বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর এলাকায় রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের স্যালুট দিয়েছিলেন রিকশাচালক মো. সুজন খান। সেই মুহূর্তের প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মাঠে। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের আবাসস্থল ছিল গণভবন। এখানেই তৈরি হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটি উদ্বোধন করবেন। এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। তবে এই জাদুঘরের জনবল নিয়োগ এখনো হয়নি।
গত ১২ মে গণভবনে জাদুঘরের কাজ পরিদর্শন শেষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জুলাই মাসের শেষে অথবা ৫ আগস্টের মধ্যেই জাদুঘর খুলে দেওয়া হবে। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জুলাই স্মৃতি জাদুঘরেরও মহাপরিচালক। গতকাল রোববার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জাদুঘরের জনবল নিয়োগ না হলেও আগামী ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। সে অনুযায়ী দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, ভেতরে ঢোকার টিকিটের ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র গণ–আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনে ঢোকে জনতার স্রোত। বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভাঙচুরে অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট। ভবনের বিদ্যুতের সুইচবোর্ড পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছে। বড় করে গণভবন লেখা বোর্ডটিও ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনের আয়তন ১৭ দশমিক ৬৮ একর। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ২৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাজধানীর মিন্টো রোডে প্রেসিডেন্ট ভবনে অফিস করতেন। প্রেসিডেন্ট ভবন তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে শেরেবাংলা নগরে এই গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবনে বসবাস না করলেও ভবনটিকে অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন।
বিশাল কমপ্লেক্স, উন্মুক্ত মাঠসহ ২৯ হাজার বর্গফুটের দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজও হতো এখানে। গণভবনের খোলা জায়গায় নানা শাকসবজি, ফল এমনকি বিভিন্ন জাতের ধানের চাষও করতেন শেখ হাসিনা। বিশাল লেকে মাছ চাষ করতেন। গরু, মুরগি, কবুতরসহ নানা জাতের পশুপাখি পালন করতেন। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল টেনিস কোর্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিবরণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও স্মারক, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবন থেকে উদ্ধার করা নথিপত্রসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মারক ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে, তিন দিকে সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালনকক্ষ, টিকিট হাউস, স্যুভেনির শপ, হেলিপ্যাডে জুলাই মঞ্চ এবং ২২টি সেল নিয়ে প্রতীকী আয়নাঘর বানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহ ইত্যাদিসহ গুম–খুনের শিকার প্রায় ৪ হাজার মানুষের নাম ও স্মৃতি সংরক্ষণে মেমোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি ডামি কবর বানানো হয়েছে, এটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন থিমে মোট ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র বানানো হয়েছে। মনসুন থিয়েটার সেলুলয়েডে ১৬ বছরের ফ্যাসিজম, বিভিন্ন সিনেমা ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হবে। শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘর নির্মাণে চীনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার জাদুঘরটি উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েছিল। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চলতি বছরের ২০ জানুয়ারিসহ একাধিকবার জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। ২০ জানুয়ারি তিনি বলেছেন, ‘এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে। যদি আমাদের জাতি কখনো দিশাহারা হয়, তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।’
গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওই বছরের ৫ আগস্ট জাদুঘর উদ্বোধনের কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। দফায় দফায় প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টা, ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জাদুঘর এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ জাদুঘর পর্ষদে সদস্য হিসেবে আছেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের নানা অত্যাচার–অবিচারের ইতিহাসগুলো মানুষকে জানানোর জন্যই জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়া প্রয়োজন। জাদুঘরে সব জুলাই শহীদের স্মারক থাকা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাদুঘরে গিয়ে সবাই যেন জানতে পারেন এই নামে কেউ একজন ছিলেন, যিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন।