ধ্রুব ডেস্ক
ওয়াশিংটনে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে সংবাদ সম্মেলনে প্রদর্শিত ডুমসডে ক্লক; ‘মধ্যরাত’ থেকে মানবসভ্যতা মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে | ছবি: সংগৃহীত
বর্তমানে আমরা মধ্যরাত বা রাত বারোটা বা সম্পূর্ণ ধ্বংস থেকে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে আছি—যা ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান। গত বছরও এই সময় ছিল ৮৯ সেকেন্ড। অর্থাৎ, পৃথিবীর ধ্বংসের ঝুঁকি কমার বদলে উল্টো বেড়েছে।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগোচ্ছে। তবে এই ঘড়ি আপনাকে অফিসে যাওয়ার তাড়া দেবে না, বরং মনে করিয়ে দেবে যে, আমাদের চেনা এই পৃথিবীর আয়ু হয়তো ফুরিয়ে আসছে। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও সচেতনতামূলক সংস্থা ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ তাদের বিখ্যাত ‘ডুমসডে ক্লক’ বা ‘মহাপ্রলয়ের ঘড়ি’র কাঁটা আরো কিছুটা এগিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে আমরা মধ্যরাত বা রাত বারোটা বা সম্পূর্ণ ধ্বংস থেকে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে আছি—যা ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান। গত বছরও এই সময় ছিল ৮৯ সেকেন্ড। অর্থাৎ, পৃথিবীর ধ্বংসের ঝুঁকি কমার বদলে উল্টো বেড়েছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হুট করে এই ঘড়ির কাঁটা কেন নড়াচড়া করে? আসলে এটি কোনো সাধারণ দেয়াল ঘড়ি নয়; এটি মানবজাতির জন্য একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা। ১৯৪৭ সাল থেকে এই ঘড়ির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝাতে চান—মানবজাতি নিজের কর্মকাণ্ডের ফলে কতটা কাছাকাছি চলে এসেছে অস্তিত্ব সংকটের। পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীবপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এই সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই প্রতি বছর ঘড়ির কাঁটা এগোনো বা পিছোনোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এবার বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ঝুঁকি আমাদের খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের মতো দেশগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার বদলে একে অন্যকে টেক্কা দিতে গিয়ে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তার ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে চীর অস্থির এক সময় দেখছে বিশ্ব। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা বা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর বসে আছে।
তবে শুধু যুদ্ধই নয়, আমাদের চিরচেনা প্রকৃতিও যেন ক্ষেপে ওঠেছে। বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে আঙুল তুলেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে। গত কয়েক বছরের নজিরবিহীন খরা, বন্যা আর তীব্র তাপদাহ প্রমাণ করে দিয়েছে যে প্রকৃতি আর সইতে পারছে না। অথচ বিশ্বনেতারা জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের চেয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলের পেছনেই বেশি ছুটছেন। পরিবেশ রক্ষার বদলে স্বার্থের রাজনীতি যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ডুমসডে ক্লকের কাঁটা দ্রুত এগোতে বাধ্য। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক চুক্তির অভাব এখনো স্পষ্ট। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জীবাশ্ম জ্বালানিকে উৎসাহ দেয়া ও নবায়নযোগ্য শক্তিকে নিরুৎসাহিত করার নীতির সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।
আরেকটি নতুন আপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমরা যখন চ্যাটবট বা এআই নিয়ে মেতে আছি, তখন বিজ্ঞানীরা চিন্তিত এর অপব্যবহার নিয়ে। নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে বা যুদ্ধের ময়দানে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তবে মানবসভ্যতার জন্য তার ফল ভালো হবে না। সোজা কথায়, প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করার বদলে এখন অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে।
তাহলে কি আর ফেরার পথ নেই? বিজ্ঞানীরা কিন্তু একেবারে হাল ছাড়েননি। সংস্থার বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল হোল্জের ভাষায়, ‘যদি বিশ্ব “আমরা বনাম তারা” মানসিকতায় ভাগ হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সবাই হারবে।‘ তার মতে, আন্তর্জাতিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব।
তবে পুরো ছবিটা শুধু হতাশার নয়। ডুমসডে ক্লকও আসলে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং ঘুম ভাঙানোর জন্য। মাঝরাতে ঘড়ির অ্যালার্ম বাজলে আমরা যেমন জেগে উঠি, এই ঘড়িও আমাদের সেই শেষ সুযোগ দিচ্ছে। ধ্বংসের জন্য ৮৫ সেকেন্ড সময়টি খুব কম মনে হলেও, পৃথিবীটাকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিতে যথেষ্ট। তবে প্রশ্ন একটাই—মানুষ কি সেই সময়ের মূল্য বোঝার মতো বিচক্ষণ হতে পারবে?
এপি অবলম্বনে