Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

নারী দিবসে প্রত্যাশা: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার

উজ্জ্বল বিশ্বাস উজ্জ্বল বিশ্বাস
প্রকাশ : রবিবার, ৮ মার্চ,২০২৬, ১২:৪৬ এ এম
আপডেট : শনিবার, ৭ মার্চ,২০২৬, ০৮:৫০ পিএম
নারী দিবসে প্রত্যাশা: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার

০২৬ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় বছর। এই বছর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের সমান্তরালে আমাদের সামাজিক ও আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি জাতির সামগ্রিক সমৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন সেই সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারী—নিরাপদ, শিক্ষিত এবং অধিকার সচেতন থাকে। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে "আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার" কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি একটি টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার। আজকের একটি কন্যা শিশুই আগামীর একজন দক্ষ জনশক্তি, নীতিনির্ধারক বা মমতাময়ী মা। তাই কন্যা শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল নারীর সামগ্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচার সুরক্ষা সম্ভব। আমাদের আত্মোপলব্ধি করতে হবে যে, আমরা কি আমাদের কন্যাদের জন্য একটি জেন্ডার-বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে সত্যিই প্রস্তুত?

তবে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় পর্বতসম বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যৌতুক ও বাল্যবিবাহের বিষবৃক্ষ। পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র আমাদের বলে যে, এখনো প্রায় অর্ধেকের বেশি কন্যা শিশুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।

জেন্ডার বৈষম্য কেবল নারী-পুরুষের সংখ্যার তফাত নয়, এটি একটি গভীর মানসিক ও কাঠামোগত ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করতে দরকার একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে এখনো পরোক্ষভাবে যেসব লিঙ্গবৈষম্যমূলক উদাহরণ থাকে, ২০২৬ সালের আধুনিক শিক্ষাক্রমে তা বর্জন করে নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে নারীদের কেবল সাধারণ শিক্ষায় নয়, বরং কোডিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে যেন তারা বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে সমানতালে অংশ নিতে পারে। একইসাথে স্কুল পর্যায় থেকেই কন্যা শিশুদের তাদের শরীরের ওপর নিজস্ব অধিকার বা বডিলি অটোনমি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। আধুনিক শিক্ষায় জেন্ডার সেনসিটাইজেশন অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ছাত্রছাত্রীরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বড় হবে, যা ভবিষ্যতে সহিংসতা হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে।

২.

তবে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় পর্বতসম বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যৌতুক ও বাল্যবিবাহের বিষবৃক্ষ। পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র আমাদের বলে যে, এখনো প্রায় অর্ধেকের বেশি কন্যা শিশুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। দরিদ্র ও অসচেতন পরিবারগুলো মনে করে মেয়ে বড় হলে যৌতুকের পরিমাণ বাড়বে, আর এই ভয়ে তারা দ্রুত মেয়েকে বিয়ে দিয়ে 'দায়মুক্ত' হতে চায়। অথচ তারা বুঝতে চায় না যে, শিক্ষাবঞ্চিত একটি মেয়ে সারা জীবন পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে, যা তাকে আরও বেশি নির্যাতনের সম্মুখীন করে। যদিও আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ও যৌতুক নিরোধ আইনের মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে, কিন্তু শুধু জেল-জরিমানা দিয়ে সমাজ বদলানো কঠিন। যখন একজন বাবা বুঝতে পারবেন যে তার মেয়েটি সম্পদ, বোঝা নয়—তখনই আইনের সার্থকতা আসবে। সচেতনতা অপরাধকে প্রতিরোধ করে, আর আইন অপরাধীকে দণ্ড দেয়। ২০২৬ সালের স্মার্ট বাংলাদেশে আমাদের প্রতিটি পাড়ায় ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত গ্রাম’ গড়ার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক সময় বাল্যবিবাহ গোপন করতে রেজিস্ট্রি করা হয় না। ফলে নারী যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে দেনমোহর বা খোরপোশের মতো আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। শতভাগ ডিজিটাল বিবাহ নিবন্ধন নিশ্চিত করা তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের শিশুটিই আগামী দিনের নারী. শৈশবে যদি একটি মেয়ে পুষ্টি, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সে কখনোই একজন আত্মবিশ্বাসী নারী হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না। কন্যা শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা মানেই হলো নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দলিলবিহীন বিয়ের প্রথা নারীর আইনি অধিকারের পথে বড় বাধা। মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক সময় বাল্যবিবাহ গোপন করতে রেজিস্ট্রি করা হয় না। ফলে নারী যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে দেনমোহর বা খোরপোশের মতো আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। শতভাগ ডিজিটাল বিবাহ নিবন্ধন নিশ্চিত করা তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অনলাইন ডাটাবেজের মাধ্যমে বয়স যাচাই করে বিবাহ নিবন্ধন করলে বয়স জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ হবে। পাশাপাশি হিন্দু ও খ্রিস্টান বিবাহ আইনের আধুনিকায়ন ও সংস্কারও সমানভাবে জরুরি যাতে সকল ধর্মের নারী সমান আইনি সুরক্ষা পায়।

৩.

নারী নির্যাতনের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুকজনিত নির্যাতনের পাশাপাশি সাইবার বুলিং এখন এক নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে অনলাইনে নারীর ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে হেনস্তা করার হার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশের বেশি। ডিজিটাল স্পেসে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের অনলাইন অংশগ্রহণ সংকুচিত হবে। রাস্তাঘাটে ইভটিজিং বা গণপরিবহনে হয়রানি নারীর গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে অনেক মেধাবী মেয়ে অকালে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হেল্পলাইন ১০৯ ও ৯৯৯-এর প্রচার তৃণমূল পর্যায়ে আরও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নারীরা যেন স্মার্টফোন ব্যবহার করে অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহায়তা পায়, সেই অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।

২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা এবং এসডিজি গোল-৫ অর্জনে সরকারকে জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটিং বা নারী সংবেদনশীল বাজেটের ওপর জোর দিতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা অর্থনীতির মূলধারায় নেতৃত্ব দিতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি ডে-কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করা আজ বিলাসিতা নয়, বরং অধিকার। নারীর সম্পত্তির অধিকারে যে কাঠামোগত বৈষম্য বিদ্যমান, তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া নারীর পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা লাভ সম্ভব নয়। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ কেবল কোটায় সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। তৃণমূলের স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করলে তা সামাজিক বিচার ব্যবস্থায় নারীর প্রবেশাধিকার সহজ করবে।

৪.

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিডও (CEDAW) সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা পেতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ আইনের প্রয়োগ এবং নারী অধিকারের সূচকগুলোতে উন্নতি করতে হবে। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তখনই সুসংহত হবে যখন নারী অধিকারের সূচকে আমরা অগ্রগামী থাকব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের এই অগ্রগতি প্রশংসিত হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সম্মিলিত সামাজিক বিপ্লব ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমরা যখন ২০২৬ সালে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব, তখন আমাদের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রাখা অসম্ভব। আইনকে হাতের অস্ত্র এবং সামাজিক সচেতনতাকে মনের বল হিসেবে গ্রহণ করে আমাদের এমন এক বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে প্রতিটি কন্যা শিশু নির্ভয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবে। আজকের প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপই নিশ্চিত করবে আগামীর এক আলোকিত, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়বিচারপূর্ণ স্মার্ট বাংলাদেশ। নারীদের সুরক্ষিত ও অধিকার সচেতন করাই হোক ২০২৬ সালের নারী দিবসের প্রধান অঙ্গীকার।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি শহীদ মশিয়ূর রহমান ডিগ্রি কলেজ, যশোর।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)