ছবি: সংগৃহীত
কিছু মানুষকে মশা যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। তাদের শরীর থেকে এমন এক ধরনের রাসায়নিক মিশ্রণ ছড়ায়, যা মশাকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং কামড়াতে প্রলুব্ধ করে।
নিউইয়র্কের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, যেসব মানুষের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাসিডের মাত্রা বেশি, তারা স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার কাছে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি আকর্ষণীয়। এই মশাই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হলুদ জ্বর ও জিকার মতো রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী।
২০২২ সালে 'সেল' সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণার ফলাফল থেকে এমন কিছু নতুন পণ্য তৈরির পথ খুলতে পারে, যা মানুষের শরীরের নির্দিষ্ট গন্ধকে ঢেকে দিতে বা পরিবর্তন করতে পারবে। এর ফলে মশার জন্য মানুষের রক্ত খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং সম্ভাব্যভাবে রোগের বিস্তারও কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মশার কামড় এবং অন্যান্য সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ানো রোগে প্রতিবছর সাত লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। আর বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় এসব রোগের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এমনটাই বলেছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ও মশাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেফ রিফেল, যিনি রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
এডিস ইজিপ্টাই মশা সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা উপক্রান্তীয় জলবায়ুতে বসবাস করে বলে পরিচিত। তবে এখন ওয়াশিংটন ডিসি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বেশির ভাগ এলাকায় এই মশা সারা বছরই বংশবিস্তার করছে।
হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ওই গবেষণার প্রধান গবেষক লেসলি ভোশাল ২০২২ সালে বলেছিলেন, শুধু শ্বাস নেওয়ার মাধ্যমেই আমরা মশাকে জানিয়ে দিই যে আমরা সেখানে আছি।
স্ত্রী মশা রক্ত খাওয়ার জন্য কামড়ানোর উপযোগী করে তৈরি হয়েছে। কারণ রক্ত না পেলে তাদের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া সম্ভব হয় না।
ভোশাল বলেন, 'এটিকে একটি বড় প্রোটিন পানীয়ের মতো ভাবুন। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এটি মশাকে তার নিজের শরীরের ওজনের তুলনায় ১৫০ পাউন্ড খাবারের সমপরিমাণ গ্রহণ করতে দেয় এবং পরে সেটি ব্যবহার করে ডিম উৎপাদন করে।'
কীভাবে মশা থেকে দূরে থাকবেন এবং এসব বিরক্তিকর পোকামাকড় মোকাবিলার আরও কিছু উপায়
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষ গর্ভবতী হলে, কয়েক গ্লাস বিয়ার পান করার পর এমনকি কিছু নির্দিষ্ট সাবান ব্যবহার করলেও মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে মশা মানুষের শরীরের কোন কোন গন্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে যার গবেষণাগার, সেই ভোশাল জানতে চেয়েছিলেন, কেন এডিস ইজিপ্টাই মশার কাছে কিছু মানুষের শরীরের গন্ধ অন্যদের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।
সৌভাগ্যবশত, এই পরীক্ষা চালানোর জন্য কাউকে মশায় ভরা কোনো কক্ষে বসে থাকতে হয়নি।
এর পরিবর্তে, গবেষকেরা মানুষের ত্বকের স্বাভাবিক গন্ধ সংগ্রহ করেন। এ জন্য গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বাহুতে নাইলনের মোজা পরিয়ে রাখা হয়েছিল।
এরপর গবেষকেরা ওই মোজাগুলোকে প্রায় দুই ইঞ্চি আকারের টুকরো করে কেটে নেন এবং স্বচ্ছ প্লাস্টিকের একটি বাক্সের ভেতরে থাকা দুটি আলাদা ফাঁদদরজার পেছনে কাপড়ের দুটি টুকরো রাখেন। বাক্সটির ভেতরে তখন কয়েক ডজন মশা উড়ছিল।
এরপর গবেষকেরা ফাঁদদরজা খুলে দেন। মশাগুলো প্রথম দরজার পেছনে থাকা কাপড়ের টুকরোটির দিকে যাবে, নাকি দ্বিতীয় দরজার পেছনে থাকা টুকরোটির দিকে যাবে—সেটিই ছিল পরীক্ষার বিষয়।
ভোশাল বলেন, গবেষকেরা এক ধরনের পর্যায়ক্রমিক প্রতিযোগিতার মতো করে পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন। একটি নির্দিষ্ট নমুনার প্রতি যতবার কোনো মশা আকৃষ্ট হয়েছে, তা তারা গণনা করেন। বিষয়টি অনেকটা বাস্কেটবল খেলায় পয়েন্ট গণনার মতো।
নমুনাগুলোর মধ্যে '৩৩ নম্বর ব্যক্তি' হিসেবে চিহ্নিত একটি নমুনা মশার সবচেয়ে বেশি পছন্দের হয়ে ওঠে।
ভোশাল বলেন, '৩৩ নম্বর ব্যক্তি ১০০টি খেলায় জিতেছিলেন। তিনি একেবারেই অপরাজিত ছিলেন। কেউ তাকে হারাতে পারেনি।'
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৩ নম্বর ব্যক্তির মতো যেসব মানুষের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড নামের রাসায়নিক যৌগের মাত্রা বেশি, তারা মশার কাছে 'চুম্বকের মতো' বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন।
সব মানুষের ত্বকেই তৈলাক্ত আবরণ বা সিবামের মাধ্যমে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড তৈরি হয়।
এরপর আমাদের ত্বকে বসবাসকারী লাখ লাখ উপকারী অণুজীব এই সিবাম খায় এবং এর মাধ্যমে আরও বেশি কার্বক্সিলিক অ্যাসিড তৈরি হয়।
ভোশাল বলেন, অতিরিক্ত পরিমাণে এই অ্যাসিড ত্বকে এমন এক ধরনের গন্ধ তৈরি করতে পারে, যা পনির বা দুর্গন্ধযুক্ত পায়ের মতো গন্ধের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
আর এই গন্ধই মানুষের রক্তের সন্ধানে থাকা স্ত্রী মশাকে আকৃষ্ট করে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গবেষণায় ব্যবহৃত নাইলনের মোজাগুলো আসলে ঘামের গন্ধযুক্ত ছিল না, বলে জানান ভোশাল।
মশা মানুষের শরীরের গন্ধ শনাক্ত করতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর সুগন্ধি বা কোলোন ব্যবহার করেও সেই গন্ধ পুরোপুরি ঢেকে রাখা যায় না।
তিন বছর ধরে এই পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, ওই সময়ের মধ্যে একই ব্যক্তিরা মশার কাছে আকর্ষণীয়ই থেকে গেছেন—তারা সেদিন কী খেয়েছেন বা তাদের ব্যবহৃত শ্যাম্পু পরিবর্তন করেছেন কি না, তাতে কোনো পার্থক্য হয়নি।
ভোশাল বলেন, 'আজ যদি আপনাকে মশা চম্বকের মতো আকর্ষণ করে, তাহলে তিন বছর পরও আপনি মশাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করবে।'
মশা যেভাবে আপনার শরীরের রাসায়নিক গঠন ব্যবহার করে আপনাকেই পরবর্তী খাবার হিসেবে বেছে নেয়
গবেষণাটি অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি যে, কেন কিছু মানুষের ত্বকে অন্যদের তুলনায় বেশি কার্বক্সিলিক অ্যাসিড থাকে।
তবে ভোশাল বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির ত্বকে থাকা অণুজীবের গঠন স্বতন্ত্র।
ভোশাল বলেন, 'প্রত্যেক মানুষের ত্বকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ব্যাকটেরিয়ার সম্প্রদায় বসবাস করে। আমরা যে মশার প্রতি আকর্ষণের পার্থক্য দেখছি, তার কিছু অংশ হয়তো কেবল বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্যের কারণে।'
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এল জে জুইবলও এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, গবেষণায় কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের ভূমিকা স্পষ্টভাবে উঠে এলেও মশাকে আকৃষ্ট করার জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ দায়ী নয়।
তার মতে, এটি সম্ভবত বিভিন্ন উপাদানের একটি 'মিশ্রণ', যা মশাকে মানুষের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে গিয়ে কামড়ানোর সংকেত দেয়।
জুইবল বলেন, 'মশা বিভিন্ন ধরনের সংকেত ব্যবহার করে এমন একটি বহু-পদ্ধতিসম্পন্ন চুম্বকের মতো।'
তিনি বলেন, কার্বক্সিলিক অ্যাসিড 'গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান', তবে এটিই একমাত্র উপাদান নয়।
গত বছর 'নেচার' সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, মানুষকে খুঁজে বের করার জন্য মশা অবলোহিত বিকিরণও ব্যবহার করে।
যারা মশার কামড় এড়াতে চান, তাদের জন্য জুইবলের পরামর্শ হলো গোসল করা। এতে ত্বকে থাকা 'এসব আকর্ষণীয় রাসায়নিক যৌগ' কমিয়ে আনা যায়।
বিশেষ করে পায়ের চারপাশে থাকা এসব যৌগ কমানো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে 'বিশেষ ধরনের গন্ধ' থাকে।
এ ছাড়া বাড়িতেও মশা দূরে রাখার জন্য কিছু পরিবর্তন আনা যায়—যেমন বাইরে কোন ধরনের গাছ লাগানো হবে, তা বেছে নেওয়া। পাশাপাশি এমন কিছু মশা প্রতিরোধক ও যন্ত্র রয়েছে, যেগুলোও সত্যিই কাজে আসে।
ভোশাল বলেন, ভবিষ্যতের গবেষণার মূল লক্ষ্য হতে পারে ত্বক থেকে উৎপন্ন গন্ধ এবং সম্ভবত ত্বকে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রমকে কীভাবে 'পরিবর্তন' করা যায়, তা বের করা।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা এমন একটি ত্বকে ব্যবহারের উপযোগী উপকারী ব্যাকটেরিয়াযুক্ত ক্রিম তৈরি করতে পারেন, যা নির্দিষ্ট কিছু উপজাত পদার্থের উৎপাদন বা মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে।
এর ফলে একজন মানুষ মশার কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন।
ভোশাল বলেন, 'কী কারণে কিছু মানুষ মশার কাছে চুম্বকের মতো হয়ে ওঠেন, তা বুঝতে পারলেই কেবল আমরা সেটি বন্ধ করার উপায় নিয়ে ভাবতে শুরু করতে পারব।'