কৃষক আতিয়ার রহমানের সূর্যমুখি ক্ষেত ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরের কবি আজীজুল হক লিখেছিলেন— ‘মেঘমুখি তুমি সূর্যমুখি হও’। কবির সেই কথাটিই যেন আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের খলসী গ্রামে। তবে এখানকার কৃষকেরা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং লাভজনক ভোজ্য তেলের জোগান দিতেই এখন সূর্যমুখী চাষে ঝুঁকছেন।
খলসী গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠগুলোতে এখন হলুদের সমারোহ। গতানুগতিক ধান বা পাটের চাষে যে পরিমাণ সেচ আর সারের খরচ লাগে, তার তুলনায় সূর্যমুখী চাষ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। আর তেলের দাম চড়া থাকায় এই ফসল চাষ করে এখন কৃষকদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে।
স্থানীয় কৃষক আতিয়ার রহমান এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি জানান, আগে অন্য সব ফসলে খরচ মেটাতেই কষ্ট হতো। এবার সূর্যমুখী লাগিয়ে দেখছি খরচ অনেক কম, কিন্তু কয়েকগুণ লাভের আশা আছে। তার এই সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক কৃষকই এখন আগামী বছর সূর্যমুখী চাষ করার কথা ভাবছেন।
আরেকজন চাষি জানান, আগে তিনি সূর্যমুখীকে কেবল শৌখিন ফুল মনে করতেন। এবার ২ বিঘা জমিতে এর চাষ করে তিনি অবাক। ধানের তুলনায় এতে পানি ও সার যেমন কম লাগে, তেমনি পোকা-মাকড়ের উপদ্রবও নেই। নিজের পরিবারের তেলের চাহিদা মিটিয়েও তিনি ভালো টাকা ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছেন।
পুষ্টিগুণের বিচারেও সূর্যমুখী তেলকে বলা হয় ‘সুপারফুড’। হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং ত্বক ও চুলের পুষ্টি জোগাতে এই তেলের তুলনা নেই। ভিটামিন-E ও প্রোটিন সমৃদ্ধ এই বীজ এখন স্থানীয় পর্যায়ে তেলের চাহিদা মেটানোর বড় এক উৎস হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে ভোজ্য তেলের যে চড়া দাম, তাতে সূর্যমুখীর বিপণন নিয়ে কৃষকদের খুব একটা দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে ঘানির মাধ্যমে তেল নিষ্কাশন করে যেমন নিজেদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে, তেমনি বড় বড় কোম্পানিগুলো মাঠ পর্যায় থেকে সরাসরি সূর্যমুখী বীজ সংগ্রহের আগ্রহ দেখাচ্ছে। তেলের বাণিজ্যিক চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও এই বীজের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকরা মনে করছেন, সরকারিভাবে যদি সরাসরি বীজ ক্রয়ের ব্যবস্থা বা স্থানীয়ভাবে আধুনিক মাড়াই কল স্থাপন করা যায়, তবে এই অঞ্চলের সূর্যমুখী চাষ জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কেবল অর্থনৈতিক লাভই নয়, সূর্যমুখি ক্ষেতগুলো এখন প্রকৃতিপ্রেমীদেরও প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন বিকেল হতেই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন ছবি তুলতে।
গ্রামের মাঠে যখন সারি সারি সূর্যমুখী ফুল ফুটে থাকে, তখন মনে হয় যেন হলুদ রঙের এক সমুদ্র দুলছে। হালকা বাতাসে তাদের নরম দোলায় প্রকৃতি যেন গান গায়। সেই দৃশ্য মানুষের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। সূর্যমুখীর দিকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতি যেন হাসছে।