তহীদ মনি
❒ সন্তান কোথায় থাকে জানে মায়ের মন। ছবি: - সংগৃহীত
‘সন্তান যেথায় থাকে যেমন
ভালো মন্দ কিছু হলে পরে
জানে মায়ের মন
বাঁধা আছে রক্তের ডোরে
খবর মিলায় বিনা তারে’
মানুষের মন কি আগাম কোনো সংকেত পায়? নাকি নাড়ির টান এমন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, যা মৃত্যুপরবর্তী বিচ্ছেদেও ছিন্ন হয় না? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. সিবগাত উল্লাহর দেওয়া একটি তথ্য এই প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। তিনি এক শহীদ মায়ের যে উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন, তা কেবল একটি ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট নয়, বরং মা ও সন্তানের শাশ্বত সম্পর্কের এক অলৌকিক দলিল।
সিআইডি প্রধান জানান, জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে নিখোঁজ হওয়া এক সন্তানের খোঁজে তার মা নিয়মিত সিআইডি কার্যালয়ে আসতেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বুকফাটা হাহাকার নিয়ে তিনি সিআইডি অফিসের কাছের রায়েরবাজার বধ্যভূমি এলাকার একটি নির্দিষ্ট গাছের নিচে গিয়ে বসে থাকতেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্লান্ত দুপুরে কেন ওই গাছটিকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা কারো কাছে ছিল না। হয়তো মা নিজেও জানতেন না, কেন বারবার তার পা ওই মাটির দিকেই টেনে নিয়ে যায়।
কিন্তু সত্য যখন উন্মোচিত হলো, তখন পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় সিআইডি প্রধান এক আবেগঘন মুহূর্তে জানান, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে অবশেষে সেই শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায়, ওই মা যে গাছের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে তার নিখোঁজ সন্তানের জন্য চোখের জল ফেলতেন, ঠিক সেই মাটির নিচেই তার সন্তানকে 'বেওয়ারিশ' হিসেবে দাফন করা হয়েছিল।
মা জানতেন না তার কলিজার টুকরো ওই মাটির নিচেই মিশে আছে। কিন্তু সম্ভবত ঘাতকের বুলেট আর বেনামি কবরের অন্ধকার ভেদ করে শহীদ সন্তানের আত্মা তার মাকে ঠিকই ডেকে এনেছিল নিজের কবরের শিয়রে। মা আর সন্তানের এই অদৃশ্য পুনর্মিলনের কথা শুনে উপস্থিত সবাই সেদিন অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। বিজ্ঞান যেখানে ডিএনএ-র মাধ্যমে পরিচয় খুঁজে পায়, সেখানে মায়ের মমতা সম্ভবত আগেই খুঁজে নিয়েছিল সন্তানের শেষ শয্যা।
এই ঘটনাটি কেবল একটি লাশের পরিচয় শনাক্তকরণ নয়; এটি জুলাই বিপ্লবে আমাদের অগণিত শহীদের পরিবারের ত্যাগের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বেওয়ারিশ লাশের মিছিলে মিশে যাওয়া প্রতিটি প্রাণের একেকটি নাম আছে, পরিচয় আছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দেওয়া এই প্রতিবেদনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি বেওয়ারিশ কবরের নিচে শুয়ে থাকা মানুষটি কারো না কারো সন্তান ছিল।
রায়েরবাজারের সেই নির্দিষ্ট গাছের তলে আজ একটি নামফলক বসেছে, কিন্তু ওই মায়ের বুকের ভেতর যে শূন্যতার অরণ্য তৈরি হয়েছে, তা কি কখনো শান্ত হবে? রাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই ভুলে না যায় এই আত্মত্যাগের ইতিহাস। রক্তের টানে মা ঠিকই তার সন্তানকে খুঁজে নিয়েছেন, এখন এই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক