শেখ জালাল│
ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর: একসময় যে খালের স্বচ্ছ জলধারা কৃষকের মুখে হাসি ফোটাত, যে খাল ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটানোর এক জীবন্ত স্বপ্ন, সাড়ে চার দশক পর সেই ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ আজ অস্তিত্ব সংকটে। হারিয়ে যাচ্ছে কালের করতলে। যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী ও রঘুনাথপুর গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলা বেতনা নদীর সংযোগ প্রকল্প উলাশী-যদুনাথপুর খালটি অযত্ন আর সংস্কারের অবহেলায় নাব্য হারিয়ে মৃত্যুমুখে। বিলুপ্তির পথে জিয়া স্মৃতি ও স্মৃতিবিজড়িত জিয়া মঞ্চ।
কর্মযজ্ঞের সূচনাকাল
ঘটনাটি ১৯৭৬ সালের ১লা নভেম্বর। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল ধরে উলাশী-যদুনাথপুর খাল খনন কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করেন। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে যদুনাথপুর, হাড়িয়াখালী, সামটা ও শান্তাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার পানি সংকট দূর করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এটি ছিল শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম অংশ—দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।
সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে উপরিভাগের পানি ব্যবহার করে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, মাছের উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের যে সুপরিকল্পিত যাত্রা শুরু হয়েছিল, উলাশীর এই খালটি ছিল তার এক অনন্য প্রতীক।
উলাশী খালের অবদান
শহিদ জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচি ছিল মূলত একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব। তৎকালীন সময়ে এ কর্মসূচির গুরুত্ব ছিল বহুমুখী।
যেমন বলা যায়, উলাশী খালের মাধ্যমে কয়েক হাজার একর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় এই অঞ্চলে বছরে একাধিকবার ফসল ফলানো সম্ভব হয়েছিল। এটি খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।
একইভাবে দেখা যায়, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যা জাতীয় ঐক্যের অন্যন্য প্রতীক হিসেবে গণ্য করা যায়।
গভীর নলকূপের ওপর চাপ কমিয়ে নদীর পানিকে কৃষি কাজে ব্যবহার করার প্রেসিডেন্ট জিয়ার দূরদর্শী চিন্তা এখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, যেটার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে উলাশীতে।
খালটি কেবল পানি চলাচলের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডার। স্থানীয় জেলে ও ভূমিহীন কৃষকরা এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছে।স্থানীয় মৎস্যজীবী রহমত আলী বলেন, একসময় এই খালে জাল ফেললেই পুঁটি, শোল, আর দেশি মাছে ঝুড়ি ভরে যেত। আমরা যারা ভূমিহীন ছিলাম, তাদের অভাবের সংসারে এই খালের মাছই ছিল বড় ভরসা। খালের পানি কমে যাওয়ায় সেই রূপালি মাছ এখন অতীত। এখন জাল নিয়ে নামলে কেবল কাদা আর আগাছা ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না।

খাল কাটছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
জিয়ার স্মৃতি নিয়ে বড্ড অবহেলা
উলাশীর এই খাল খনন প্রকল্পের সাথে মিশে আছে শহীদ জিয়ার ব্যক্তিগত আবেগ ও পরিশ্রমের স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই দিনগুলোর কথা। খাল খননের সময় শহীদ জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতেন। জানা যায়, খনন কাজ চলাকালীন তিনি খালের পাড়েই একটি সাধারণ ভবনে রাত্রিযাপন করেছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের সেই অনাড়ম্বর জীবনযাপন স্থানীয়দের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
পরবর্তীতে ওই ভবনটি সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক ও কৃষকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজ সেই ভবনটি এক পরিত্যক্ত কঙ্কাল। সময়ের বিবর্তনে ভবনের ভেতর থাকা শহীদ জিয়ার ব্যবহৃত খাট, টেবিল, চেয়ারসহ মূল্যবান সকল স্মৃতিচিহ্ন লুট হয়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল পড়ে আছে ভাঙা দেওয়াল আর আগাছার জঙ্গল। খালের পাড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া মঞ্চ’ আজ বিলুপ্তির পথে। যেখানে একসময় উন্নয়নের শপথ নেওয়া হতো, আজ সেই মঞ্চের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। খালের স্মৃতিফলকটিও অবহেলায় খালের ভেতর ফেলে দেওয়া হয়েছিল, পরে কারো কারো চেষ্টায় সেটি উদ্ধার করা গেছে।
হালের চালচিত্র
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একসময়ের ভরা যৌবনের সেই খাল আজ শীর্ণকায়া। খননের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংস্কার না হওয়ায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে খালের বুক। স্থানীয় সাংবাদিক মনিরুজ্জামানের আক্ষেপ, এই খাল দিয়ে সোনামুখী ও বন মান্দার বিলের হাজার হাজার বিঘা জমির জলাবদ্ধতা নিরসন হতো। আজ তার কিছুই নেই, সবকিছুই অতীত।
খালপাড়ের কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, আগে খালের পানি দিয়েই সেচ কাজ চলত। এখন খাল মৃতপ্রায় হওয়ায় পানির কোনো সংস্থান নেই। আরেক কৃষক আবু বক্কার সিদ্দিক বলেন, খালে নাব্য না থাকায় এখন বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে কৃষকের সেচ খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
প্রত্যাশা
শার্শা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাসান জহির বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান জনগণের শক্তিকে সংগঠিত করে যে বিপ্লব শুরু করেছিলেন, উলাশীর এই খাল তারই প্রমাণ। গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমানে খালটি নাব্য হারানোয় জলাবদ্ধতা বাড়ছে এবং কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি খালের সংস্কার ও খননের মাধ্যমে এর নাব্য ফিরিয়ে আনার এবং জিয়ার স্মৃতিধন্য ভবন ও মঞ্চটি উদ্ধার করে সংরক্ষণের দাবি জানান।