বিশেষ প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা এবং আপিল শুনানি শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এক বড় প্রশ্ন—নির্বাচন কমিশন (ইসি) কি শেষ পর্যন্ত সবার আস্থা অর্জন করতে পারবে? একদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন দাবি করছেন যে, তারা ‘মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে’ এবং কোনো প্রকার পক্ষপাত ছাড়াই আপিল শুনানি সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো প্রধান শক্তিগুলো ইসির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে পাহাড়সম অভিযোগ তুলেছে।
গত ১৮ জানুয়ারি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে টানা ৯ দিনের আপিল শুনানি শেষে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেকেই সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন হোক। এজন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের জটিল শর্তটিও আমরা শিথিল করেছি।’ কমিশন দাবি করেছে, তারা নির্বাচনকে অর্থবহ করতে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা পর্যন্ত ‘আইনের অনুমতি’ সাপেক্ষে মেনে নিয়েছে। সিইসি’র ভাষায়, ‘আমরা এবং আমার টিমের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করতে পারি—কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করে আমরা কোনো জাজমেন্ট দিইনি।’
বিএনপির চার অভিযোগ: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইসির সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ইসি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। বিএনপির প্রধান চারটি অভিযোগ হলো: ১. একটি নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিতেই ত্রুটিপূর্ণ ব্যালট প্রস্তুত করা হয়েছে। ২. ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। ৩. ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। ৪. একতরফা প্রচার চললেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
তবে ফখরুল এই আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন , ইসি যদি দ্রুত তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে, তবে এই কমিশনের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।
জামায়াতের নালিশ: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নালিশ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের অভিযোগ করেছেন, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া বাড়তি নিরাপত্তা ও প্রটোকলকে ‘বাড়াবাড়ি’ হিসেবে দেখছে দলটি। তারা তাদের আমির ডা. শফিকুর রহমানের জন্যও সমান সুবিধা দাবি করেছে। ছাত্রদলের চাপের মুখে ইসি বাতিল হওয়া মনোনয়ন বৈধ করে দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন ডা. তাহের। ভোটকক্ষের ভেতরে সেনাবাহিনী বা পুলিশ সদস্যদের প্রবেশ না করানোর শর্তে প্রধান উপদেষ্টার সম্মতি আদায় করেছে জামায়াত।
এনসিপি’র ‘নির্বাচন বর্জনের হুমকি’: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তো আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসি জনগণের আস্থা পুরোপুরি হারিয়েছে। যেভাবে পক্ষপাতিত্বের ধারা চলছে, তাতে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কি না, তা এখন পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান কমিশন বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন আইনি বাধ্যবাধকতা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দোহাই দিয়ে নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তবে মাঠপর্যায়ে ডিসি-এসপিদের আচরণ এবং বড় দলগুলোর প্রতি ইসির তথাকথিত ‘নমনীয়তা’ ছোট ও উদীয়মান দলগুলোর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সিইসি ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ রাখার কথা বললেও, রাজনৈতিক দলগুলো ভরসা রাখতে চাইছে কমিশনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও নিরপেক্ষ কর্মতৎপরতার ওপর।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, আস্থার এই ফাটল ততই দৃশ্যমান হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ইসি কি একটি বিতর্কহীন নির্বাচন উপহার দিতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক বিভাজন আরও চরম রূপ নেবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।