ড. জামিল মাসরুর
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন যখন বৈশ্বিক প্রশংসার দাবিদার, তখন বোরকা পরিহিত নারীদের ওপর হামলা বা হয়রানির ঘটনা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও সংকটের জন্ম দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, বোরকা পরে ভোট প্রার্থনা করা কি কোনোভাবে অন্যায়? নাকি এই নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া রাষ্ট্রের এক বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিচ্যুতি?
পোশাকের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো ধারাতেই পোশাকের কারণে নাগরিক অধিকার হরণ করার সুযোগ নেই।
ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের তার নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার আছে। বোরকা পরা অনেক নারীর কাছে একটি ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতিফলন।
বৈষম্যহীনতা: সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্র কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। সুতরাং, বোরকা পরে রাজনীতি করা বা ভোট প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং একটি সাংবিধানিক অধিকার। একে 'অন্যায়' বা 'অগণতান্ত্রিক' বলার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
হামলার বাস্তবতা: রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বোরকা পরিহিত নারী কর্মীরা প্রচারণার সময় শারীরিক লাঞ্ছনা, মৌখিক অপদস্ত এবং নানাবিধ হামলার শিকার হচ্ছেন। এই হামলার পেছনে কয়েকটি কারণ বিশ্লেষণ করা যায়:
বিদ্বেষমূলক রাজনীতি: অনেক ক্ষেত্রে পোশাকের ধরণকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়, যা উগ্রপন্থীদের বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হামলার সুযোগ করে দেয়।
পরিচয়হীনতার অজুহাত: নারী কর্মীদের মুখ ঢাকা থাকার অজুহাতে অনেক সময় দুষ্কৃতকারীরা 'স্বচ্ছতা' বা 'পরিচয় নিশ্চিতকরণে'র কথা বলে আক্রমণ চালায়, যা আদতে একটি অজুহাত মাত্র।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা: নারীর রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে অনেক সময় সমাজ সহজভাবে নিতে পারে না, এবং বোরকা পরা নারীর ক্ষেত্রে এই আক্রমণ আরও তীব্র হয়।
নির্বাচন কমিশনের সুরক্ষা ও দায়িত্ব
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর সাংবিধানিক দায়িত্ব অর্পিত থাকে। বোরকা পরিহিত নারীদের নিরাপত্তা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে পারে-
বিশেষ নিরাপত্তা সার্কুলার: প্রচারণার শুরুতেই বোরকা পরিহিত বা পর্দাশীল নারীদের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লিখিত নির্দেশনা প্রদান করা।
ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ: প্রচারণার সময় কোনো প্রার্থীর সমর্থকরা তার পোশাক বা পর্দার কারণে হয়রানির শিকার হন, তবে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা।
তদারকি সেল: বোরকা পরিহিত নারীদের ওপর কোনো হামলা হচ্ছে কি না, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা।
প্রতিপক্ষ প্রার্থীর করণীয় ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার
সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে প্রতিপক্ষ প্রার্থীদেরও কিছু নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব রয়েছে:
পোশাক নিয়ে কুৎসা বন্ধ করা: প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ব্যক্তিগত পোশাক বা পর্দা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য বা কুৎসা রটনা থেকে বিরত থাকা। রাজনৈতিক বিতর্ক হতে হবে জনসেবা ও উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে, পোশাক নিয়ে নয়।
সমর্থকদের সংযত রাখা: অনেক সময় প্রার্থীর সমর্থকরা বোরকা বা পর্দা নিয়ে কটূক্তি করে। প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে তার কর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে যে, নারীর মর্যাদা হানিকর কোনো আচরণ সহ্য করা হবে না।
সহযোগিতার মনোভাব: সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ (Level Playing Field) নিশ্চিত করতে এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর অধিকারকে সম্মান করবেন। বোরকা পরিহিতদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া বা তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা থেকে বিরত থাকা।
রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও নিরাপত্তার আবশ্যকতা
নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। যখন কোনো ব্যক্তি হামলার মুখে পড়েন, তখন তা কেবল ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং সমগ্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর হামলা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা: পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সকল প্রার্থীর সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বোরকা পরার কারণে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাকত।
ভয়হীন পরিবেশ: একজন নারী কী পরে প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাবেন, তা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। কিন্তু সেই পোশাকের কারণে তিনি যেন কোনোভাবেই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
হামলার প্রভাব: নারীর ক্ষমতায়নে অন্তরায়
বোরকা পরিহিত নারীদের ওপর হামলা কেবল বর্তমান প্রার্থীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং এটি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে-
রাজনীতিতে অনাগ্রহ: নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ধর্মপ্রাণ বা রক্ষণশীল পরিবারের শিক্ষিত নারীরা রাজনীতিতে আসতে ভয় পাবেন। এতে নেতৃত্বের বিশাল এক অংশ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে।
গণতন্ত্রের সংকোচন: সমাজের একটি বড় অংশ যদি পোশাকের কারণে বা নিরাপত্তার অভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে, তবে সেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না।
সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে সুপারিশমালা
বোরকা পরিহিত নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরাপদ করতে রাষ্ট্র ও সমাজকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন-
নির্বাচনী স্পেশাল স্কোয়াড: নারী প্রার্থীদের প্রচারণার সময় নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তা দল নিয়োগ করা।
দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: নারী প্রার্থীর ওপর হামলাকারী যে দলেরই হোক না কেন, তার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
জনসচেতনতা ও প্রচারণা: রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রচারণা চালানো যে—পোশাকের কারণে কোনো নাগরিককে হেয় করা বা আক্রমণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ডিজিটাল পরিচয় যাচাই: নির্বাচনী কার্ড বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে আধুনিক করা, যাতে পোশাক নিয়ে বিতর্কের সুযোগ না থাকে।
মোটকথা- বোরকা পরে ভোট প্রার্থনা করা কোনোভাবেই অন্যায় নয়, বরং এটি একজন নাগরিকের অকাট্য অধিকার। এই অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যদি নারীরা হামলার শিকার হন, তবে তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষায় নয়, বরং প্রতিটি ব্যক্তির ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সুরক্ষায় নিহিত। রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই বোরকা পরিহিত নারী রাজনীতিকদের অভয় দিতে হবে এবং তাদের ওপর হওয়া প্রতিটি হামলার কঠোর জবাব দিতে হবে। পোশাকের চেয়ে মানুষের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক অধিকারের মূল্য অনেক বেশি।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব