শারমিন শিউলী
ছবি: এআই প্রণীত
আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের পকেটে পকেটে ঘুরছে ইন্টারনেটের অসীম তথ্যের ভাণ্ডার। সামান্য মানসিক বা শারীরিক অস্বস্তি হলেই কয়েকটা শব্দ লিখে সার্চ দেওয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজের মনের কথা তুলে ধরা এখন নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। স্ক্রিনে ফুটে ওঠা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা সহজেই ধরে নিই—আমাদের নির্দিষ্ট কোনো মানসিক ব্যাধি রয়েছে। এতে সাময়িক একটা স্বস্তি হয়তো মেলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি আমাদের এক জটিল সামাজিক ও মানসিক বিভ্রান্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবসময়ই দুটি চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। একদল মানুষ মানসিক সমস্যাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন; এটাকে ‘স্রেফ নাটক’, ‘মনোযোগ আকর্ষণের ধান্দা’ কিংবা ‘জিন-ভূতের আছড়’ বলে উড়িয়ে দেন। অন্যদল আবার সামান্য মন খারাপ বা গুছিয়ে চলার অভ্যাসকেও জটিল কোনো রোগের তকমা দিয়ে বসেন। এই দুই ভাবনার মাঝখানে পড়ে আসল চিকিৎসা ব্যবস্থার বারোটা বাজছে।
বাঙালি স্বভাবগতভাবেই আধো-অভিজ্ঞতায় সব বিষয়ে ‘ডাক্তারি’ করতে পছন্দ করে। শরীরের রোগ হলে যেমন অ্যান্টিবায়োটিক নিজের মনমতো খেয়ে ফেলা অভ্যাস, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সেই একই ছাঁচ কাজ করছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ, আর ভারতেও এটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া এই মানসিক সংকটের যুগে আমাদের সাধারণ ধারণা আর বৈজ্ঞানিক সত্যের ফারাকটা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
আমাদের সাধারণ ধারণা আর বৈজ্ঞানিক ধারণাটা আসলে কতটা আলাদা। কিছু ভুল ধারণা ভাঙা যাক।
ওসিডি কোনো ফ্যাশন নয়
দেশে ওসিডির লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। অতিরিক্ত শুচিতাবায়ু (যেমন: বারবার হাত ধোয়া বা ওজু করা) এবং ধর্মীয় ধন্দ বা কুচিন্তার আকারে প্রকাশ পায় ওসিডি। একটু গুছিয়ে থাকা বা জিনিসপত্র সারিবদ্ধ রাখা মানুষ নিজেকে ফ্যাশনেবলভাবে ‘সো ওসিডি’ বলে দাবি করেন। অনেকে আবার ভেবে বসেন, পরিচ্ছন্নতাই ওসিডির একমাত্র রূপ।
আন্তর্জাতিক ওসিডি ফাউন্ডেশন বলছে ওসিডি কোনো শখ বা সৌন্দর্যচেতনা নয়। এটি মস্তিষ্কে চেপে বসা এমন এক অনিচ্ছাকৃত ভীতিকর চিন্তা। যেমন: ‘হাত না ধুলে বাজে রোগ হবে।‘ এ আতঙ্ক থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে মানুষ যন্ত্রণাদায়ক কিছু নিয়ম তারা বারবার পালন করতে বাধ্য হন। এটি মানসিক স্বস্তির নয়, বরং গভীর যন্ত্রণার শিকার করে।
পজিটিভ ভাবনায় ডিপ্রেশন যায় না
এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বিস্তার লাভ করা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির একটি। বিষণ্নতা ও জীবনের প্রতি চরম হতাশা থেকে তরুণদের মাঝে আত্মহত্যার হার বাড়ছে। সমাজ মনে করে, ‘মন খারাপ থাকাটাই ডিপ্রেশন’। এটাকে মানুষের ‘মানসিক দুর্বলতা’ বা ‘নাটক’ বলেও অনেকে উপহাস করেন। অনেকে উপদেশ দেন, একটু ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে বা কাজে ব্যস্ত থাকলেই হবে।
না। হার্ভার্ট হেলথের গবেষণা অন্তত তা বলছে না। সাধারণ মন খারাপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে এবং কিছুদিন পর তা কেটে যায়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন কোনো কারণ ছাড়াই আসতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকে। এটি নিউরো-কেমিক্যাল অসঙ্গতি। ভাঙা পা নিয়ে যেমন দৌড়ানো যায় না, তেমনি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেই ‘পজিটিভ’ চিন্তা করে সুস্থ হতে পারেন না; এর জন্য বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
এডিএইচডি মানেই অমনোযোগী নয়
দেশে অসংখ্য শিশু এবং তরুণ বয়সের মানুষ এডিএইচডিতে আক্রান্ত। কিন্তু সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে তাদের কেবল ‘দুষ্টু’, ‘পড়াশোনায় ফাঁকিবাজ’ বা ‘বেয়াদব’ তকমা দিয়ে শাস্তি দেয়া হয়। অনেকে ভাবেন চঞ্চলতা কমে গেলেই বা বয়স বাড়লেই বুঝি এডিএইচডি ভালো হয়ে যায়। অনেকে ভাবেন এটি নিছক অমনোযোগের অভ্যাস।
কিন্তু এটি কোনো স্বভাবের ত্রুটি নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বৈচিত্র্য। এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশন (এডিডিএ) এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, মস্তিষ্কে মনোযোগের তথ্য প্রক্রিয়া করার পদ্ধতি এখানে ভিন্ন থাকে। বয়সের সাথে এটি চলে যায় না, বরং বড়দের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সময়সীমা মানতে না পারা বা কাজের মধ্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে থেকে যায়।
সিজোফ্রেনিয়া ভূতের আছড় নয়
বাংলাদেশে সিজোফ্রেনিয়ার প্রাদুর্ভাব চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। অসচেতনতার কারণে গ্রাম কিংবা শহরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কবিরাজ বা পীর-ফকিরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঝাড়ফুঁক করা হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা, সিজোফ্রেনিয়া মানেই ‘জিন বা ভূতের আছড়’, ব্যক্তিটি জাদুটোনা দ্বারা আক্রান্ত কিংবা এরা অত্যন্ত হিংস্র ও বিপজ্জনক পাগল। আবার অনেকে এটাকে ‘দ্বৈত ব্যক্তিত্ব’ ভাবেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটি নিয়ে সতর্কতা বাড়িয়েছে। তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে বলেছে, এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল জৈবিক অবস্থা, যা বাস্তবতার স্নায়বিক সংযোগকে গুলিয়ে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে কাল্পনিক শব্দ শোনেন বা ছায়া দেখেন, তা তাদের মস্তিষ্কে হুবহু সত্য হিসেবে অনুভূত হয়। উপযুক্ত ওষুধ ও থেরাপিতে এই রোগের লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তারা বিপজ্জনক নন, বরং সমাজের ভুল ধারণার কারণে নিজেরা সহিংসতার শিকার হন বেশি।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে অহংকার ভাবা যাবে না
সামাজিক অনুষ্ঠান বা মানুষের সামনে কথা বলতে না পারাটাকে কেবল "লজ্জাবতী স্বভাব" বা "অহংকার" হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি ভাব মারছেন বা অহংকারী বলে ধরে নেন। তাদের বলে একটু স্বাভাবিক বা নরমাল হয়ে সবার সাথে মিশতে!
কিন্তু এটি কোনো লাজুকতা নয়। এটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেয়া আতঙ্কের অবস্থা। ব্যক্তিটির মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দিতে থাকে যে, "সবাই তাকেই দেখছে, হীন চোখে বিচার করছে এবং সে লজ্জা পেতে যাচ্ছে"। কেবল সাহসের ঝোঁকে এই আতঙ্ক দূর করা যায় না।
এসএসডি বা সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার ঢঙ নয়
হাসপাতালে এমন অনেক রোগী পাওয়া যায় যারা বুক জ্বালা, তীব্র শরীর ব্যথা, বা অবশ ভাবের অভিযোগ নিয়ে দিনের পর দিন এক ডাক্তার থেকে অন্য ডাক্তারের কাছে ছোটেন, কিন্তু সকল টেস্ট রিপোর্ট "নরমাল" আসে। পরিবার ও স্বজনরা মনে করেন রোগী "ঢং করছেন", "সস্তা মনোযোগ পাওয়ার ধান্দা করছেন" কিংবা রোগের ভান ধরছেন।
আসলে এই রোগীদের শারীরিক কষ্ট বা যন্ত্রণা শতভাগ সত্য। মস্তিষ্কে জমে থাকা মানসিক চাপ, অবদমিত ট্রমা বা দুশ্চিন্তা যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে শারীরিক ব্যথায় পরিণত হয়, তখন তাকে সোমাটিক সিম্পটম বলা হয়। তারা অভিনয় করছেন না, তাদের মস্তিষ্কের সংকেত ভুল পথে প্রবাহিত হয়ে ব্যথা তৈরি করছে।
বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার স্বার্থপরতা নয়
দেশে যাদের সম্পর্কে ঘন ঘন আবেগীয় নাটকীয়তা দেখা যায়, তাদেরকে সমাজ "বিনা কারণে ঝগড়াটে", স্বার্থপর" বা "মানসিক অস্থির" বলে ছুড়ে ফেলে দেয়। ইমপালসিভ বা প্রচণ্ড রাগী ও ঝগড়াটে ট্যাগ নারীদের মধ্যে বেশি। আর অনেক পুরুষের মধ্যেও তা ভয়াবহ। অনেকে এখন ফেসবুকে আবেগীয় স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তার আচরণ ও বাস্তব ব্যক্তিত্ব উলটো। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ যারা এমন লোকের ঘনিষ্ঠ তারা ভাবেন ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অনেকে এমন নাটক করে।
বাস্তবে এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার একটি ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো 'পরিত্যক্ত হওয়ার তীব্র ভয়'। কাছের মানুষের সামান্য কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনও তাদের মনে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। অতিরিক্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশের পর তারা নিজেরাও প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগেন।
ভুল ধারণাগুলো থাকবেই। তবে এগুলোকে একেবারে ফেলনা না করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় নিয়মিত কাউন্সিলরের কাছে যাওয়া। সেটা আপনার প্রয়োজন আছে কি নেই এসব পরের ভাবনা।