❒ আজ বন্ধু দিবস
নজরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত
জীবনের দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা পথচলায় এমন কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা কোনো রক্ত বা পারিবারিক সূত্রে বাঁধা নয়; অথচ তাদের উপস্থিতিতেই পুরো জীবনটা হয়ে ওঠে সহজ, আলোকময় ও সুন্দর। তেমনই এক নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম সম্পর্কের নাম ‘বন্ধুত্ব’। সময়ের আবর্তে ক্যালেন্ডারের পাতায় নানা আয়োজন আসে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস অন্যতম। মূলত প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার বিশ্বজুড়ে দিনটি উদযাপিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য—কাজের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতার ভিড়েও অকৃত্রিম সম্পর্কের মূল্য মনে করিয়ে দেওয়া।
তবে আধুনিক সময়ে সেই সম্পর্কের গভীরতায় যেন কিছুটা ভাটা পড়েছে। তথাকথিত ডিজিটাল বিপ্লব আমাদের প্রযুক্তির সংযোগ বাড়ালেও মনের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। একসময় বন্ধুত্বের ক্যানভাস ছিল বিকেলের ধুলোবালি মাখা খেলাধুলো, স্কুলের টিফিনবক্স ভাগাভাগি কিংবা হাতে লেখা চিঠির আদান-প্রদান। যুগের হাওয়ায় সেই ক্যানভাসে এসেছে প্রযুক্তির যান্ত্রিকতা। চিঠির জায়গা নিয়েছে মেসেঞ্জারের যান্ত্রিক ইনবক্স, আর বিকেলের খোলা মাঠের আড্ডা স্থানান্তরিত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট ও রিঅ্যাকশনে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম আমাদের হাজারো মানুষের সাথে যুক্ত করলেও দিনশেষে বাড়িয়ে দিচ্ছে একাকীত্ব। কৃত্রিম এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’ থাকলেও বিপদে-আপদে কিংবা মনের গভীর কষ্টের দিনে পাশে পাওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা বড্ড কম। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসিমুখে তুলে ধরা ছবি আর কৃত্রিম শুভেচ্ছা বার্তার পেছনে ঢেকে যাচ্ছে বন্ধুত্বের আসল প্রাণ—যেখানে ছিল কোনো শর্ত ছাড়া একে অপরকে বুঝে নেওয়ার স্বতস্ফূর্ততা।
বয়সের সাথে সাথে জীবনের দায়িত্ব বাড়ে, আর সেই সাথে প্রযুক্তি আমাদের আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও ব্যস্ত করে তোলে। ইমোটিকন বা টেক্সট মেসেজে প্রকাশ করা অনুভূতি কখনো সামনাসামনি বসে চোখের ভাষায় কথা বলার বিকল্প হতে পারে না। ফলে একসময়ের প্রগাঢ় বন্ধনগুলোও আজ কেবল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নোটিফিকেশনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বন্ধু দিবস উপলক্ষ্যে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করা বা একটা রিঅ্যাকশন দেওয়া বন্ধুত্বের গভীরতা প্রমাণ করে না। স্ক্রিনের কৃত্রিম উজ্জ্বলতা ছেড়ে আবার যদি আমরা মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াতে না পারি, তবে এই ডিজিটাল কোলাহলে বন্ধুত্বের সত্যিকারের উষ্ণতা চিরতরে হারিয়ে যাবে। যান্ত্রিকতার এই বলয় ভেঙে পুরোনো বন্ধুকে একটু সময় দেওয়া আর আন্তরিকতার সাথে হাতটা ধরে রাখাই হতে পারে এই ম্লান হয়ে আসা সম্পর্কগুলোকে পুনর্জীবিত করার একমাত্র উপায়।