ধ্রুব রিপোর্ট
কতযে বিকেল আসে, খুব বেশি পানসে। আজকের বিকেলটা বড় বেশি মিষ্টি, মাঘের বিকেল।
শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ তখন শহরের লালদিঘির পাড়ে ব্রাদার টিটোস হোমের আঙিনায় এক্কা-দোক্কা খেলছে। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। মঞ্চে দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট্ট আয়েশা সিদ্দিকা যখন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের বীরত্বগাথা বর্ণনা করছিল, তখন উপস্থিত সবার চোখে অশ্রু। কিন্তু সেই বিষণ্নতার রেশ কাটিয়ে মুহূর্তেই পুরো আঙিনা নিজের করে নিল আরেক খুদে প্রতিভা—সাবিক সাদাত। তুলল হাসির রোল।
বৃহস্পতিবার বিকেলে আয়োজিত ‘বিটিএইচ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অনুষ্ঠানটি কেবল একটি পুরস্কার বিতরণী ছিল না; বরং এটি ছিল মেধা ও মনন বিকাশের এক অনন্য উৎসব, যা সাফল্যের এক নতুন নজির স্থাপন করেছে। এই আয়োজনের মধ্যদিয়ে সাবিক সাদাতসহ যে দুই শিশুকে মূল্যায়ণ করে আলোয় আনা হলো, তাদের নিয়ে আশা প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রত্যাশা একদিন অনেক বড় হবে তারা। হবে আমাদের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।
সাবিক আর আয়েশার মুকুট জয়ের গল্প
বড় করে বলতে গেলে, এই ব্রাদার টিটোস হোমের সাবেক ছাত্র এবং নতুন কুঁড়ির 'ক' বিভাগে কৌতুকে দেশ সেরা ক্ষুদে শিল্পী সাবিক সাদাত— সে এবার বিটিভিতে গোটা দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব করেছে। তার সাবলীল পরিবেশনা টেলিভিশনের স্টুডিওতে উড়িয়েছে নতুনের কেতন। তাই সে কৌতুক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করে। মঞ্চে সাবিকের সাবলীল উপস্থাপনা আর কৌতুক বলার ভঙ্গি ছিল দেখার মতো। তার প্রতিটি শব্দ আর এক্সপ্রেশন উপস্থিত দর্শকদের হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে দিয়েছিল। এই ছোট্ট বয়সেই মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সাবিক যে সাহসিকতা আর রসবোধ দেখিয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। তার এই সাফল্যকে ত্বরান্ত্বিত করতে হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘বিটিএইচ পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড’।
আসলে বিটিভির কিংবদন্তিতুল্য অনুষ্ঠান 'নতুন কুঁড়ি'র মঞ্চে কদিন আগে কচিকাচাদের অংশগ্রহণ ছিল দেখার মত। প্রাণ প্রাণে ফিরেছিল ঐতিহ্য। মঞ্চে নবকিশলয় স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকা যখন উঠল গল্প বলতে, তখন সবাই চমকে গিয়েছিল। গল্প বলায় 'ক' বিভাগে দেশসেরা দ্বিতীয় স্থান দখল করে জানান দিয়েছিল নিজের প্রতিভা সম্পর্কে। সেই সাফল্যগাথা আয়েশাকে এনে দিয়েছে বিটিএইচ পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড।
ব্রাদার টিটোস হোম সৃজনের উৎসারক
পুরো আয়োজনটির প্রাণকেন্দ্র ছিল ব্রাদার টিটোস হোম। শহরের লালদিঘির পাড়ে অবস্থিত এই প্রাঙ্গণটি দীর্ঘকাল ধরে শিশুদের মেধা অন্বেষণ ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে। এদিন অধ্যক্ষ আলী আযম টিটোর প্রাণবন্ত ও সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পূর্ণতা পায়। এটি কেবল একটি বিদ্যাপীঠ নয়, বরং সাবিক বা আয়েশার মতো আগামীর কান্ডারিদের মূল্যায়ণের নির্ভরতার আকাশ। ব্রাদার টিটোস হোমের এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা কোমলমতি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে শাণিত করে তাদের আগামীর পথে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে নিশ্চয়ই।
নেতৃত্বের আলোকবর্তিকা রিপন
ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন রিপন অটোস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আয়াজ উদ্দীন রিপন। তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সৃজনশীল উদ্যোক্তা সত্তা তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় প্রেরণা। বিটিএইচ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ ভূষিত হওয়ার মাধ্যমে তার এই অসামান্য অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি মিলেছে। শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রন্ধনশৈলীর গুণী শিল্পী তানিয়া
সংস্কৃতি কেবল মঞ্চের গানে বা আবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রন্ধনশৈলীও এক গভীর শিল্প। আর এই শিল্পের আঙিনায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন তানিয়া আফরোজ। তানি’স কিচেনের স্বত্বাধিকারী হিসেবে তিনি খাবারের স্বাদ ও উপস্থাপনায় এক নতুন নান্দনিকতা যোগ করেছেন। রন্ধনশিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সৃজনশীলতার পরিচয় দেওয়ায় তাকে দেওয়া হয়েছে বিটিএইচ কালচার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫। তার এই অর্জন প্রমাণ করে যে, একাগ্রতা থাকলে হেঁশেল থেকেও সংস্কৃতির জয়গান গাওয়া সম্ভব।
অনুভূতি ও সমাপনী
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোর বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী মুনিরুল হুদা। তিনি বিজয়ীদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন এবং হাতে পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কার জয়ের পর খুদে শিল্পী সাবিক সাদাত তার প্রতিক্রিয়ায় জানায়, এই স্বীকৃতি তাকে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।
ব্রাদার টিটোস হোমের এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল যে, সঠিক সুযোগ আর পরিবেশ পেলে আমাদের চারপাশের এই ছোট্ট শিশুরা আগামী দিনের মহীরুহ হয়ে উঠতে পারে। গল্প-কৌতুক আর অনুপ্রেরণার এই বিকেলটি যশোরের সংস্কৃতিমনা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে।