Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

পহেলা মে: ইতিহাস, সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির করণীয়

খবির শিকদার খবির শিকদার
প্রকাশ : শুক্রবার, ১ মে,২০২৬, ০৮:০১ এ এম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল,২০২৬, ১০:২৩ পিএম
পহেলা মে: ইতিহাস, সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির করণীয়

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাসে পহেলা মে এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি কেবল একটি দিবস নয়; এটি রক্তে লেখা সংগ্রামের ইতিহাস, অধিকার আদায়ের প্রতীক, এবং শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের নাম। আজ আমরা যখন পহেলা মে উদযাপন করি, তখন আমাদের শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—এর গভীর ইতিহাস, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং বর্তমান বাস্তবতার সাথে এর সম্পর্ক বুঝতে হবে।

১৮৮৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামে। সে সময় শ্রমিকদের ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে তারা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৪ মে, হে-মার্কেট স্কোয়ারে পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক নিহত হন। এই রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়েই শ্রমিক আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নতুন গতি পায়।

পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা পহেলা মে’কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এই দিনটি তখন থেকেই শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।


কমিউনিস্ট আন্দোলন ও শ্রমিক শ্রেণির ঐতিহাসিক ভূমিকা

বিশ্ব রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির উত্থান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। তারা শুধু শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবিই তুলে ধরেনি, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। তাদের বিশ্বাস ছিল—শ্রমিক শ্রেণিই পারে শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে।
শ্রমিকদের সংগঠিত করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শ্রেণিচেতনা সৃষ্টি—এসবই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ইতিহাস প্রমাণ করে, যেখানে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়েছে, সেখানে তারা তাদের অধিকার আদায়ে সফল হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণির বাস্তবতা

বাংলাদেশ একটি শ্রমনির্ভর দেশ। গার্মেন্টস, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, টেলিকম, ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে লাখো শ্রমিক কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, ওভারটাইমের সঠিক হিসাব নেই, কর্মপরিবেশ নিরাপদ নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—শ্রমিকরা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বললেই চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়।

ট্রেড ইউনিয়নের অভাব বা কার্যকারিতা না থাকায় শ্রমিকরা সংগঠিত হতে পারছে না। ফলে তারা একা, বিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ সহজেই তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে।

লুকোচুরি ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই একটি “লুকোচুরি খেলায়” পরিণত হয়েছে। বাইরে থেকে উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও, ভেতরে চলছে শোষণ, অনিশ্চয়তা ও ভয়।
মালিকরা প্রায়ই শ্রমিকদের “পরিবারের সদস্য” বলে উল্লেখ করে, কিন্তু বাস্তবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আগ্রহী নয়। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা দমন করা হয়, নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেওয়া হয় না।
এই দ্বিচারিতা শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা বুঝতে পারছে—এককভাবে লড়াই করে কিছু অর্জন সম্ভব নয়, কিন্তু সংগঠিত হওয়ার পথও সহজ নয়।


শ্রমিক শ্রেণির করণীয়: সচেতনতা, সংগঠন ও সংগ্রাম

এই বাস্তবতায় শ্রমিক শ্রেণীর সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো নিজেদের রাজনৈতিক ও শ্রেণীচেতনা বৃদ্ধি করা। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দাবি নয়, তাদের বুঝতে হবে—তাদের অবস্থান সমাজে কোথায়, এবং কীভাবে তারা পরিবর্তন আনতে পারে। সে কারণে কিছু কর্মসূচি নিতে হবে-

প্রথমত, সচেতনতা বৃদ্ধি: শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। শ্রম আইন, কর্মঘণ্টা, মজুরি, নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সংগঠিত হওয়া: এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে লড়াই করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন বা শক্তিশালী করা অপরিহার্য। যেখানে ইউনিয়ন নেই, সেখানে বিকল্প সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, সেক্টরভিত্তিক ঐক্য: গার্মেন্টস, টেলিকম, ব্যাংকিং, পরিবহন—প্রতিটি সেক্টরের শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে হবে। এক সেক্টরের আন্দোলন অন্য সেক্টরের সাথে যুক্ত হলে তা শক্তিশালী হবে। 
চতুর্থত, প্রতিবাদের সংস্কৃতি গড়ে তোলা: ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে যদি শ্রমিকদের চুপ করিয়ে রাখা হয়, তাহলে কোনোদিনই পরিবর্তন আসবে না।


রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকা

শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু তাদের নিজেদের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র ও প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, কর্মপরিবেশ তদারকি, অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া বন্ধ করা—এসব বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করে। এই নীরবতা মালিকপক্ষকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং শ্রমিকদের দুর্বল করে।
পহেলা মে’র তাৎপর্য: আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব সংগ্রাম
আজ পহেলা মে অনেক জায়গায় শুধু মিছিল, ব্যানার আর বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এই দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য হলো—সংগ্রাম, ঐক্য এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দিনটি এসেছে রক্তের বিনিময়ে। তাই এটিকে শুধুমাত্র উদযাপনের দিন হিসেবে নয়, আত্মসমালোচনা ও নতুন করে সংগঠিত হওয়ার দিন হিসেবে দেখতে হবে।

লেখক: সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)