❒ তাৎক্ষণিক অনুভূতি
মতিউর রহমান
বরেণ্য রাজনীতিক বাঘারপাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের সিদ্দিকী আজ দুপুরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ছবি: ফাইল
বাঘারপাড়ার এক বনেদী পরিবারের সন্তান আবু তাহের সিদ্দিকী। তার পিতা ছিলেন আলতাফ বিশ্বাস। যে সময় গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল তখন জনাব বিশ্বাস গ্রাম সরকার প্রধান ছিলেন। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সাথে পুরো পরিবার জড়িত। মহিরণের কৃতীসন্তান আবু তাহের সিদ্দিকী ছিলেন দরাজহাট ইউনিয়নের বেশ কয়েকবারের চেয়ারম্যান। বাঘারপাড়া পৌরসভা হলে তিনি আর চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াননি। ছিলেন উপজেলার চেয়ারম্যান। তিনি তার রাজনৈতিক দলের শীর্ষপদেও ছিলেন। উপজেলা বিএনপি;র সাধারণ সম্পাদক। এই মানুষটির বড় পরিচয় তিনি ছিলেন মানব দরদী জনহিতকর বলতে যা বোঝায় তাই।
আজ দুপুরে এই মানুষটি খুলনা সিটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আমরা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। কামনা করি মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। তাৎক্ষণিকভাবে তার মৃত্যুর খবরে এই ছোট্ট লেখাটি নিবেদন করছি । আর এটি লিখেছেন ধ্রুব নিউজের বাঘারপাড়া প্রতিনিধি, মরহুমের একান্ত স্নেহধন্য। তিনি তাকে নানা বলে সম্বোধন করতেন।
বিনয়ী আচরণ, নিরলস পরিশ্রম এবং অদম্য সাহসের এক অনন্য মূর্ত প্রতীক ছিলেন আবু তাহের সিদ্দিকী। আমি তাকে নানা বলেই ডাকতাম। রক্তের না হলেও, ঘনিষ্ঠতা ছিল রক্তের। ইউনিয়ন পরিষদের সীমা পেরিয়ে তিনি বাঘারপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন সত্যিই, কিন্তু তার আসল উচ্চতা পদ-পদবি দিয়ে মাপা অসম্ভব। নানার উচ্চতা মানুষের হৃদয়ে, মানুষের বিশ্বাসে। তিনি ছিলেন সবার চেয়ে ভিন্ন, একজন সত্যিকারের মানুষের নেতা।
নানার সবচেয়ে অসাধারণ গুণ ছিল—সাধারণ কথাকেও তিনি এমন মাধুর্যে উপস্থাপন করতেন, যেন তা মানুষের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে। উপজেলা সদরের আশেপাশে যেখানেই জানাজা হতো, নানার উপস্থিতি স্বাভাবিক ছিল; তার চোখে সমবেদনা, হাতে শান্তি। আমি জানাজায় গিয়ে নানাকে দেখি নিরবে লাইনে দাঁড়িয়ে। মরহুমের জন্য তার স্মৃতিচারণ শুনতে শুনতে মনে হতো, তিনি কি সত্যিই আর আমাদের সঙ্গে নেই?
বাঘারপাড়ার চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে নানার নির্মোহ রূপ দেখতাম। জাত-পাত ভুলে, মানুষের ভেদাভেদ ভুলে, যেকোনো সাধারণ মানুষকে কাছে ডেকে আদর করতেন। কতটা নিরহংকার হতে হয়, তা নানার চোখে না দেখলে বোঝা যেত না। প্রতিদিন রাত নয়টার দিকে নজরুল কাকার ওষুধের দোকানে দেখা হতো, যেখানে তিনি নানা বিষয়ে কথা বলতেন, কখনও আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
স্মৃতিগুলো আজ ভিড় করে আসে। কয়েক মাস আগে তপু ভাই যখন মারা গেলেন, জানাজা শেষে নানা কিছুক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন। রাতে ফোনে বহু কথা বললেন, কখনও কৌতুক, কখনও পরামর্শ। নানার সেই চেনা কণ্ঠস্বর এখন শুধু স্মৃতি। কিছুদিন আগে আমাকে ডেকে চলমান অনিয়ম নিয়ে লিখতে বলেছিলেন; কলম হাতে নেওয়ার আগেই তিনি চলে গেলেন। সেই লেখাটা আর লেখা হলো না, কিন্তু তার আদর্শ চিরন্তন হয়ে হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
আজ জুমার আগে স্বর্ণপট্টিতে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম; অবধারিতভাবেই নানার প্রসঙ্গ উঠলো। চোখেমুখে ছিল হারানোর বেদনা। কেউ বললেন, অন্তত আমাদের পাড়ায় চেয়ারম্যান ঠ্যাক না দিলে আমরা টিকে থাকতে পারতাম না।
একজন নেতার জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? বাঘারপাড়ার মাটি ও মানুষ তার অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বকে চিরকাল মিস করবে।
কোথায় গেলে পাব তারে, আমার মনের মানুষ তাহের নানাকে? যিনি বিপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলতেন—"আমি আছি।" মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই নেতা চিরদিনের জন্য পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। বাঘারপাড়ার আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হবে না। দোয়া করি, মহান আল্লাহ তায়ালা নানাকে জান্নাতবাসী করুন এবং পরকালের জীবন আলোকিত করুন। ওপারে ভালো থাকুন, আমাদের প্রিয় নানা, চিরস্মরণীয় হোন।