Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

অপূর্ণ স্বপ্নের ‘ভুতুড়ে হাসপাতাল’

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই,২০২৬, ১০:৩৩ এ এম
অপূর্ণ স্বপ্নের ‘ভুতুড়ে হাসপাতাল’

একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন ঢাকা পড়েছে ঝোপঝাড়ে ছবি: সংগৃহীত

সুপরিকল্পনায় নির্মিত হাসপাতাল কমপ্লেক্স, যেখানে শুধু বহুতল হাসপাতাল ভবন নয়, রয়েছে চিকিৎসকদের আবাসন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা, একটি মসজিদ, একটি পুকুর এবং আরও কয়েকটি সহায়ক ভবন। কিন্তু কোনো রোগী এখানে চিকিৎসা নেয়নি। কোনো ডাক্তার এখানে রোগী দেখেনি। হয়নি কখনো অপারেশন। ৪০ বছর ধরে পড়ে আছে নির্মাণাধীন এই হাসপাতাল কমপ্লেক্স। ধামরাই এলাকার বাসিন্দারা যার নাম দিয়েছে ‘ভুতুড়ে হাসপাতাল’।

১৯৮৫ সালে প্রায় ১৬ একর জমির ওপর ইউনুস খান ক্যানসার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঢাকার ধামরাই উপজেলার এক প্রান্তে, চৌহাট ইউনিয়নের রাজাপুর ও পাইকপাড়া গ্রামের মাঝামাঝি বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের মাঝখান থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এই কংক্রিটের স্থাপনা। শান্ত গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশে এত বড় একটি আয়োজন যেন একেবারেই বেমানান। দূর থেকে এর অবয়ব দেখলে মনে হয়, এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে অ্যাম্বুলেন্সের ছুটে আসা-যাওয়া, চিকিৎসকদের ব্যস্ততা এবং জরুরি বিভাগের বাইরে উদ্বিগ্ন স্বজনদের ভিড় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কয়েক দশক ধরে সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে পেছনের ইতিহাসে হারিয়ে গেছে।

মরিচা ধরা বিশালাকার ফটকের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা চারতলা ভবনগুলোর দেয়ালজুড়ে এখন চওড়া ফাটল। শ্যাওলার সবুজ আস্তরণে কংক্রিটের গায়ের রং বদলে গেছে বহু আগেই। যেসব স্থানে একসময় মনোরম বাগান করার পরিকল্পনা ছিল, সেসব স্থান বুনো গাছপালায় ছেয়ে গেছে। হাসপাতালসংলগ্ন মসজিদ, মূল ভবনের বাইরের খোলা প্রাঙ্গণ এবং একসময়ের প্রশস্ত আঙিনা সবই এখন ঘন ঝোপঝাড়ের নিচে বিলীন। কৌতূহলী দর্শনার্থীদের চলাচলে তৈরি হওয়া সরু পথগুলো বুনো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে। চৌহাট ইউনিয়নের এই বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণটি এখন দেশের অন্যতম বড় অসমাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের করুণ স্মারক।

ভবনের ভেতরে পা রাখলেই অনুধাবন করা যায় এক বিষণ্ণ হাহাকার। যেসব কক্ষে আধুনিক চিকিৎসার শয্যা থাকার কথা ছিল, সেসব মেঝে এখন ধুলার পুরু স্তরে ঢেকে আছে। দীর্ঘ করিডোরগুলোতে জমে আছে ভৌতিক নীরবতা। অসমাপ্ত দেয়ালে চার দশক আগের প্লাস্টারের জীর্ণ চিহ্ন আজও স্পষ্ট, আর ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে চুইয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে ওয়ার্ডের রূপ পাওয়া কক্ষগুলো চোখে পড়ে, যা আদতে কখনো রোগীদের সেবায় ব্যবহৃত হতে পারেনি। এই কমপ্লেক্সের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয়, বহু আগের কারও এক বিস্মৃত স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষে এসে পড়েছেন। ছাদে দাঁড়ালে চারদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কৃষিজমি চোখে পড়ে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ধামরাই, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের হাজার হাজার মানুষ ঘরের কাছেই উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতেন। অথচ আজ এটি কেবলই একাকীত্বের মধ্যে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে; মেটে উঠছে মাদকাসক্তদের আড্ডা আর বিষধর সাপের বিষাক্ত ছায়ায়। ফলে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর এই প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে যাওয়ার সাহস খুব কম মানুষই পান।

গত আট বছর ধরে পুরো কমপ্লেক্সটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক মামুন জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভবনটির ক্ষয় ও জঙ্গল দ্রুত বেড়েছে। একটি প্রবেশপথের তালা খুলতে খুলতে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আমি যখন প্রথম এখানে আসি, তখন এতটা গাছপালায় ঢেকে যায়নি। মালিক বেঁচে থাকাকালে তখনো কাজ চলছিল। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর সবকিছুই থেমে যায়।" সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে এই কাজ শুরু হয়েছিল এবং উদ্যোক্তা নিজে তদারকি করায় কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সব গতি হারিয়ে যায়, যন্ত্রপাতি স্তব্ধ হয়ে পড়ে, শ্রমিকেরা চলে যান এবং অসমাপ্ত হাসপাতালটি সময়ের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়।

ক্যানসার আক্রান্ত বাবার স্মৃতিতে নির্মিত উদ্যোগ
এই মহা-উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল এক সন্তানের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা থেকে। উনিশশো আশির দশকের শুরুতে চৌহাট গ্রামের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের কর্ণধার ইউনুস খান ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তার ছেলে, শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবাল বাবাকে বাঁচাতে একের পর এক বিদেশি হাসপাতালে ছুটিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলোতে ইউনুস খান একটি আকুল ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন—বাংলাদেশের মানুষকে যেন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য বিদেশে দৌড়াতে না হয় বা বিপুল অর্থ ব্যয় করতে না হয়।

বাবার সেই শেষ ইচ্ছা পূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ইকবাল ১৯৮৫ সালে পরিবারের ১৬ একর পারিবারিক জমির ওপর হাসপাতালটির কাজ শুরু করেন। মূল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসকদের আবাসন, ছাত্রাবাস, মসজিদ, কর্মচারীদের আবাসন, পুকুর এবং একটি হেলিপ্যাড নির্মাণের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির দেখভালে থাকা ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে এখানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল।

নির্মাণকাজের প্রারম্ভিক সময়ের এক রাজমিস্ত্রি, স্থানীয় বাসিন্দা এরশাদ মিয়া বলেন, তিনি প্রায় ২৫ বছর আগে এখানে ছয় বছর প্লাস্টার ও গাঁথুনির কাজ করেছিলেন। তিনি স্মরণ করেন, "আমাদের বলা হয়েছিল, বিদেশ থেকে অতিথি ও প্রতিনিধিরা আসবেন, তাই বাইরের প্লাস্টার ও রূপ যেন নিখুঁত দেখায়, সে বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছিল। ভেতরের বেশির ভাগ কাজ শেষ করার প্রয়োজন তখন মনে করা হয়নি।" প্রকল্পের প্রবেশমুখে টিকে থাকা একটি জীর্ণ গোলাকার কংক্রিটের প্ল্যাটফর্মের দিকে ইশারা করে তিনি মুচকি হেসে বলেন, "আমাদের বলা হয়েছিল, এখানে নাকি হেলিকপ্টার নামবে।" তবে সেই অতিথি বা হেলিকপ্টার আর কখনো আসেনি। ২০১৭ সালে মূল উদ্যোক্তা খান মোহাম্মদ ইকবালের মৃত্যুর পর পুরো প্রকল্পের ইঞ্জিন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা ও বাঁচিয়ে তোলার আকুতি
আজ এই কমপ্লেক্সটি একটি স্থাপত্যগত বিস্ময় এবং একই সঙ্গে এক বিরাট অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীক। প্রতিদিন ধামরাই ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বহু ক্যানসার রোগীকে চিকিৎসার জন্য অমানুষিক কষ্ট ভোগ করে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে ছুটতে হয়। মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ধামরাইয়ের খালি পড়ে থাকা এই বিশাল ভবনের দিকে তাকিয়ে স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন জাগে—এই হাসপাতাল চালু হলে তাদের জীবনের চিত্র কতটা ভিন্ন হতে পারত!

চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রহিমা মিমা বলেন, "এই হাসপাতালটি চালু থাকলে ধামরাই, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের হাজার হাজার মানুষের ক্যানসার চিকিৎসার পথ সহজ হতো।" আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রাজন আহমেদ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, "প্রতিষ্ঠাতার উদ্দেশ্য ছিল জনসেবা। অবকাঠামোটি এভাবে নষ্ট না করে মানুষের কাজে লাগানোর জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।"

চার দশকের অবহেলার পরও ভবনগুলোর মূল কাঠামো এখনো বেশ মজবুত দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রধান ভবন, আবাসিক এলাকা ও মসজিদটি এখনো তাদের শক্ত ভিত্তির জানান দেয়। তবে কি এটি নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার যোগ্য?

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন জানিয়েছেন, হাসপাতালটি সচল করার বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ চৌধুরী জানান, সরকার বা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে মালিকপক্ষ সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। চার জেলার সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা ৩০০ কোটি টাকার এই অবকাঠামো কি শ্যাওলা আর লতাগুল্মের নিচেই চিরতরে হারিয়ে যাবে, নাকি পুনরুজ্জীবিত হয়ে কোনো দিন ক্যানসার রোগীদের আলোর দিশা দেখাবে—সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ধামরাইবাসী।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)