ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
কর্পোরেট সংস্কৃতি কিংবা প্রথাগত কর্মক্ষেত্র—যেখানেই তাকানো যাক না কেন, একটি অঘোষিত সত্য যেন প্রতিনিয়ত ভাস্বর হয়ে ওঠে: "কাজের চেয়ে চাটুকারিতার ধার বেশি।" সকালবেলা অফিসে ঢুকে বসের কাপে পছন্দের কফি এগিয়ে দেওয়া, বসের কোনো মাঝারি মানের কৌতুক শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়া, কিংবা কোনো অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সামনেও হাতজোড় করে "ঠিক বলেছেন স্যার" বলে মাথা নুইয়ে ফেলা—অনেকের কাছেই আজ এগুলো পদোন্নতির মূল চাবিকাঠি। অন্যদিকে, যে কর্মী দিনরাত ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে নিজের মেধার নির্যাসটুকু দিয়ে নিখুঁত কাজ জমা দিচ্ছেন, দিনশেষে মূল্যায়নের খাতায় তিনি হয়তো সেই তালিকার শেষ প্রান্তে।
এই বৈষম্য দেখে যেকোনো স্বাভিমানী কর্মীর মনেই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—আধুনিক কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে কি যোগ্যতা বিসর্জন দিয়ে তোষামদকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে? নাকি এই 'তৈল মর্দন' কেবলই এক সাময়িক মরীচিকা?
চাটুকারিতার রাজত্ব: কেন এবং কীভাবে
ভাষাতাত্ত্বিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সেই অবিস্মরণীয় ‘তৈল’ প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে? তিনি লিখেছিলেন, "তৈল এমন এক আশ্চর্য জিনিস, যা দিয়ে অসাধ্য সাধন করা যায়।" অফিসের ক্ষেত্রে সেই তৈলই হলো 'তোষামদ'। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের অহংকার বা 'ইগো' প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে; বরং বলা ভালো, প্রশংসা হলো তাদের প্রিয় খাদ্য। পদস্থ কর্মকর্তারাও এর ব্যতিক্রম নন। ক্ষমতার শীর্ষে থাকার কারণে অনেক সময় তারা একা বোধ করেন কিংবা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয়ে থাকেন। ঠিক তখনই আবির্ভূত হন কিছু ‘তেলবাজ’ সহকর্মী, যারা বসকে সবসময় এক কাল্পনিক স্বর্গে ভাসিয়ে রাখেন।
এখানে তৈল যে শুধু মাখতে হয় তা নয়, সেই তৈল যে কীভাবে বসের মস্তিষ্কের জটগুলো খুলে দিয়ে চাটুকারকে নিষ্কণ্টক পথে নিয়ে যায়, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।
সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই চিরচেনা সরস ভঙ্গিমার কথা ভাবুন। তিনি কোনো এক জায়গায় লিখেছিলেন—"চাটুকারিতা হলো সেই দুর্লভ চশমা, যা পরে বস তাকালে নিজের যেকোনো মাঝারি মানের আইডিয়াকেও হিমালয় সমান অসামান্য মনে হয়।" চাটুকাররা আসলে এক ধরনের জাদুকর। তারা বসের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমিতে নিজেদের স্তুতির সুগন্ধি ছিটিয়ে দেয়। বস যখন নিজের ভুল সিদ্ধান্তের চোরাবালিতে আটকে যান, তখন এই চাটুকাররাই এসে মিথ্যার বালুচরে তাকে হাঁটতে সাহায্য করে।
মুজতবা আলীর রসবোধে বলতে গেলে, "লোকে বলে তেল দিলে চাকা ঘোরে, কিন্তু বসকে তেল দিলে তো চাকা তো দূরে থাক, উল্টো বস নিজেই উড়তে শুরু করেন—অবশ্য সেই উড়াল যে শেষ পর্যন্ত মাটিতে আছাড় খাওয়ার জন্য, তা তারা ভুলেও মাথায় আনে না।" চাটুকাররা কেবল বসের স্তুতিই করে না, তারা বসের অহংবোধকে এমন এক উচ্চতায় বসিয়ে দেয় যে, সেখান থেকে বাস্তব পৃথিবীটাকে আর মানুষের মতো দেখতেই পাওয়া যায় না।

এআই প্রণীত
ইনসিকিউরিটি ও ক্ষমতার মোহ: দুর্বল চিত্তের অধিকারী বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা পরিচালকরা সাধারণত চারপাশে এমন লোক রাখতে পছন্দ করেন, যারা কখনো তাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে না। কিছু মানুষ নিজেকে বিশাল মনে করে কেবল তাসের ঘরের প্রাসাদে বসে—তারা চায় চাটুকাররা যেন সেই তাসের প্রাসাদে ফুঁ না দেয়।
সহজ পথ অবলম্বন: সততা, পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করা দীর্ঘমেয়াদি ও কঠিন প্রক্রিয়া। কিন্তু মিষ্টি কথায় মন জয় করা তুলনামূলক অনেক সহজ ও দ্রুত ফলদায়ক। শাস্ত্রী মশাইয়ের কথায়, "তৈল দানে বিমুখ হইবে না, কারণ তৈলই কর্মক্ষেত্রের পিচ্ছিল পথকে করে মসৃণ।"
পেশাদারিত্ব বনাম চাটুকারিতা: সূক্ষ্ম রেখাটি কোথায়
অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন পেশাদার শ্রদ্ধার সাথে তোষামোদকে। বসের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা বা তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা কোনো অন্যায় নয়। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় যখন শ্রদ্ধা রূপ নেয় অন্ধ আনুগত্যে।
সুস্থ পেশাদার সম্পর্ক:
কাজের ভুলভ্রান্তি নিয়ে গঠনমূলক যুক্তি প্রদান।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে নিজের মেধা ও দক্ষতা প্রয়োগ।
স্পষ্ট ও সম্মানজনক যোগাযোগ।
চাটুকারিতা বা তোষামোদ:
বসের ভুল সিদ্ধান্তে অম্লান বদনে সায় দেওয়া।
সহকর্মীদের খাটো করে নিজের গুরুত্ব জাহির করা।
প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বসের ব্যক্তিগত রুচির প্রশংসা করা।
যে ব্যক্তি পেশাদারিত্ব আর চাটুকারিতার সূক্ষ্ম দেয়ালটি ভাঙতে পারে না, সে হয় চাটুকার, নয়তো বোকামি করছে।
প্রতিষ্ঠানের ওপর বিষাক্ত প্রভাব (Toxic Culture)
যে অফিসে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বেশি প্রাধান্য পায়, সেখানে একধরনের বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব বহুমাত্রিক:
মেধাপাচার ও কর্মীদের হতাশা: প্রকৃত মেধা ও কর্মদক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরা যখন দেখেন তাদের কাজের অবমূল্যায়ন হচ্ছে, তখন তারা কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। মেধাবীরা যখন বিদায় নেয়, তখন প্রতিষ্ঠানের কঙ্কালসার দশা হতে বাধ্য।
উদ্ভাবনী শক্তির মৃত্যু: যেখানে বসের হাঁ-তে হাঁ মেলানোই মূল কাজ, সেখানে নতুন কোনো আইডিয়া বা ভিন্নধর্মী চিন্তা জন্ম নিতে পারে না। চাটুকাররা তো বসের ইগোর পাহারাদার।
সিদ্ধান্তে মারাত্মক ভুল: তোষামোদকারীরা কখনোই বসকে তার ভুলের কথা বলে না। ফলে ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল গুণতে হয় পুরো প্রতিষ্ঠানকে।
তোষামোদ ছাড়াই কি টিকে থাকা সম্ভব
তোষামোদ না করেও কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করার কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে:
কৌশলী দৃশ্যমানতা (Strategic Visibility): নিজের কাজকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে জানতে হবে। আপনার কাজ কতটুকু লাভজনক বা সময় সাশ্রয়ী, তা ডেটা ও রিপোর্টের মাধ্যমে তুলে ধরুন।
'ইগো' এড়িয়ে সমস্যা সমাধানকারী (Problem Solver) হওয়া: বসের সাথে সরাসরি তর্ক করবেন না। বস যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তবে "আপনি ভুল" না বলে বিকল্প কোনো উন্নত সমাধান সামনে উপস্থাপন করুন। এটিই চতুর বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা: পেশাদারিত্বের সীমা রক্ষা করুন। যদি দেখেন যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই, তবে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিন এবং নতুন সুযোগের সন্ধান করুন।
তোষামোদের সংস্কৃতি ভেঙে নৈতিকতা চর্চার উপায়
একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ বজায় রাখার মূল দায়িত্ব বসের নিজেরই। একজন প্রকৃত নেতা বা বস হওয়া চাটুকারদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নয়।
খোলামেলা আলোচনার সুযোগ: যেখানে কর্মীরা নির্দ্বিধায় গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অবজেক্টিভ মূল্যায়ন (KPI): আবেগ বা ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট উপাত্ত ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে কর্মীদের মূল্যায়ন করা। মনে রাখতে হবে, নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা কেবল প্রতিষ্ঠানের প্রতি নয়, কর্মীদের ক্যারিয়ার এবং ভবিষ্যতের প্রতিও।
আরও পড়ুন-
কীভাবে নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবী নারী-পুরুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা
তোষামোদকারীদের চিহ্নিত করা: যারা কাজের বেলায় শূন্য কিন্তু কথায় দরাজ, তাদেরকে প্রশ্রয় না দেওয়া। এটিই একজন প্রকৃত নেতার পরিচয়।
দিনশেষে জয় কার
সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তোষামোদ করে হয়তো কিছু সাময়িক সুবিধা আদায় করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, পেশাগত জীবনের চূড়ান্ত খতিয়ানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাই টেকসই পরিচয় হিসেবে টিকে থাকে। চাটুকারিতা আপনাকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সহকর্মীদের শ্রদ্ধা বা প্রকৃত নেতৃত্বের আসন কখনোই এনে দিতে পারে না।
যে প্রতিষ্ঠান যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদকে বেশি মূল্য দেয়, সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রতিষ্ঠানের পতন অনিবার্য। তাই তোষামোদের এই ক্ষণস্থায়ী 'শর্টকাট' সংস্কৃতিকে বিদায় জানিয়ে কর্মক্ষেত্রে মেধা, স্বচ্ছতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হোক আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির প্রধান শর্ত। দিনশেষে বসের কৃত্রিম হাসির চেয়ে নিজের কাজের প্রতি আত্মতৃপ্তি ও প্রকৃত সম্মান অনেক বেশি দামি।
মনে রাখবেন, অফিসের চাকা ঘোরে তেলের জোরে নয়, ঘোরে কর্মীদের ঘাম আর মেধার সমষ্টিগত শক্তিতে। চাটুকারিতা দিয়ে হয়তো সাময়িক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অর্জিত সেই সাফল্য কি আসলেই কোনো সাফল্যের নামান্তর?
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা