❒ অন্ধকার সময়ের ধ্রুবতারা
তহীদ মনি
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনালগ্ন ছিল বাংলার মুসলিম সমাজের জন্য এক চরম সংকটের কাল। শিক্ষা, আত্মপরিচয়, ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে মুসলমানরা তখন বিভ্রান্ত ও পর্যুদস্ত। সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে যে কজন মনীষী আলোকবর্তিকা হাতে সমাজকে অন্ধকারের গহ্বর থেকে টেনে তুলেছিলেন, মুন্সি মেহের উল্লাহ (১৮৬১–১৯০৭) তাঁদের অন্যতম। ১৮৬১ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করা এই মনীষী মাত্র ৪৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে যে কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেছেন, তা আজও আমাদের জাতীয় জীবনে বিস্ময়কর ও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
স্বল্প প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন স্বশিক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর রচনাশৈলী, বাগ্মিতা এবং যুক্তিনির্ভর জীবনদর্শন আজও গবেষকদের খোরাক যোগায়। প্রায় আড়াইশ বছর পর এসে প্রশ্ন জাগতে পারে—কেন আজ আমরা মুন্সি মেহের উল্লাহকে জানব? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর সংগ্রাম এবং আধুনিক মননশীলতার গভীরে।
ধর্মীয় বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর সংগ্রাম মুন্সি মেহের উল্লাহর সময়ে বাংলায় খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রবল কর্মকাণ্ড স্থানীয় দরিদ্র ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাচ্ছিল। ধর্মীয় অজ্ঞতাকে পুঁজি করে তখন ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হতো। মুন্সি মেহের উল্লাহ সেই সংকটে আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তি ও শাস্ত্রীয় জ্ঞান দিয়ে লড়াই শুরু করেন। হাট-বাজার ও গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি ইসলামের মাহাত্ম্য প্রচার করতেন এবং কবিতা ও ছন্দের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের জবাব দিতেন। ১৮৯১ সালে পিরোজপুরে তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক ‘বাহাস’ বা বিতর্কযুদ্ধে তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের পরাজিত করেছিলেন, যার বিবরণ তাঁর ‘খ্রিস্টান-মুসলমানে তর্কযুদ্ধ’ পুস্তিকায় অম্লান হয়ে আছে।
ইসলাম প্রচারে মেহের উল্লাহর দ্বিতীয় শক্তিশালী মাধ্যম ছিল লেখালেখি। তিনি ১২টি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাইবেল ও কোরআন তুলনামূলক বিচার’ কেবল একটি ধর্মীয় পুস্তক নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন মুসলিম সমাজের আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক দলিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কলম তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী। তাঁর প্রচেষ্টায় জন জমিরুদ্দীনের মতো বহু শিক্ষিত মানুষ বিভ্রান্তি কাটিয়ে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসেন এবং ‘মুন্সি জমিরুদ্দীন’ নাম ধারণ করেন।
অনেকে মুন্সি মেহের উল্লাহকে কেবল একজন ‘ধর্মীয় বিতার্কিক’ মনে করেন। কিন্তু ড. আনিসুজ্জামানের বিশ্লেষণে ফুটে ওঠে তাঁর অন্য এক রূপ। মেহের উল্লাহ কেবল ইসলামকে রক্ষা করতে চাননি, বরং প্রচলিত ধর্মজীবনের সংস্কারও তাঁর কাম্য ছিল। সৈয়দ আহমদ বেরিলভীর সংস্কার আন্দোলন তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। আবার তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নীরব প্রবক্তা। তাঁর বিতর্ক ছিল মতবাদের বিরুদ্ধে, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। তিনি কখনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে আক্রমণ করেননি; বরং যুক্তির মোকাবিলা করেছেন যুক্তি দিয়ে। তাঁর শালীন ভাষা ও সত্য অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি আজকের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার যুগেও এক মহান শিক্ষা।
শিক্ষা ও জ্ঞান মুন্সি মেহের উল্লাহ কোনো অভিজাত শহুরে পটভূমি থেকে আসেননি। যশোরের এক অতিসাধারণ পরিবারে বড় হয়েও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বে। ১৮৯১ সালে রাজশাহীর প্রখ্যাত লেখক মির্জা ইউসুফ আলী তাঁর ‘দুগ্ধ সরোবর’ গ্রন্থে মেহের উল্লাহকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন—যা তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের স্বীকৃতির প্রমাণ দেয়। এমনকি তাঁর কর্ম নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি থিসিসও সম্পন্ন হয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক যে, আমাদের পাঠ্যপুস্তক ও মূলধারার আলোচনায় এই মহান মনীষীর নাম তেমন একটা উঠে আসে না।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক মৌ ব্যানার্জি তাঁর এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, মেহের উল্লাহর মৃত্যুতে শোকের ঢেউ যশোর থেকে ঢাকা ও কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন প্রখ্যাত পত্রিকা ‘মিহির ও সুধাকর’ লিখেছিল—বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নতুন জীবন সঞ্চারকারী এই মহাপুরুষের কণ্ঠ শুনে খ্রিস্টান পাদ্রিরা পর্যন্ত কম্পিত হতেন। অন্যদিকে প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক আব্দুল হাই তাঁকে বাংলার মুসলিম সমাজের জন্য ‘রামমোহন রায়’-এর মতো এক প্রতিরক্ষাকারী মনীষী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের বন্যার মাঝেও অপতথ্য ও বিভ্রান্তির স্রোত বইছে। ধর্ম ও পরিচয় নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা যখন পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে, তখন মেহের উল্লাহর শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং যাচাই করা জ্ঞানই মুক্তির পথ। মুন্সি মেহের উল্লাহ কেবল অতীতের মানুষ নন, তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা। ইতিহাস বিস্মৃতির বিরুদ্ধে সতর্ক হয়ে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে এই ‘বঙ্গবন্ধু’কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক