নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর: যবিপ্রবি শীতের সকালের কুয়াশা মোড়ানো মিষ্টি রোদে আজ যেন নতুন রূপে সেজেছিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। নীল-সাদা ক্যাম্পাসের আকাশ-বাতাস আজ আনন্দধারার জোয়ারে ভাসছে। উপলক্ষ ছিল প্রাণের—বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় পথচলার ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর এই উদযাপনের কেন্দ্রে ছিল বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ‘বর্ণিল পিঠা উৎসব’।
উৎসবের আমেজ ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
রবিবার সকালে রঙিন বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে উৎসবের শুভ সূচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মজিদ। এরপরই শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ঢোল-তবলা আর হর্ষধ্বনিতে মুখর শিক্ষার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর চোখেমুখে ছিল ১৯ বছরের অর্জনের গর্ব। উৎসবের মূল ডামাডোল জমে ওঠে প্রশাসনিক ভবন ও ক্যাফেটেরিয়া চত্বরে, যেখানে বসেছিল ২৮টি বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরম মমতায় সাজানো পিঠার স্টলগুলো।
পিঠার ঘ্রাণে স্মৃতির আঙিনা
উৎসব প্রাঙ্গণে পা রাখতেই নাকে আসে খেজুর গুড় আর নারিকেলের সেই চিরচেনা সুবাস। ২৮টি বিভাগের স্টলগুলোতে শিক্ষার্থীরা কেবল বিক্রেতা নন, বরং ঐতিহ্যের সংরক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। নকশি পিঠা, পুলি, দুধ-চিতই, পাটিসাপটা তো ছিলই; সেই সঙ্গে ঠাঁই পেয়েছিল হারিয়ে যাওয়া অনেক গ্রামীণ পিঠাও।
প্রতিটি স্টলের নামকরণে যেমন ছিল সৃজনশীলতা, সাজসজ্জায় ছিল ঠিক তেমনই নন্দনের ছোঁয়া। কোথাও গ্রামীণ ছনের ঘর, কোথাও আবার ককশিটের কারুকাজ। শিক্ষার্থীরা জানালেন, ক্লাস-পরীক্ষার যান্ত্রিকতার ভিড়ে এই উৎসব যেন এক টুকরো সতেজ নিঃশ্বাস। সিনিয়র-জুনিয়র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পিঠা তৈরি আর আড্ডায় মেতে ওঠার এই দৃশ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের সেতুবন্ধনকে আরও নিবিড় করে তুলেছে।
সৃজনশীলতার ক্যানভাস ও মিলনমেলা
পিঠা উৎসব এখানে কেবল রসনাবিলাসের আয়োজন ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল শিল্প ও মেধার প্রদর্শনী। স্টলের চারপাশে মেঝেতে আঁকা রঙিন আলপনা যেন উৎসবের ঔজ্জ্বল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। উৎসবে আসা শিক্ষকরা মুগ্ধ হয়ে দেখেন শিক্ষার্থীদের এই নান্দনিক সৃজনশীলতা। তাঁদের মতে, এই মিলনমেলা কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়, এটি যবিপ্রবি পরিবারের প্রত্যেকের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মার বন্ধন তৈরি করে।
গৌরবের ১৯ বছর: একটি মহীরুহের গল্প
২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি ‘শিক্ষার আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যশোর জেলায় মাত্র চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল যবিপ্রবি। সময়ের পরিক্রমায় আজ ১৯ বছরে এটি এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ২৮টি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী পাঠদান গ্রহণ করছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে দেশের শীর্ষে স্থান অর্জন করায় এই বিদ্যাপীঠ আজ বিশ্বমানের গবেষণা ও শিক্ষার অন্যতম মাইলফলক।
আগামীর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে শিক্ষার্থীদের চোখে দেখা মিলেছে এক স্বপ্নিল আগামীর। উপাচার্য ও শিক্ষকবৃন্দ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আধুনিক গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ ও উচ্চতর শিক্ষার মান ধরে রেখে যবিপ্রবি একদিন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বলতর করবে।
বিকেলের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার সুরলহরী যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল, ক্যাম্পাসের বাতাসে তখনও মিশে ছিল পিঠার সেই মিষ্টি ঘ্রাণ আর হাজারো শিক্ষার্থীর হাসির শব্দ। ১৯ বছরের সাফল্যের এই জয়যাত্রা যবিপ্রবিকে নিয়ে যাক অনন্ত উচ্চতায়—প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে এটাই ছিল প্রতিটি যবিপ্রবিয়ানের প্রাণের স্পন্দন।