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে । তারপর অনেকদিন গড়িয়ে গেল হঠাৎ মনে হল একটু বৃদ্ধাশ্রমগুলো ঘুরে দেখব তাই এবার ঈদের ছুটিতে খুলনা এবং যশোরের দুটো বৃদ্ধাশ্রম ঘুরে দেখলাম। বৃদ্ধাশ্রম ঘুরে দেখে মনে হলো জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতা যেন পুরো বিষয়টিকে চোখের সামনে তুলে ধরেছেন এক অদ্ভুত সৃষ্টিতে-
ছেলে আমার মস্ত মানুষ,মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার ।
নানান রকম জিনিস, আর আসবাব দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার,আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম!
কেন এই বৃদ্ধাশ্রম?
এটা কি আধুনিকতা? না কেতাবী শিক্ষার ফল? না কি পশ্চিমাবিশ্বের প্রভাব? সে যাই হোক বৃদ্ধাশ্রম হলো একটি স্বপ্নের পতন বা আশার ঘর ভাঙ্গা। বৃদ্ধাশ্রম মূলত:অসহায় বাব-মার একটি আবাসন বা থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। এখন প্রশ্ন হলো কেন এই বৃদ্ধাশ্রম? সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে এসে কেন এই মানবিক অবক্ষয়? কেন এই বর্বরতা? এবার এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যশোরের বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্ধা জনাব রফিক ও খুলনার বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্ধা জনাব শফিকের(ছদ্ম নাম) সাক্ষাৎকারে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে তা মূলত-
মূল্যবোধ: ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে সন্তানেরা পিতামতার প্রতি রুঢ় আচরণ করে। যদি আধুনিক শিক্ষার সাথে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার সমন্বয় ঘটতো তাহলে আজ এই বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্ঠি হতো না । এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া আর কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদেরকে উফ্ (পর্যন্ত) বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবনত কর এবং দুআ কর, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।” -সূরা বনী ইসরাঈল, (১৭): ২৩-২৪।

লেখক ঈদের দিন বন্ধু-স্বজনদের নিয়ে দেখতে বেরিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের
অতি উচ্চশিক্ষিত : পরিবারের সকলে অতিশিক্ষিত হওয়ার ফলে নিজেদেরকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত থাকেন সর্বক্ষণ। সন্তান বড় করার তাকিদে একাধিক গৃহশিক্ষক, ব্যক্তিগত গাড়ি, নিজস্ব ড্রাইভার, নিজ নিজ চাকরিতে বা ব্যবসায় ব্যস্ত থাকার কারণে পরিবারের সদস্যদের সাথে মিথস্ক্রিয়া হয় না, ফলে একে অপরের প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হয় ন। চাকরিতে বা ব্যবসায় নিয়োগ করা হয় একাধিক সহযোগী। বৃদ্ধ বাব-মাদের সময় দেয়ার মতো সময় ও সুযোগ থাকেনা, ফলে বাসাটা হয়ে ওঠে খুবই সংকীর্ণ। তখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
স্ত্রীও সন্তানদের দ্বারা সম্পদ আত্মসাতের পর নিঃস্ব হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে : অনেকে অতি আগ্রহে নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দিয়ে আনন্দ বোধ করেন। অবশেষে সম্পত্তি পেয়ে সন্তান-সন্ততি আলাদা হয়ে যায়। বৃদ্ধ পিতা তাদের নিকট হয়ে উঠে উচ্ছিষ্ট। অথবা সন্তানরাই ভিন্ন কৌশলে সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দেয় বৃদ্ধ মাতা-পিতাকে। অবশেষে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় অনেকের জীবনে অপেক্ষা করে বৃদ্ধাশ্রমের বিছানা।
লেখকের আরও লেখা-
চক্রাকার বা পুনর্জন্ম অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ: কিয়াম মেটাল
পরিবারের কলহ : সন্তানাদি বা ছেলের বউদের সাথে অমিল। সেকারণ তারা পায় না সদাচরণ, বেঁচে থাকার মত পায় না আহার, পায় না উপযুক্ত পরিধেয় বস্ত্র এবং নানাবিধ রোগের যাতাকলে পিষ্ট হয়েও পায় না চিকিৎসার জন্য পারিবারিক সহযোগিতা। অর্থের অভাবে ব্যক্তিগত চাহিদার সকল অংশ থাকে অপূরণীয়। ফলে কষ্ট-ক্লেশে জর্জরিত হয়ে অনেকেই স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমকে জীবনের শেষ ঠিকানা বানিয়ে নেয়।
একাকিত্ব ঘোচাতে বৃদ্ধাশ্রমে : অনেকে আবার বাড়িতে সঙ্গ দেওয়ার মত কেউ না থাকায় একাকিত্ব ঘোচাতে স্থান করে নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। তাছাড়া নিরাপত্তার অভাবেও অনেকে এই পথ বেছে নেন৷ এছাড়াও-
১। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠনের কারণে বয়স্ক সদস্যদের স্থান সংকুচিত হয়েছে।
২। পরিবারের সদস্যরা বৃদ্ধদের দেখাশোনার সময় বের করতে পারে না।
৩। প্রজন্মের ব্যবধান এবং চিন্তাধারার পার্থক্যের কারণে পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে।
৪। অনেকেই বৃদ্ধদের প্রতি দায়িত্ব ও সেবা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ।

বাম দিক থেকে প্রথমে লেখক আর বৃদ্ধাশ্রমের তিন বাসিন্দা
সমাধানের পথ
পারিবারিক দায়িত্ব: বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রথম ও প্রধান ঠিকানা হওয়া উচিত তাদের নিজস্ব পরিবার।
সচেতনতা বৃদ্ধি: বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
নিয়মিত যোগাযোগ: যারা দূরে থাকেন, তারা যেন নিয়মিত বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেন ও সময় কাটান।
ধর্ময় অনুশাসন: ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এ বৃদ্ধাশ্রম সৃস্টি হবেনা এবং যেগুলো আছে তা অনেকাংশে কমে যাবে।
সুশিক্ষা: সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবার ফলে অতি উচ্চশিক্ষিত হলেও পরিবারের সকলে সকলের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে এবং শতব্যস্ততা থাকা সত্বেও নিজেদেরমত করে মসয় বের করে থাকেন সর্বক্ষণ।
আসলে বৃদ্ধাশ্রম কোনো দীর্ঘমেয়াদী আদর্শ সমাধান নয়, বরং এটি পারিবারিক ভাঙনের একটি দৃশ্যমান পরিণতি। বয়স্কদের যথাযথ ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মান নিশ্চিত করাই পরিবার ও সমাজের মূল দায়িত্ব।
লেখক: গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক (ব্যবসায় প্রশাসন), ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, যশোর।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
আরও পড়ুন-
দক্ষিণের দ্বীপ : যেখানে আকাশ মেশে সাগরে